অনলাইন জুয়া ঠেকাতে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোর নির্দেশ: ৫ হাজার কোটি টাকার পাচারের শঙ্কা
- Update Time : ১১:১৪:২৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ নভেম্বর ২০২৫
- / ২১০ Time View

বাংলাদেশে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা অনলাইন জুয়া এখন এক মারাত্মক আর্থিক ও সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে জুয়ার টাকা লেনদেন এবং পাচারের আশঙ্কা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি দেশের ১৩টি এমএফএস প্রতিষ্ঠানকে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সতর্কবার্তা
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এমএফএস প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অবৈধ জুয়ার মাধ্যমে বিদেশে টাকা পাচার হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে সন্দেহজনক অ্যাকাউন্ট চিহ্নিত করতে, অভ্যন্তরীণ টাস্কফোর্স গঠন করতে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-নির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া জুয়া-সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণের জন্য একটি পাবলিক রিপোর্টিং পোর্টাল ও হেল্পলাইন চালুর কথাও বলা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সূত্র জানিয়েছে, ৬ নভেম্বর সাতটি এমএফএস অপারেটরের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে জুয়া-সংক্রান্ত লেনদেন প্রতিরোধে গৃহীত পদক্ষেপ পর্যালোচনা করা হবে।
একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “দেশ থেকে অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ আনুমানিক ৫ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে।”
লেনদেন শনাক্তের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ
এমএফএস অপারেটরদের মতে, পার্সন-টু-পার্সন লেনদেনের উদ্দেশ্য শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। কোনো ব্যক্তি বা এজেন্ট একাধিক স্তরের মাধ্যমে টাকা স্থানান্তর করলে সেটি ট্র্যাক করা কঠিন হয়ে যায়।
নগদের মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন,
“নগদ কোনো অবস্থাতেই অবৈধ লেনদেনে যুক্ত নয়। সন্দেহভাজন লেনদেন হলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে জানাই।”
একইভাবে, বিকাশের কর্পোরেট কমিউনিকেশনস প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বলেন,
“যদি কোনো অ্যাকাউন্টের লেনদেন সন্দেহজনক মনে হয়, আমরা তা স্বেচ্ছায় বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে জানাই। অনলাইন জুয়া ও মানি লন্ডারিং ঠেকাতে আমাদের নিজস্ব প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষিত কর্মী রয়েছে।”
জুয়া
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) দেশে পরিচালিত সব জুয়ার ওয়েবসাইট বন্ধ করেছে। তবু ভিপিএন (VPN) ব্যবহার করে অনলাইন জুয়া চলছে।
জানা গেছে, দেশ থেকেই অনেকেই বেটিং অ্যাপে প্রোফাইল তৈরি করে এমএফএসের মাধ্যমে টাকা পাঠাচ্ছেন। জেতার পর সেই অর্থ এমএফএসের মাধ্যমে উত্তোলন করা হচ্ছে।
হেরে গেলে টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে — প্রক্রিয়াটি এতটাই জটিল যে একাধিক ধাপে লেনদেনের কারণে উৎস শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আইনি ও গোয়েন্দা সংস্থার দৃষ্টিভঙ্গি
আইসিটি বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল তানভীর হাসান জোহা বলেন,
“অনলাইন জুয়ার সব লেনদেন এমএফএসের মাধ্যমেই হয়েছে। সন্দেহজনক টাকা আসা অ্যাকাউন্টগুলো নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করা জরুরি। দুই-চারজন ধরা পড়লে পুরো চেইন ট্র্যাক করা সম্ভব হবে।”
তিনি আরও বলেন, “যে টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা ব্যর্থ হবে যদি প্রযুক্তির সহায়তা না নেওয়া হয়। কার্যকর মনিটরিঙের জন্য ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স (OSINT) এবং রিয়েল-টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (RTGS) ব্যবস্থাকে ব্যবহার করা উচিত।”
অর্থনৈতিক প্রভাব ও বিশেষজ্ঞ মতামত
বিআইবিএম-এর সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন,
“এমন লেনদেন দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের ঝুঁকি তৈরি করছে। শুধুমাত্র বাংলাদেশ ব্যাংকের একার পক্ষে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এমএফএস অপারেটরদের নিজস্ব ট্রানজেকশন মনিটরিং টিম থাকা উচিত।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে দেশের তরুণ প্রজন্ম একদিকে যেমন আসক্তির শিকার হচ্ছে, অন্যদিকে তা জাতীয় অর্থনীতির ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করছে।
সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজন
অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে শিগগিরই বিটিআরসি, ডিজিএফআই, এনএসআই, এনটিএমসি, সিআইডি, বাংলাদেশ ব্যাংক ও ডাক মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারীদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
এই বৈঠকে প্রযুক্তিগত পর্যবেক্ষণ, ডেটা-শেয়ারিং মেকানিজম এবং বিদেশি পেমেন্ট গেটওয়ে ট্র্যাকিং নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানা গেছে।
অনলাইন জুয়া এখন কেবল একটি অবৈধ খেলা নয়—এটি জাতীয় নিরাপত্তা, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং নৈতিকতার জন্য একটি বড় হুমকি। এমএফএস প্ল্যাটফর্মগুলো প্রযুক্তিগতভাবে আরও সক্ষম না হলে, বিদেশি সার্ভার-ভিত্তিক এসব জুয়া ও বেটিং অ্যাপ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই ৫ হাজার কোটি টাকার অবৈধ অর্থ প্রবাহ রোধ করে ডিজিটাল আর্থিক খাতকে সুরক্ষিত রাখতে।










