প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা নিয়ে হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়:সরকারি-বেসরকারি শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগের দ্বার উন্মোচন
- Update Time : ১২:০১:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ নভেম্বর ২০২৫
- / ১২৬ Time View

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। শুধুমাত্র সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে আদালত রায় দিয়েছেন—এখন থেকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও এই পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে।
সোমবার (৪ নভেম্বর) বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক রিট আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে এ ঐতিহাসিক রায় দেন। রায়ের ফলে ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় সরকারি বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি স্কুল, রেজিস্টার্ড কিন্ডারগার্টেন ও কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।
পটভূমি ও রায়ের উৎপত্তি
গত ১৭ জুলাই প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) এক স্মারক জারি করে জানায়—শুধুমাত্র সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে। এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে কেরানীগঞ্জ পাবলিক ল্যাবরেটরি স্কুলের পরিচালক মো. ফারুক হোসেনসহ ৪২ জন শিক্ষক ও অভিভাবক হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।
রিটের প্রাথমিক শুনানিতে আদালত গত ২ সেপ্টেম্বর ঐ সিদ্ধান্ত স্থগিত করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেন। অবশেষে চূড়ান্ত শুনানি শেষে আদালত রায় দেন—২০০৮ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা নীতিমালা অনুযায়ী সব সরকারি ও বেসরকারি অনুমোদিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অধিকার রাখে।
রায়ে আদালত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছেন, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে বেসরকারি শিক্ষার্থীদেরও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।
আইনজীবীদের বক্তব্য
রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী নিয়াজ মোর্শেদ। তিনি বলেন, “এটি শিক্ষাক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক রায়। দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত ছিল। এখন থেকে দেশের সব অনুমোদিত বেসরকারি প্রাথমিক, কমিউনিটি ও কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীরা বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে—এটা শিক্ষার সমতা প্রতিষ্ঠার পথে বড় পদক্ষেপ।”
অন্যদিকে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পক্ষে আইনজীবী মুনতাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, “হাইকোর্টের রায় আমরা পেয়েছি। মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে আপিল বিভাগে যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
শিক্ষাবিদদের প্রতিক্রিয়া
শিক্ষাবিদরা বলছেন, এই রায় দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সমান সুযোগ ও ন্যায্যতার নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৃত্তি পরীক্ষার সুযোগের বৈষম্য ছিল। আদালতের এই রায় সেই বৈষম্য দূর করবে এবং শিক্ষাক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত করবে।
একজন প্রাথমিক শিক্ষা বিশেষজ্ঞ বলেন, “এটি শিক্ষায় সমতা ও ন্যায়বিচারের প্রতিফলন। সরকারি-বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রের মেধাবী শিক্ষার্থীরা এখন সমানভাবে তাদের যোগ্যতা প্রদর্শনের সুযোগ পাবে।”
ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য, ১৯৮১ সালে দেশে প্রথম প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা চালু করা হয়। এরপর ২০০৯ সাল থেকে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার মাধ্যমে বৃত্তি দেওয়া শুরু হয়। তবে করোনা মহামারির কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালে পরীক্ষা বন্ধ থাকে। ২০২২ সালে পুনরায় প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা চালু হয়।
চলতি বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা আগামী ২১ থেকে ২৪ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। হাইকোর্টের এই রায়ের ফলে এখন সরকারি ও বেসরকারি উভয় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সমানভাবে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে, যা শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
সমাপনী মন্তব্য
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, এই রায়ের মাধ্যমে শুধু বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অধিকারই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়নি, বরং দেশের প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তিকে আরও দৃঢ় করেছে। শিক্ষাবিদদের মতে, এটি এমন এক দৃষ্টান্ত যা ভবিষ্যতে শিক্ষা নীতিনির্ধারণে ন্যায়, সমতা ও অন্তর্ভুক্তির দিকনির্দেশনা দেবে।
সর্বশেষ, অভিভাবক ও শিক্ষক সমাজ এই রায়কে ‘শিক্ষার মাঠে ন্যায়বিচারের বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করছেন এবং আশা করছেন—সরকার দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে, যাতে কোনো শিক্ষার্থী সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়।










