সময়: বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুড়িগ্রাম-৪ আসন: বিএনপি থেকে মনোনায়ন পেলেন বড় ভাই,জামায়াত থেকে ছোট ভাই

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১০:৩২:২৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ নভেম্বর ২০২৫
  • / ১১৭ Time View

 

 

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে কুড়িগ্রাম-৪ আসনে দেখা দিয়েছে এক বিরল ও আকর্ষণীয় রাজনৈতিক সমীকরণ। একই পরিবারের দুই ভাই এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতীক নিয়ে। বড় ভাই বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন, আর ছোট ভাই জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন। ফলে পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও কৌতূহল।

বিএনপি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়ন পেয়েছেন আলহাজ আজিজুর রহমান। তিনি এবার ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। অন্যদিকে তার ছোট ভাই মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয়।

পারিবারিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে এলাকায় চর্চা

একই পরিবারের দুই প্রার্থীর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন কুড়িগ্রাম-৪ আসনের নির্বাচনী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। স্থানীয়দের মতে, বিএনপি ও জামায়াত ঐতিহ্যগতভাবে এ আসনে শক্তিশালী ভোটভিত্তি গড়ে তুলেছিল। কিন্তু এবার দুই ভাইয়ের বিভক্ত অবস্থান সেই ভোটব্যাংকে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, কুড়িগ্রাম-৪ আসনে বিএনপি-জামায়াতের ভোটের একটি বড় অংশ এতদিন একই ধারায় প্রবাহিত হতো। কিন্তু এবার পারিবারিক প্রতিযোগিতা সেই ভোটে বিভাজন তৈরি করতে পারে। এতে তৃতীয় কোনো প্রার্থী লাভবান হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল হামিদ বলেন, “একই পরিবারের দুই ভাইকে দুই প্রতীকে দেখছি—এটা আমাদের এলাকায় আগে কখনও ঘটেনি। অনেকেই এখন বিভ্রান্ত, কাকে ভোট দেবেন ঠিক করতে পারছেন না। তবে সবাই বলছে, এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা নির্বাচনে নতুন রঙ এনেছে।”

বড় ভাই আজিজুর রহমানের আত্মবিশ্বাস

বিএনপি প্রার্থী আলহাজ আজিজুর রহমান বলেন, “আমি ২০১৮ সালেও নির্বাচন করেছি। তখন আমার ছোট ভাই মোস্তাক আমার সঙ্গে কাজ করেছে, এখন সে জামায়াতের প্রার্থী। কিন্তু আমার বংশের বেশিরভাগ সদস্য, চাচাতো ভাইরা এবং দলীয় নেতাকর্মীরা আমার পক্ষেই আছেন।”

তিনি আরও বলেন, “চেয়ারম্যান হিসেবে আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা আছে। মাঠে আমার সংগঠন খুব শক্তিশালী। জামায়াত হয়তো কৌশলগতভাবে আমার ভাইকে প্রার্থী করেছে, কিন্তু এতে তারা কোনো সুফল পাবে না। ইনশাআল্লাহ এবার ধানের শীষ বিজয়ী হবে।”

ছোট ভাই মোস্তাকের পাল্টা বক্তব্য

অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক নিজের অবস্থানে অনড়। তিনি বলেন, “আমার ভাই বিএনপির প্রার্থী—এটা কোনো সমস্যা নয়। ভোটাররা এখন খুব সচেতন। তারা দল দেখে ভোট দেয়, ব্যক্তি নয়। আমি অনেক আগেই প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত হয়েছি, মাঠে কাজ করছি দীর্ঘদিন ধরে।”

মোস্তাক আরও বলেন, “আমার কয়েকজন চাচাতো ভাই নিরপেক্ষ থাকবে বলেছে, কেউ পক্ষ নেবে না। তবে যদি যায়, আমার দিকেই আসবে। আমার মাঠ সংগঠন ভালোভাবে প্রস্তুত। জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।”

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে সম্ভাব্য প্রভাব

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কুড়িগ্রাম-৪ আসনে এ প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিছক পারিবারিক নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক অঙ্গনের এক প্রতিচ্ছবি—যেখানে দীর্ঘদিনের মিত্র বিএনপি-জামায়াত এখন মাঠ পর্যায়ে আলাদা পথে চলছে। এর ফলে ঐক্যভিত্তিক বিরোধী রাজনীতির কাঠামোও কিছুটা শিথিল হচ্ছে।

নির্বাচনী পর্যবেক্ষক হাফিজুল ইসলাম বলেন, “এই আসনে বিএনপি ও জামায়াতের ভোট সব সময় ঘনিষ্ঠ। এবার তারা আলাদা প্রতীকে মাঠে নামায় ভোট ভাগ হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। তৃতীয় কোনো দল—বিশেষত ক্ষমতাসীন প্রার্থী—এই বিভক্ত ভোটের সুযোগ নিতে পারে।”

শেষ কথা

নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, কুড়িগ্রাম-৪ আসনের এই “ভাইয়ে-ভাইয়ে লড়াই” ততই আলোচনায় আসছে জাতীয় রাজনীতিতেও। ভোটারদের অনেকে একে ‘ভাইয়ের লড়াই, এলাকার ভাগ্য নির্ধারণের লড়াই’ বলছেন। শেষ পর্যন্ত কার পক্ষে দাঁড়াবে জনগণ—বড় ভাইয়ের ধানের শীষ, নাকি ছোট ভাইয়ের দাঁড়িপাল্লা—তা জানার অপেক্ষায় এখন পুরো কুড়িগ্রাম।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

কুড়িগ্রাম-৪ আসন: বিএনপি থেকে মনোনায়ন পেলেন বড় ভাই,জামায়াত থেকে ছোট ভাই

Update Time : ১০:৩২:২৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ নভেম্বর ২০২৫

 

 

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে কুড়িগ্রাম-৪ আসনে দেখা দিয়েছে এক বিরল ও আকর্ষণীয় রাজনৈতিক সমীকরণ। একই পরিবারের দুই ভাই এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতীক নিয়ে। বড় ভাই বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন, আর ছোট ভাই জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন। ফলে পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও কৌতূহল।

বিএনপি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়ন পেয়েছেন আলহাজ আজিজুর রহমান। তিনি এবার ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। অন্যদিকে তার ছোট ভাই মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয়।

পারিবারিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে এলাকায় চর্চা

একই পরিবারের দুই প্রার্থীর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন কুড়িগ্রাম-৪ আসনের নির্বাচনী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। স্থানীয়দের মতে, বিএনপি ও জামায়াত ঐতিহ্যগতভাবে এ আসনে শক্তিশালী ভোটভিত্তি গড়ে তুলেছিল। কিন্তু এবার দুই ভাইয়ের বিভক্ত অবস্থান সেই ভোটব্যাংকে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, কুড়িগ্রাম-৪ আসনে বিএনপি-জামায়াতের ভোটের একটি বড় অংশ এতদিন একই ধারায় প্রবাহিত হতো। কিন্তু এবার পারিবারিক প্রতিযোগিতা সেই ভোটে বিভাজন তৈরি করতে পারে। এতে তৃতীয় কোনো প্রার্থী লাভবান হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল হামিদ বলেন, “একই পরিবারের দুই ভাইকে দুই প্রতীকে দেখছি—এটা আমাদের এলাকায় আগে কখনও ঘটেনি। অনেকেই এখন বিভ্রান্ত, কাকে ভোট দেবেন ঠিক করতে পারছেন না। তবে সবাই বলছে, এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা নির্বাচনে নতুন রঙ এনেছে।”

বড় ভাই আজিজুর রহমানের আত্মবিশ্বাস

বিএনপি প্রার্থী আলহাজ আজিজুর রহমান বলেন, “আমি ২০১৮ সালেও নির্বাচন করেছি। তখন আমার ছোট ভাই মোস্তাক আমার সঙ্গে কাজ করেছে, এখন সে জামায়াতের প্রার্থী। কিন্তু আমার বংশের বেশিরভাগ সদস্য, চাচাতো ভাইরা এবং দলীয় নেতাকর্মীরা আমার পক্ষেই আছেন।”

তিনি আরও বলেন, “চেয়ারম্যান হিসেবে আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা আছে। মাঠে আমার সংগঠন খুব শক্তিশালী। জামায়াত হয়তো কৌশলগতভাবে আমার ভাইকে প্রার্থী করেছে, কিন্তু এতে তারা কোনো সুফল পাবে না। ইনশাআল্লাহ এবার ধানের শীষ বিজয়ী হবে।”

ছোট ভাই মোস্তাকের পাল্টা বক্তব্য

অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক নিজের অবস্থানে অনড়। তিনি বলেন, “আমার ভাই বিএনপির প্রার্থী—এটা কোনো সমস্যা নয়। ভোটাররা এখন খুব সচেতন। তারা দল দেখে ভোট দেয়, ব্যক্তি নয়। আমি অনেক আগেই প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত হয়েছি, মাঠে কাজ করছি দীর্ঘদিন ধরে।”

মোস্তাক আরও বলেন, “আমার কয়েকজন চাচাতো ভাই নিরপেক্ষ থাকবে বলেছে, কেউ পক্ষ নেবে না। তবে যদি যায়, আমার দিকেই আসবে। আমার মাঠ সংগঠন ভালোভাবে প্রস্তুত। জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।”

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে সম্ভাব্য প্রভাব

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কুড়িগ্রাম-৪ আসনে এ প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিছক পারিবারিক নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক অঙ্গনের এক প্রতিচ্ছবি—যেখানে দীর্ঘদিনের মিত্র বিএনপি-জামায়াত এখন মাঠ পর্যায়ে আলাদা পথে চলছে। এর ফলে ঐক্যভিত্তিক বিরোধী রাজনীতির কাঠামোও কিছুটা শিথিল হচ্ছে।

নির্বাচনী পর্যবেক্ষক হাফিজুল ইসলাম বলেন, “এই আসনে বিএনপি ও জামায়াতের ভোট সব সময় ঘনিষ্ঠ। এবার তারা আলাদা প্রতীকে মাঠে নামায় ভোট ভাগ হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। তৃতীয় কোনো দল—বিশেষত ক্ষমতাসীন প্রার্থী—এই বিভক্ত ভোটের সুযোগ নিতে পারে।”

শেষ কথা

নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, কুড়িগ্রাম-৪ আসনের এই “ভাইয়ে-ভাইয়ে লড়াই” ততই আলোচনায় আসছে জাতীয় রাজনীতিতেও। ভোটারদের অনেকে একে ‘ভাইয়ের লড়াই, এলাকার ভাগ্য নির্ধারণের লড়াই’ বলছেন। শেষ পর্যন্ত কার পক্ষে দাঁড়াবে জনগণ—বড় ভাইয়ের ধানের শীষ, নাকি ছোট ভাইয়ের দাঁড়িপাল্লা—তা জানার অপেক্ষায় এখন পুরো কুড়িগ্রাম।