ইতালির প্রধানমন্ত্রীসহ সেলিব্রেটিদের কৃত্রিম নগ্ন ছবি: এআই যুগের নতুন নৈতিক সংকট
- Update Time : ০৪:৪৪:৩৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ নভেম্বর ২০২৫
- / ১৯৫ Time View

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, কিংবদন্তি অভিনেত্রী সোফিয়া লরেন এবং প্রখ্যাত লেখিকা ফ্রানচেস্কা বারাসহ ইতালির অসংখ্য পরিচিত নারীর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি নগ্ন ছবি সম্প্রতি একটি পর্নোগ্রাফিক ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। ঘটনাটি শুধু ইতালিতে নয়, ইউরোপজুড়েই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, কারণ এটি এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার ও নারীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার নতুন এক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন জনপ্রিয় সাংবাদিক ও লেখিকা ফ্রানচেস্কা বারা একদিন হঠাৎ করেই নিজের এআই-তৈরি নগ্ন ছবি একটি পর্ন সাইটে দেখতে পান। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বারা বলেন, “আমার ছোট মেয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল— ‘তুমি কেমন অনুভব করছ?’ কিন্তু আমি জানি, তার প্রকৃত প্রশ্ন ছিল— ‘যদি আমার সঙ্গেও এমন ঘটত, আমি কীভাবে তা সামলাতাম?’” এই কথাগুলোই সমাজে প্রযুক্তিনির্ভর যৌন সহিংসতার গভীর মানসিক অভিঘাতকে স্পষ্ট করে তোলে।
‘সোশ্যাল মিডিয়া গার্লস’ নামের সেই ফোরামটিতে ৭ মিলিয়নেরও বেশি সাবস্ক্রাইবার রয়েছে। সেখানে “ইতালিয়ান সেলিব্রিটি নিউডস” নামে একটি বিশেষ বিভাগে এআই-নির্মিত নারী সেলিব্রেটিদের নগ্ন ছবি প্রকাশ করা হচ্ছে। এর আগে ‘মিয়া মগলিয়ে’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপ এবং ‘ফিকা’ নামের ওয়েবসাইটেও একই ধরনের ছবি প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে নারীদের সম্মানহানিকর মন্তব্যের সঙ্গেও সেসব ছবি প্রচার করা হতো।
ফ্রানচেস্কা বারা, যিনি রেটে-৪ চ্যানেলের একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক টকশো পরিচালনা করেন, তিনি প্রথম ইতালীয় সেলিব্রিটি হিসেবে ওই ওয়েবসাইটের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক আইনি ব্যবস্থা নেন। তার এই উদ্যোগের পর অন্যান্য অনেক নারীও সাহস পাচ্ছেন নিজেদের অধিকার রক্ষায় কথা বলতে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সাইটে শুধু বারার নয়, বরং কিংবদন্তি অভিনেত্রী সোফিয়া লরেন এবং আরও কয়েকজন জনপ্রিয় নারীরও ‘নগ্ন ছবি’ প্রকাশিত হয়েছে।
বারার এই আইনি লড়াইয়ে সহায়তা করছে আনামারিয়া বারানারডিনি ডে পেস নামের একটি আইন ফার্ম। প্রতিষ্ঠানটির আইনজীবী ডানিয়েলা কাপুটো বলেন, “এই সমস্যার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো তরুণ নারীরা মামলায় অংশ নিতে ভয় পান। অনেকেই ভাবেন, আইনি পদক্ষেপ নিলে তাদের সামাজিক মর্যাদা, পেশাগত ভবিষ্যৎ এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। এছাড়া অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণেও অনেক ক্ষতিগ্রস্ত নারী মামলা চালিয়ে যেতে পারেন না।”
এই পরিস্থিতিতে ইতালি ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রথম দেশ হিসেবে এআই নিয়ন্ত্রণে একটি বিস্তৃত আইন পাস করেছে। নতুন এই আইনে বলা হয়েছে, কেউ যদি এআই-তৈরি বা পরিবর্তিত যৌন কনটেন্ট ব্যবহার করে অন্যের সুনাম ক্ষুণ্ন করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি— এমনকি কারাদণ্ড পর্যন্ত— দেওয়া যেতে পারে।
তবে আইনজীবী কাপুটোর মতে, “সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এই কনটেন্টগুলোর উৎস খুঁজে বের করা।” অনেক প্ল্যাটফর্ম বিদেশে অবস্থিত হওয়ায়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর পক্ষে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ফ্রানচেস্কা বারা মনে করেন, এখনই রাজনৈতিকভাবে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে। তিনি বলেন, “এই সমস্যা শুধু ব্যক্তিগত মর্যাদাহানির নয়, এটি এক ধরনের ডিজিটাল সহিংসতা, যা মানুষকে মানসিকভাবে ভেঙে দিতে পারে।”
বারা ২০১৩ সালের এক মর্মান্তিক ঘটনার উদাহরণ টেনে সতর্ক করেছেন— সেই বছর ১৪ বছর বয়সী ক্যারোলিনা পিচিও নামের এক কিশোরী সামাজিক মাধ্যমে নিজের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর মানসিক চাপে আত্মহত্যা করেছিলেন। “এই ধরনের ডিজিটাল অপরাধ প্রাণঘাতী হতে পারে,” বলেন বারা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনাটি শুধু ইতালির নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি যেমন মানুষের সৃজনশীলতা ও উন্নয়নের হাতিয়ার হতে পারে, তেমনি নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারে এটি পরিণত হতে পারে এক ভয়াবহ অস্ত্রে— যা এক নিমিষে কারও সুনাম, কর্মজীবন, এমনকি জীবনও কেড়ে নিতে পারে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান










