শূকরের কিডনি নিয়ে ২৭১ দিন বেঁচে থাকা টিম অ্যান্ড্রুজ, অবশেষে অপসারণ করা হলো অঙ্গটি
- Update Time : ০৯:০৬:৫২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫
- / ১৭৭ Time View

শূকরের কিডনি নিয়ে ২৭১ দিন বেঁচে থাকা টিম অ্যান্ড্রুজ, অবশেষে অপসারণ করা হলো অঙ্গটি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সাক্ষী টিম অ্যান্ড্রুজ। জেনেটিকভাবে পরিবর্তিত শূকরের কিডনি নিয়ে ২৭১ দিন বেঁচে থেকে তিনি মানব ইতিহাসে সর্বাধিক সময় বেঁচে থাকার রেকর্ড গড়েছেন। তবে অবশেষে সেই কিডনি শরীর থেকে অপসারণ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এক প্রতিবেদনে জানায়, ম্যাসাচুসেটস জেনারেল ব্রিগহ্যাম হাসপাতালের চিকিৎসকেরা অ্যান্ড্রুজের শরীর থেকে কিডনিটি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সরিয়ে ফেলেন। চিকিৎসকদের মতে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শূকরের ওই কিডনির কার্যকারিতা ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছিল, ফলে রোগীর শরীরে টক্সিন জমা হতে শুরু করে। নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে আবার ডায়ালাইসিসে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
জেনেটিকভাবে পরিবর্তিত অঙ্গের অভূতপূর্ব সাফল্য
৬৭ বছর বয়সী অ্যান্ড্রুজ যুক্তরাষ্ট্রে এমন চতুর্থ জীবিত ব্যক্তি, যার শরীরে জিন-সম্পাদিত শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল। একে চিকিৎসা পরিভাষায় বলা হয় ‘জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন’—অর্থাৎ প্রাণীর অঙ্গ মানবদেহে প্রতিস্থাপন।
এই অঙ্গটি তৈরি করতে শূকরের জিনে বিশেষভাবে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, যাতে মানবদেহে প্রবেশের পর ইমিউন সিস্টেম সেটিকে ‘বহিরাগত’ হিসেবে চিনে না নেয়। চিকিৎসকরা জানান, কিডনিটি প্রাথমিকভাবে অত্যন্ত ভালোভাবে কাজ করেছিল এবং এটি মানবদেহে সংযুক্তির পর থেকে কোনো বড় জটিলতা দেখা যায়নি।
একঘেয়ে জীবন থেকে পরীক্ষামূলক সাহসিকতায়
১৯৯০-এর দশক থেকেই ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন টিম অ্যান্ড্রুজ। প্রায় তিন বছর আগে তার দুটি কিডনিই পুরোপুরি অকেজো হয়ে যায়। তারপর থেকে তিনি সপ্তাহে তিন দিন, প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা করে ডায়ালাইসিসে জীবন কাটাচ্ছিলেন।
তিনি বলেন, “প্রতিদিন একই যন্ত্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা—এ যেন জীবনের থেকেও মৃত্যু বেশি।” এই মানসিক ক্লান্তিই তাকে ঝুঁকিপূর্ণ জেনোট্রান্সপ্লান্ট প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করে।
তার ভাষায়, “আমি জানতাম ঝুঁকি আছে, কিন্তু
‘আমি আবার বেঁচে উঠেছিলাম’
সিএনএনের ডকুমেন্টারি ‘অ্যানিমেল ফার্মা’-তে অ্যান্ড্রুজ বলেন, কিডনি প্রতিস্থাপনের পর তার শরীর যেন নতুন প্রাণশক্তি ফিরে পেয়েছিল।
তিনি বলেন, “আমি আবার রান্না করতে শুরু করি, নিজের ঘর পরিষ্কার করি, এমনকি আমার কুকুর কাপকেককে নিয়ে হাঁটতে বের হতাম। এতদিন পর মনে হয়েছিল—আমি আবার বেঁচে উঠেছি।”
তার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি ছিল গত জুনে বোস্টনের ফেনওয়ে পার্কে রেড সক্স দলের খেলার আগে প্রথম বল ছোড়ার সুযোগ পাওয়া। কিডনি প্রতিস্থাপনের পর সেটিই ছিল তার প্রথম বড় জনসমাগমে উপস্থিতি, যা নিয়ে তিনি অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত ছিলেন।
‘উইলমা’ নামের সেই শূকরের প্রতি শ্রদ্ধা
ফেসবুকে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে টিম অ্যান্ড্রুজ লিখেছেন, “এই যাত্রা ছিল কষ্টে ভরা, অজানা সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তবুও আমি গর্বিত—এই ৯ মাসে আমরা অনেক কিছু শিখেছি।”
তিনি আবেগভরে লেখেন, “আমি কৃতজ্ঞ সেই শূকরটির প্রতি, যার কিডনি আমাকে নতুন জীবন দিয়েছিল। তার নাম ছিল উইলমা। সে আমার নায়িকা, আমার জীবনের অংশ হয়ে থাকবে চিরকাল।”
ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা
বর্তমানে টিম অ্যান্ড্রুজ আবার ডায়ালাইসিসে ফিরেছেন এবং মানব কিডনি প্রতিস্থাপনের অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ কিডনি প্রতিস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছেন—যা দেশটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিম অ্যান্ড্রুজের ঘটনা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন আশা জাগিয়েছে। যদিও শূকরের অঙ্গ মানবদেহে পুরোপুরি কার্যকর রাখার প্রযুক্তি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে, তবুও এ পরীক্ষাটি প্রমাণ করেছে—প্রাণীর অঙ্গ ব্যবহার করে মানবজীবন দীর্ঘায়িত করা ভবিষ্যতে বাস্তবসম্ভব হতে পারে।
ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন ড. লিওনার্ড কিম বলেন, “টিম অ্যান্ড্রুজের সাহস ও সহনশীলতা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে। তার কারণে আমরা বুঝতে পেরেছি—জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন শুধু কল্পনা নয়, এটি একদিন সাধারণ চিকিৎসা হতে পারে।”











