ভুয়া জুলাই-যোদ্ধাদের তালিকা প্রকাশ, ১২৭ জনের গেজেট বাতিলের সিদ্ধান্ত
- Update Time : ০৮:৪৭:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫
- / ১৯২ Time View

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ না নিয়েও “জুলাই-যোদ্ধা” হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি পাওয়া ১০৪ জনকে ভুয়া ঘোষণা করেছে সরকার। এ ছাড়া একই ব্যক্তির নামে একাধিকবার গেজেট প্রকাশ হওয়ায় আরও ২৩ জনের একটি করে গেজেট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ১২৭ জনের নামের সরকারি গেজেট বাতিল করতে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
সরকারি যাচাই-বাছাইয়ে উঠে এসেছে, এসব ব্যক্তিরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনে অংশ নেননি বা আহত হননি। অথচ তারা আহত জুলাই-যোদ্ধা হিসেবে ভুয়া তথ্য দিয়ে সরকারি সুবিধা নিয়েছেন। জেলা কমিটিগুলোর সুপারিশে মন্ত্রণালয় এসব গেজেট বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারি করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আট বিভাগে ভুয়া জুলাই-যোদ্ধাদের তালিকা
সরকারি তদন্তে দেখা গেছে, দেশের আট বিভাগেই এমন ভুয়া জুলাই-যোদ্ধা পাওয়া গেছে।
- ময়মনসিংহ বিভাগে ২০ জন ভুয়া এবং ১ জনের নামে দুবার গেজেট হয়েছে।
- সিলেট বিভাগে ২৬ জন ভুয়া এবং ১ জনের নামে দ্বৈত গেজেট।
- চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৪ জন ভুয়া এবং ৪ জনের নামে দুটি করে গেজেট।
- খুলনা বিভাগে ৫ জন ভুয়া এবং ৪ জনের নামে দুবার গেজেট।
- রংপুর বিভাগে ২ জন ভুয়া জুলাই-যোদ্ধা।
- ঢাকা বিভাগে ৭ জন ভুয়া এবং ৭ জনের নামে দ্বৈত গেজেট।
- রাজশাহী বিভাগে ৯ জন ভুয়া ও ৪ জনের নামে দুটি করে গেজেট।
- বরিশাল বিভাগে ২ জনের নামে দুটি করে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে।
সব মিলিয়ে ১২৭ জনের নামের মধ্যে ২৩ জনের নামে দ্বৈত গেজেট প্রকাশ হয়েছিল; বাকি ১০৪ জন সম্পূর্ণ ভুয়া—তারা আন্দোলনে অংশ নেয়নি, আহতও হয়নি।
জেলা কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে প্রতারণার চিত্র
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিটি জেলা কমিটি তাদের যাচাই-বাছাই শেষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ময়মনসিংহ বিভাগের তালিকায় দেখা যায়, সেখানে সৈয়দ তরিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ নুরুল আমিন, তানভীর আহমেদ, আছিয়া খাতুন, রুহুল আমিনসহ ২০ জনের নাম ভুয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
একইভাবে ঢাকা বিভাগের তালিকায় রয়েছেন রাসেল, খন্দকার রাজ, রাফিউল নাঈম, রাশেদুল ইসলাম অনিক, আব্দুল্লাহ আল রাহাত, মঞ্জমুল আলম জিসান, সাইফুল ইসলাম শুভসহ আরও অনেকে।
চট্টগ্রাম বিভাগের ৩৫ জনের তালিকায় আছেন মো. শাগর, আবদুল্লাহ আল নোমান, নাইম উদ্দীন শাঈদ, শাহাদাত ইকবাজ তাহনি, তাহমিনা ইকরার তারকি, মাহাবী তাজওয়ার, জসিম উদ্দিন, মো. আতিকুল ইসলামসহ বহুজন।
‘জুলাই-যোদ্ধা’ পরিচয়ে ভুয়া সুবিধা গ্রহণ
সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর এসব ভুয়া জুলাই-যোদ্ধা এককালীন অর্থসহ নানা সুবিধা ভোগ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে চিকিৎসা সহায়তা, ভাতা, এমনকি চাকরির কোটা সুবিধাও। এসব অনিয়ম নিয়ে গণমাধ্যমে সমালোচনা ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করে মন্ত্রণালয়।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম (বীর প্রতীক) বলেন, “যারা আন্দোলনে অংশ নেননি, অথচ মিথ্যা তথ্য দিয়ে জুলাই-যোদ্ধা হিসেবে সুবিধা নিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেউ যাতে রাষ্ট্রের অর্থের অপব্যবহার করতে না পারে, সেটিই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য।”
গেজেট পরিসংখ্যান
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের মধ্যে—
- ক শ্রেণিতে (অতি গুরুতর আহত): ৬০২ জন
- খ শ্রেণিতে (গুরুতর আহত): ১,১১৮ জন
- গ শ্রেণিতে (আহত): ১২,০৮০ জন
- নিহত: ৮৪৪ জন
মোট ১৪,৬৩৬ জনের নাম সরকারি গেজেটে প্রকাশ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৮ জন নিহত জুলাই-যোদ্ধার নামের গেজেট আগেই বাতিল করা হয়েছে। এবার নতুন করে ১২৭ জনের গেজেট বাতিলের প্রক্রিয়া চলছে।
‘প্রমাণ মিলেছে, এবার আইনি ব্যবস্থা’
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তর) মোহাম্মদ ফারুক হোসেন বলেন, “যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তাদের বিষয়ে তদন্ত করে আমরা প্রমাণ পেয়েছি। এখন ধাপে ধাপে তাদের গেজেট বাতিল করা হবে। বাতিলের পর রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “অনেকে প্রশ্ন তুলছেন—ভুয়া জুলাই-যোদ্ধারা যে এককালীন অর্থ নিয়েছেন, তা ফেরত আনা সম্ভব হবে কি না। আমাদের অবস্থান পরিষ্কার—প্রথমে গেজেট বাতিল হবে, তারপর আইনি পথে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সরকারের বার্তা: অনিয়মের সুযোগ আর নয়
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, জুলাই-যোদ্ধা তালিকাকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য রাখতে ভবিষ্যতে ডিজিটাল যাচাই ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে একাধিকবার বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে কেউ তালিকাভুক্ত হতে পারবে না।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে নতুন করে কেউ যাতে রাজনৈতিক সুযোগ না নেয়, সে বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, “জুলাই-যোদ্ধা নামের সম্মান যারা প্রতারণা করে দখল করেছে, তারা রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে—তাদের শাস্তি হবে উদাহরণস্বরূপ।”











