ভৈরবে উপকূল এক্সপ্রেসে পাথর নিক্ষেপ: জনগনের জানমালের নিরাপত্তা কোথায়?
- Update Time : ০৯:৫৩:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৫
- / ১২১ Time View

ভৈরব উপজেলাকে ‘জেলা’ ঘোষণার দাবিতে বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীদের পাথর নিক্ষেপে উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় দায়ের হয়েছে মামলা, গ্রেপ্তারও হয়েছে তিনজন। কিন্তু এ ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে দেশের রেলপথে যাত্রী নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি এবং আন্দোলনের নামে সহিংসতার জটিল বাস্তবতা।
রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার মো. ইউসুফ বাদী হয়ে সোমবার (২৭ অক্টোবর) রাতে রেলওয়ে থানায় ১৫০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। মামলার পর রাতেই রেলওয়ে থানা পুলিশ ও রেলওয়ে গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) যৌথ অভিযান চালিয়ে তিন কিশোরকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—ভৈরব পৌর এলাকার পঞ্চবটী বউবাজারের সাগর মিয়া ওরফে ফহিম (১৭), সাজন মিয়া (১৭) ও আরমান মিয়া (১৭)। মঙ্গলবার দুপুরে আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
ঘটনার বিবরণ
সোমবার সকাল ১০টা ২৫ মিনিটে নোয়াখালী থেকে ঢাকাগামী আন্তঃনগর ননস্টপ উপকূল এক্সপ্রেস ভৈরব রেলওয়ে জংশনে পৌঁছালে, “ভৈরবকে ৬৫তম জেলা ঘোষণা” দাবিতে আন্দোলনরত বিক্ষোভকারীরা ট্রেনটি আটকে দেয়। প্রায় এক ঘণ্টা ১০ মিনিট ট্রেনটি অবরুদ্ধ রাখার পর ট্রেনটি হুইসেল বাজিয়ে চলার চেষ্টা করলে ক্ষিপ্ত আন্দোলনকারীরা ট্রেনে অবিরাম পাথর নিক্ষেপ শুরু করে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, এতে ট্রেনের লুকিং গ্লাস, হেডলাইট, সাইড গ্লাসসহ প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার সরকারি সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একাধিক যাত্রী আহত হন, গুরুতর আহত একজনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
স্টেশন মাস্টার মো. ইউসুফ বলেন, “আমরা আন্দোলনকারীদের একাধিকবার অনুরোধ করেছি ট্রেনটি অবরুদ্ধ না করতে। কিন্তু তারা কথা না শুনে হঠাৎ পাথর ছুড়তে শুরু করে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ট্রেনের সামনের অংশ ভেঙে যায়। স্থানীয় প্রশাসন ও রেলওয়ে পুলিশের সহযোগিতায় অবশেষে দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।”
রেলওয়ে পুলিশের বক্তব্য
ভৈরব রেলওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সাঈদ আহমেদ বলেন, “ঘটনার পরপরই রেলওয়ে পুলিশ দ্রুত অভিযান চালায়। সিসিটিভি ফুটেজ ও স্থানীয় তথ্যের ভিত্তিতে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের শনাক্তে কাজ চলছে। রেলপথে যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।”
রেলপথে নিরাপত্তাহীনতার চিত্র
ভৈরব থেকে নরসিংদী পর্যন্ত রেলপথে গত তিন বছরে অন্তত তিনটি পাথর নিক্ষেপ ও নাশকতার মামলা হয়েছে। এর বাইরে আরও কয়েকটি ঘটনায় ট্রেনের কাচ ভাঙা, ট্রেন থামিয়ে বিক্ষোভ এবং লাইন অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কিছু আসামি গ্রেপ্তার হলেও দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা পরিকল্পনার অভাব এখনো প্রকট।
রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি ঘটনায় তাৎক্ষণিক অভিযান চালালেও স্থায়ী সমাধান না থাকায় একই সমস্যা বারবার ঘটছে। ট্রেনের ভেতরে যাত্রীদের সচেতন করার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
স্থানীয় রাজনীতি ও আন্দোলনের চিত্র
ভৈরবকে জেলা ঘোষণার দাবিটি দীর্ঘদিনের। স্থানীয় নেতারা দাবি করছেন, ভৈরবের প্রশাসনিক গুরুত্ব ও অর্থনৈতিক অবস্থান জেলা হওয়ার উপযুক্ত। তবে সাম্প্রতিক বিক্ষোভগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব ও সংগঠিত উস্কানির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
একজন স্থানীয় নাগরিক বলেন, “ভৈরবকে জেলা করা হোক—এ দাবি যৌক্তিক। কিন্তু ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ, যাত্রীদের আতঙ্কিত করা, সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করা—এসব আন্দোলনের ভাষা হতে পারে না। এতে বরং দাবি দুর্বল হয়ে পড়ে, মানুষ দূরে সরে যায়।”
প্রশ্ন রয়ে যায়—জানমালের নিরাপত্তা কোথায়?
রেলওয়ে দেশজুড়ে সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ গণপরিবহন হিসেবে বিবেচিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাথর নিক্ষেপ, লাইন অবরোধ ও ধ্বংসাত্মক কর্মসূচির কারণে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক বেড়েছে।
একাধিক যাত্রী বলেন, “রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসন যদি আগেই কঠোর অবস্থান নিত, তাহলে এমন ঘটনা ঘটত না। আমরা চাই রেলযাত্রা হোক নিরাপদ, রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার নয়।”
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানায়, সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ভৈরব-নরসিংদী রেলপথে বিশেষ নিরাপত্তা অভিযান ও কমিউনিটি ওয়াচ প্রোগ্রাম চালুর প্রস্তুতি চলছে।
তবে মূল প্রশ্নটি থেকেই যায়—যখন আন্দোলনের নামে সহিংসতা সাধারণ মানুষের ওপর নেমে আসে, তখন মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?











