স্ত্রীকে দিয়ে এসপি ও ওসির বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ সদর দপ্তর
- Update Time : ০৭:৫৪:০৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৫
- / ১৫৩ Time View

স্ত্রীকে দিয়ে এসপি ও ওসির বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ সদর দপ্তর
বিভাগীয় শাস্তি এড়াতে কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন এসআই মনিরুজ্জামান, অভিযোগ সদর দপ্তরের
গাইবান্ধার এসআই মনিরুজ্জামান সম্প্রতি নিজের স্ত্রীকে দিয়ে পুলিশ সুপার (এসপি) ও থানার অফিসার ইনচার্জের (ওসি) বিরুদ্ধে মামলা করিয়ে পুরো পুলিশ বিভাগে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, তিনি মূলত নিজের বিরুদ্ধে চলমান বিভাগীয় তদন্ত ও সম্ভাব্য শাস্তি থেকে বাঁচতেই এই কৌশল নিয়েছেন। এখন ঘটনাটির তদন্তে নেমেছে পুলিশ সদর দপ্তর।
মামলা দায়েরের পটভূমি
গত ২২ অক্টোবর গাইবান্ধা জেলা আমলী আদালতে এসআই মনিরুজ্জামানের স্ত্রী কাজলি খাতুন বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, তার স্বামীর মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ অবৈধভাবে আটক করা হয়েছে। মামলায় গাইবান্ধার পুলিশ সুপার নিশাত এঞ্জেলা, সদর থানার ওসি শাহিনুর ইসলাম এবং তার স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা জনৈক তারিকুজ্জামান তুহিনকে আসামি করা হয়। আদালত মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)।
সদর দপ্তরের অবস্থান
পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া ও প্ল্যানিং শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, “পুলিশের নিজস্ব চেইন অব কমান্ড রয়েছে। এসআই মনিরুজ্জামান সেটির কোনো তোয়াক্কা করেননি। বরং নিজের দোষ ঢাকতে এবং শাস্তি এড়াতে তিনি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে নিতে চেয়েছেন।” তিনি আরও জানান, এই ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে এবং সদর দপ্তর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
ঘটনার সূত্রপাত
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ২৫ মার্চ লালমনিরহাটের পাটগ্রাম থানার বুড়িমারি গ্রামের বাসিন্দা তারিকুজ্জামান তুহিন গাইবান্ধার পুলিশ সুপারের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে বলা হয়, গাইবান্ধা সদর থানার এসআই মনিরুজ্জামান “বাংলা খবর ১৯৭১” নামে একটি ভুয়া ফেসবুক পেজ খুলে সেখানে তার নামে নানা কুৎসা ও অপপ্রচার চালাচ্ছেন। এ ঘটনায় পাটগ্রাম থানা পুলিশ তুহিনকে আটক করলেও পরে ভুল বোঝাবুঝি বুঝতে পেরে তাকে ছেড়ে দেয়।
অভিযোগ পাওয়ার পর গাইবান্ধার এসপি নিশাত এঞ্জেলা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেন এবং সদর থানার ওসি শাহিনুর ইসলামের মাধ্যমে এসআই মনিরুজ্জামানকে ডেকে পাঠান।
জিজ্ঞাসাবাদ ও ফরেনসিক পরীক্ষা
সূত্র জানায়, এসপি কার্যালয়ে উপস্থিত অন্যান্য কর্মকর্তার সামনে এসআই মনিরুজ্জামানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তার কথাবার্তা অসংলগ্ন মনে হয়। এরপর তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও লেনোভো ল্যাপটপ জব্দ করে জিডি করা হয় এবং ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সেগুলো ঢাকার সিআইডি সদর দপ্তরে পাঠানো হয়।
প্রাথমিক তদন্তে সন্দেহজনক তথ্য পাওয়ায় তাকে গাইবান্ধা জেলা থেকে রাজশাহী রেঞ্জে বদলি করা হয় এবং পরবর্তীতে জয়পুরহাটে পদায়ন দেওয়া হয়।
বিপরীতে পাল্টা মামলা
বদলি হওয়ার কয়েক মাস পর, ২২ অক্টোবর, মনিরুজ্জামানের স্ত্রী কাজলি খাতুন তার স্বামীর পক্ষ নিয়ে মামলা করেন। এতে তিনি দাবি করেন, এসপি ও ওসি বেআইনিভাবে তার স্বামীর মোবাইল ও ল্যাপটপ আটকে রেখেছেন এবং তাকে হয়রানি করছেন।
তবে পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, এটি আসলে তদন্তকে বিভ্রান্ত করার একটি কৌশল। সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, “এসআই মনিরুজ্জামানের ব্যবহৃত ফেসবুক পেজে বিভিন্ন ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে মিথ্যা তথ্য দিয়ে পোস্ট করা হতো। এরপর ওই ব্যক্তিদের কাছ থেকে পোস্ট মুছে ফেলার নামে অর্থ আদায় করা হতো। এটি একটি সুসংগঠিত অনলাইন ব্ল্যাকমেইল চক্রের অংশ ছিল। এই তদন্তকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে তিনি তার স্ত্রীকে দিয়ে মামলা করিয়েছেন।”
ওসির বক্তব্য
গাইবান্ধা সদর থানার ওসি শাহিনুর ইসলাম বলেন, “মনিরুজ্জামানের মোবাইল ও ল্যাপটপ কেউ গোপনে আটক করেনি। তার উপস্থিতিতেই সেগুলো জব্দ ও জিডি করা হয়েছে এবং নিয়ম অনুযায়ী সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে। তিনি হয়তো বিভাগীয় শাস্তি এড়াতে এই মামলার আশ্রয় নিয়েছেন।”
এসপির অবস্থান
গাইবান্ধার পুলিশ সুপার নিশাত এঞ্জেলা বলেন, “যেহেতু বিষয়টি এখন পুলিশ সদর দপ্তর দেখছে, তাই এ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত কোনো মন্তব্য করার সুযোগ নেই।”
সমগ্র চিত্র
পুলিশ সদর দপ্তর ইতোমধ্যে পুরো ঘটনার ওপর একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এটি একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা ছিল বিভাগীয় তদন্তকে বাধাগ্রস্ত করা ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে।
অন্যদিকে, পিবিআই আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী মামলা তদন্ত শুরু করেছে। ফলে এখন দুটি সমান্তরাল তদন্ত চলছে—একটি পুলিশ সদর দপ্তরের, অন্যটি পিবিআইয়ের।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ এমন জটিল ঘটনায় পুরো বিভাগই এখন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, পদমর্যাদা যাই হোক না কেন।











