মেট্রোরেল দুর্ঘটনা: জীবনের দাম ৫ লাখ, রক্ষণাবেক্ষণের ব্যর্থতা,নিরাপত্তার দায়িত্ব কার?
- Update Time : ০৭:০৭:৫৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৫
- / ১৮১ Time View

রাজধানীর ফার্মগেটে মেট্রোরেলের নিচে এক পথচারীর মৃত্যুর ঘটনায় বেরিয়ে আসছে চরম রক্ষণাবেক্ষণ ব্যর্থতার চিত্র। কম্পন নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত ভারী স্প্রিং বা ‘বিয়ারিং প্যাড’ এর আগেও খুলে পড়েছিল—তখন প্রাণহানি ঘটেনি, কিন্তু এবারের অবহেলা কেড়ে নিল একজন নিরীহ মানুষের জীবন। পথচারীর মৃত্যু দেশের গণমাধ্যম ও জনমতকে আতঙ্কিত করেছে। নিহত আবুল কালামের পরিবারকে প্রাথমিকভাবে ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে এবং পরিবারের কোনো কর্মক্ষম সদস্য থাকলে তাকে মেট্রোরেলে চাকরির ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক ও রেল উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান।
রোববার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, “নিহতের পরিবারের সব দায়-দায়িত্ব মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করবে। আহতদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা চাই, এমন দুর্ঘটনা আর কখনো যেন না ঘটে। এ ধরনের ঘটনা আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।”
দুর্ঘটনায় সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আব্দুর রউফকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে।

দুর্ঘটনার বিবরণ
ফার্মগেট মেট্রো স্টেশন সংলগ্ন বাংলাদেশ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটের সামনে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঘটে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ফুটপাত দিয়ে ব্যাগ হাতে হাঁটছিলেন আনুমানিক ৩৫–৪০ বছর বয়সী যুবক আবুল কালাম। হঠাৎ মেট্রোরেলের ওপর থেকে প্রায় ৪০–৫০ কেজি ওজনের স্প্রিং বা ‘বিয়ারিং প্যাড’ ছিটকে পড়ে তার মাথায় আঘাত করলে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।
ঘটনার পর ছিটকে পড়া স্প্রিংটি পাশের একটি চাপ-সিঙ্গারা দোকানেও আঘাত করে দোকানের কাঁচ ভেঙে দেয়, এতে আরও দুইজন আহত হন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রেন চলাচলের সময় অস্বাভাবিক কম্পন এবং শব্দ আগে থেকেই লক্ষ্য করা যাচ্ছিল।
নিহতের আবুল কালামের বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ঈশরপাটি গ্রামে। পরিবারের সদস্যরা গভীর শোকাহত। স্থানীয়রা বলছেন, এমন দুর্ঘটনা পরিবারে এক অমূল্য জীবনের ক্ষতি করেছে এবং সড়কপথে চলাচলকারীদের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রক্ষণাবেক্ষণের ব্যর্থতা
এই দুর্ঘটনা আগের সতর্কবার্তাকে আরও তীব্রভাবে স্মরণ করিয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আগারগাঁও-মতিঝিল রুটে একই ধরনের বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়েছিল। তখন সেবার কেউ প্রাণ হারাননি, তবে প্রকৌশলীরা সতর্ক করেছিলেন যে বোল্ট সংযোগ ও চাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ত্রুটি রয়েছে। কিন্তু যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় এবার প্রাণহানি ঘটল।
মেট্রোরেলের কম্পন নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত এই ভারী স্প্রিং বা বিয়ারিং প্যাড ট্রেন চলাচলের সময় লাইনের কম্পন শোষণ করে কাঠামোর স্থিতি রক্ষা করে। প্রকৌশল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই যন্ত্রাংশের বোল্ট সংযোগ মাসিক ভিত্তিতে পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক। নিয়মিত পরিদর্শনের অভাবে স্প্রিংটি দীর্ঘদিনের কম্পনে আলগা হয়ে পড়ে এবং হঠাৎ ছিটকে পড়ে এই প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটায়।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, স্প্রিংটি মেকানিক্যাল প্রেসারে খুলে পড়েছিল। তবে প্রকৌশল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোনো আকস্মিক ত্রুটি নয়, বরং দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণ ঘাটতির ফল।
জনমত ও বিশেষজ্ঞের মন্তব্য
ফার্মগেট এলাকার দোকানদার ও স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, দুর্ঘটনার আগে কয়েক দিন ধরে ট্রেন চলাচলের সময় অস্বাভাবিক শব্দ ও কম্পন লক্ষ্য করা গিয়েছিল। কিন্তু বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়। এলাকাবাসীর মতে, মেট্রোরেলের নিচ দিয়ে চলাচল এখন আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, “বিয়ারিং প্যাডের মতো ভারী অংশ ছিটকে পড়া মানে নিয়মিত পরিদর্শন ব্যবস্থার ব্যর্থতা। আগের ঘটনায় যদি সব সংযোগ পুনরায় পরীক্ষা করা হতো, তাহলে এ দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় এই ধরনের দুর্ঘটনা পূর্বাভাসহীন হয়ে দাঁড়ায়।”
বিশেষজ্ঞরা আরও উল্লেখ করেছেন, মেট্রোরেল অবকাঠামো নির্মাণে সাফল্য সত্ত্বেও রক্ষণাবেক্ষণে বড় দুর্বলতা রয়েছে। একবার স্প্রিং খুলে পড়ার পরও যথাযথ অনুসন্ধান বা যান্ত্রিক পর্যালোচনা না হওয়ায় এই প্রাণহানি ঘটেছে। শুধুমাত্র একজন জীবনহানি নয়, এটি মেট্রোরেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর গভীর প্রশ্ন তুলেছে।
দায়িত্ব ও প্রতিকার
সড়ক ও রেল উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, নিহত ব্যক্তির পরিবারকে প্রাথমিকভাবে ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে এবং পরিবারে কর্মক্ষম কেউ থাকলে তাকে মেট্রোরেলে চাকরি দেওয়া হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষতিপূরণ এবং চাকরির ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। বড় চ্যালেঞ্জ হলো—মেট্রোরেলের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং পুনরায় এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা।
এছাড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে, বিশেষজ্ঞরা মাসিক ও ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে পরিদর্শন এবং যান্ত্রিক পরীক্ষার রিপোর্ট প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলছেন। জনগণ এখন মেট্রোরেলের নিরাপত্তা এবং দায়বদ্ধতা সম্পর্কে তীব্র প্রশ্ন তুলছে।











