সময়: বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফ্রান্সে প্রথমবারের মতো এক নারীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৭:৩৮:০৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৫
  • / ১৭৩ Time View

aac81a60 b0e7 11f0 ba75 093eca1ac29b 20251024231013

aac81a60 b0e7 11f0 ba75 093eca1ac29b 20251024231013
লোলা ডেভিয়েটকে যখন খুন করা হয় তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ১২ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী লোলা ডেভিয়েট-কে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে দাহবিয়া বেনকিরেদ নামে এক নারীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। ফরাসি বিচার ব্যবস্থায় এই শাস্তি বিরল এবং ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো নারী এই সাজা পেলেন। ঘটনাটি পুরো ফ্রান্সকে নাড়া দিয়েছে, বিশেষত সমাজে নারী অপরাধীর এমন ভয়াবহ ভূমিকা দেশটির নাগরিকদের চরমভাবে বিস্মিত করেছে।

২০২২ সালের অক্টোবর মাসে উত্তর-পূর্ব প্যারিসের একটি ভবনের উঠোনে প্লাস্টিকের স্টোরেজ বাক্সের ভেতর লোলার মৃতদেহ উদ্ধার হয়। ময়নাতদন্তে প্রমাণিত হয় যে, মেয়েটিকে ধর্ষণ করার পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। হত্যাকাণ্ডটি ছিল পরিকল্পিত ও নৃশংসতায় ভরপুর, যা বিচারক এবং জুরিদের কাছে “অমানবিক অপরাধ” হিসেবে বিবেচিত হয়।

বিচারক এবং জুরিদের যৌথ প্যানেল ফ্রান্সের আইনে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ শাস্তি—জীবনব্যাপী কারাদণ্ড—আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়। ২৭ বছর বয়সী আলজেরীয় বংশোদ্ভূত বেনকিরেদকে কমপক্ষে ৩০ বছর কারাভোগ করতে হবে, তার পরেই মুক্তির আবেদন করার সুযোগ থাকবে। ফরাসি আইনে এই ধরণের আজীবন কারাদণ্ড সাধারণত সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধের জন্যই সংরক্ষিত থাকে।

ফ্রান্সে এই পর্যন্ত মাত্র কয়েকজনকে এমন শাস্তি দেওয়া হয়েছে—তাদের মধ্যে রয়েছেন কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার ও ধর্ষক মিশেল ফোরনিরেট, এবং ২০১৫ সালের প্যারিস সন্ত্রাসী হামলার অন্যতম অভিযুক্ত সালাহ আবদেসলাম, যাঁর কারণে ১৩০ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান।

লোলা হত্যার পর ফ্রান্সে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে এই ঘটনার রাজনৈতিক প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কারণ অপরাধী বেনকিরেদ ছিলেন আলজেরীয় অভিবাসী, যিনি আগে থেকেই দেশ ত্যাগের নির্দেশপ্রাপ্ত ছিলেন। ফরাসি ডানপন্থী ও অতি-ডানপন্থী রাজনীতিকরা এই ঘটনাকে অভিবাসন নীতির ব্যর্থতা হিসেবে দেখিয়ে সরকারবিরোধী তীব্র সমালোচনা শুরু করেন।

আদালতে লোলার মা ডেলফাইন

ডেভিয়েট এবং ভাই থিবল্ট রায় ঘোষণার সময় উপস্থিত ছিলেন। তাদের চোখে ছিল অশ্রু আর মুখে নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা—ন্যায়বিচারের জন্য যে লড়াই তাঁরা শুরু করেছিলেন, সেটি অবশেষে সফল হলো। তবে লোলার বাবা জোহান ডেভিয়েট, যিনি ২০২৪ সালে ৪৯ বছর বয়সে মারা যান, এই রায়ের দিনটি দেখে যেতে পারেননি।

বিচার প্রক্রিয়ায় প্রসিকিউটর বেনকিরেদকে “অত্যন্ত বিপজ্জনক ও নৈতিকভাবে অবক্ষয়িত” ব্যক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার দাবি জানান। তিনি বলেন, “এই হত্যাকাণ্ড শুধু এক শিশুর নয়, গোটা জাতির বিবেকের ওপর আঘাত।”

রায় ঘোষণার আগে আদালতে দাঁড়িয়ে অভিযুক্ত দাহবিয়া বেনকিরেদ কেঁদে বলেন,

“আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমি জানি, আমি যা করেছি তা ভয়াবহ। আমার আর কিছু বলার নেই।”

তবে তার এই সংক্ষিপ্ত ক্ষমাপ্রার্থনা আদালতের সহানুভূতি অর্জন করতে পারেনি।

এই রায়ের মাধ্যমে ফ্রান্সে নারী অপরাধীদের প্রতি বিচারিক অবস্থান এক নতুন মাত্রা পেল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনাটি শুধু একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড নয়, বরং এটি ফরাসি সমাজে অভিবাসন, নারী অপরাধ, এবং আইনি কঠোরতার এক নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে।

সূত্র: বিবিসি, লে মোঁদ, ফ্রান্স ২৪।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ফ্রান্সে প্রথমবারের মতো এক নারীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

Update Time : ০৭:৩৮:০৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৫
aac81a60 b0e7 11f0 ba75 093eca1ac29b 20251024231013
লোলা ডেভিয়েটকে যখন খুন করা হয় তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ১২ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী লোলা ডেভিয়েট-কে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে দাহবিয়া বেনকিরেদ নামে এক নারীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। ফরাসি বিচার ব্যবস্থায় এই শাস্তি বিরল এবং ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো নারী এই সাজা পেলেন। ঘটনাটি পুরো ফ্রান্সকে নাড়া দিয়েছে, বিশেষত সমাজে নারী অপরাধীর এমন ভয়াবহ ভূমিকা দেশটির নাগরিকদের চরমভাবে বিস্মিত করেছে।

২০২২ সালের অক্টোবর মাসে উত্তর-পূর্ব প্যারিসের একটি ভবনের উঠোনে প্লাস্টিকের স্টোরেজ বাক্সের ভেতর লোলার মৃতদেহ উদ্ধার হয়। ময়নাতদন্তে প্রমাণিত হয় যে, মেয়েটিকে ধর্ষণ করার পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। হত্যাকাণ্ডটি ছিল পরিকল্পিত ও নৃশংসতায় ভরপুর, যা বিচারক এবং জুরিদের কাছে “অমানবিক অপরাধ” হিসেবে বিবেচিত হয়।

বিচারক এবং জুরিদের যৌথ প্যানেল ফ্রান্সের আইনে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ শাস্তি—জীবনব্যাপী কারাদণ্ড—আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়। ২৭ বছর বয়সী আলজেরীয় বংশোদ্ভূত বেনকিরেদকে কমপক্ষে ৩০ বছর কারাভোগ করতে হবে, তার পরেই মুক্তির আবেদন করার সুযোগ থাকবে। ফরাসি আইনে এই ধরণের আজীবন কারাদণ্ড সাধারণত সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধের জন্যই সংরক্ষিত থাকে।

ফ্রান্সে এই পর্যন্ত মাত্র কয়েকজনকে এমন শাস্তি দেওয়া হয়েছে—তাদের মধ্যে রয়েছেন কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার ও ধর্ষক মিশেল ফোরনিরেট, এবং ২০১৫ সালের প্যারিস সন্ত্রাসী হামলার অন্যতম অভিযুক্ত সালাহ আবদেসলাম, যাঁর কারণে ১৩০ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান।

লোলা হত্যার পর ফ্রান্সে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে এই ঘটনার রাজনৈতিক প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কারণ অপরাধী বেনকিরেদ ছিলেন আলজেরীয় অভিবাসী, যিনি আগে থেকেই দেশ ত্যাগের নির্দেশপ্রাপ্ত ছিলেন। ফরাসি ডানপন্থী ও অতি-ডানপন্থী রাজনীতিকরা এই ঘটনাকে অভিবাসন নীতির ব্যর্থতা হিসেবে দেখিয়ে সরকারবিরোধী তীব্র সমালোচনা শুরু করেন।

আদালতে লোলার মা ডেলফাইন

ডেভিয়েট এবং ভাই থিবল্ট রায় ঘোষণার সময় উপস্থিত ছিলেন। তাদের চোখে ছিল অশ্রু আর মুখে নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা—ন্যায়বিচারের জন্য যে লড়াই তাঁরা শুরু করেছিলেন, সেটি অবশেষে সফল হলো। তবে লোলার বাবা জোহান ডেভিয়েট, যিনি ২০২৪ সালে ৪৯ বছর বয়সে মারা যান, এই রায়ের দিনটি দেখে যেতে পারেননি।

বিচার প্রক্রিয়ায় প্রসিকিউটর বেনকিরেদকে “অত্যন্ত বিপজ্জনক ও নৈতিকভাবে অবক্ষয়িত” ব্যক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার দাবি জানান। তিনি বলেন, “এই হত্যাকাণ্ড শুধু এক শিশুর নয়, গোটা জাতির বিবেকের ওপর আঘাত।”

রায় ঘোষণার আগে আদালতে দাঁড়িয়ে অভিযুক্ত দাহবিয়া বেনকিরেদ কেঁদে বলেন,

“আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমি জানি, আমি যা করেছি তা ভয়াবহ। আমার আর কিছু বলার নেই।”

তবে তার এই সংক্ষিপ্ত ক্ষমাপ্রার্থনা আদালতের সহানুভূতি অর্জন করতে পারেনি।

এই রায়ের মাধ্যমে ফ্রান্সে নারী অপরাধীদের প্রতি বিচারিক অবস্থান এক নতুন মাত্রা পেল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনাটি শুধু একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড নয়, বরং এটি ফরাসি সমাজে অভিবাসন, নারী অপরাধ, এবং আইনি কঠোরতার এক নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে।

সূত্র: বিবিসি, লে মোঁদ, ফ্রান্স ২৪।