সময়: বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতিসংঘের ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: অর্জন, ব্যর্থতা ও সংস্কারের অপরিহার্যতা

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ০৯:১৫:৩৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৫
  • / ১৪৯ Time View

7185d2726c9160cd4b7ade6f3acad14d 68fa9ba6e894d

7185d2726c9160cd4b7ade6f3acad14d 68fa9ba6e894d

বিশ্বের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সংস্থা জাতিসংঘ (United Nations – UN) আজ তার ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে। ১৯৪৫ সালের এই দিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর ৫১টি দেশ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল এই সংস্থা। বর্তমানে এর সদস্যসংখ্যা ১৯৩, যার মধ্যে বাংলাদেশ ১৩৬তম সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়। আট দশকের দীর্ঘ পথচলায় জাতিসংঘ মানবাধিকার রক্ষা, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে এসেছে। তবুও এর সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতার প্রশ্নও সমানভাবে আলোচিত হয়ে আসছে। কেউ এর বিশাল অর্জনের দিকে নজর দেন, আবার কেউ সমালোচনা করেন এর সীমাবদ্ধতা ও পক্ষপাতদুষ্ট কাঠামোর কারণে।

জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থাগুলো বিশ্ব উন্নয়নে অসামান্য ভূমিকা রেখেছে। ইউনিসেফ (UNICEF), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP), খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO), ইউনেস্কো (UNESCO) এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP)—এসব সংস্থা দারিদ্র্য দূরীকরণ, ক্ষুধা মোকাবিলা, শিক্ষা বিস্তার, এবং টেকসই উন্নয়নের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। জাতিসংঘের উদ্যোগেই বাস্তবায়িত হয় সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (MDGs), এবং পরবর্তীতে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs), যা বৈশ্বিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। কোটি মানুষের জীবন বাঁচানো, রোগ প্রতিরোধ, দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন এবং শরণার্থী সহায়তায় জাতিসংঘের অবদান অনস্বীকার্য। এইসব কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘ ও তার সহযোগী সংস্থাগুলো একাধিকবার নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করেছে।

তবে জাতিসংঘের এই মহৎ অর্জনের বিপরীতে রয়েছে অসংখ্য ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত। সংস্থাটির কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা ও রাজনৈতিক প্রভাব-নির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এর অন্যতম বড় দুর্বলতা। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্স—সংস্থাটির সিদ্ধান্তে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে। তাদের ‘ভেটো ক্ষমতা’ প্রায়ই জাতিসংঘকে পঙ্গু করে দেয়, ফলে বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব বাস্তবায়নের আগেই থেমে যায়।

১৯৪৫ সালে যখন জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন বিশ্বের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখনকার বিশ্ব ছিল দুই মেরুভিত্তিক, আর আজকের বিশ্ব বহু-মেরুকেন্দ্রিক। কিন্তু জাতিসংঘের কাঠামো সেই প্রেক্ষাপটেই আটকে আছে। পাঁচ স্থায়ী সদস্যের একচ্ছত্র ক্ষমতা আজও অক্ষুণ্ণ। এই অপ্রতিসম কাঠামো জাতিসংঘের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা হ্রাস করেছে।

২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোট জাতিসংঘের অনুমতি ছাড়াই ইরাকে আক্রমণ চালায়—যা আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতার পরিপন্থী ছিল। “বিধ্বংসী অস্ত্রের অস্তিত্ব” নামের মিথ্যা অজুহাতে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ ইরাকের কোটি মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করে তোলে। একইভাবে আফগানিস্তান, লিবিয়া ও সিরিয়ায় পশ্চিমা হস্তক্ষেপের সময়ও জাতিসংঘ কার্যকর ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে ইসরায়েল বারবার গাজা ও পশ্চিম তীরে নির্বিচারে হামলা চালালেও জাতিসংঘের প্রতিক্রিয়া সীমিত থাকে ‘উদ্বেগ প্রকাশ’ বা ‘নিন্দা’ পর্যন্ত। নিরাপত্তা পরিষদে হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব আলোচিত হলেও, ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের নিন্দা বা দণ্ড আরোপে জাতিসংঘ ব্যর্থ।

এই দ্বিচারিতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে ইউক্রেন সংকটে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে জাতিসংঘ ও পশ্চিমা দেশগুলো একযোগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, কিন্তু ফিলিস্তিন কিংবা রোহিঙ্গা সংকটে সেই তৎপরতা দেখা যায় না। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা গণহত্যা প্রতিরোধ কিংবা তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের ভূমিকা আজও কেবল “মানবিক সাহায্য” সীমায় আটকে আছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘ বড় বড় যুদ্ধ প্রতিরোধে সীমিত সাফল্য পেলেও, ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত অনেক। কোরিয়া যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, আফ্রিকার রুয়ান্ডা (১৯৯৪) ও বসনিয়ার স্রেব্রেনিৎসা (১৯৯৫) গণহত্যা প্রতিরোধে জাতিসংঘের ব্যর্থতা আজও ইতিহাসের কালো অধ্যায়। সোমালিয়া, লিবিয়া ও ইরাকে পশ্চিমা আগ্রাসনের সময়ও সংস্থাটির ভূমিকা ছিল নিষ্ক্রিয় দর্শকের মতো।

জাতিসংঘের এই দুর্বলতা মূলত এর প্রাচীন কাঠামো থেকে উদ্ভূত। সাবেক মহাসচিব কফি আনান জাতিসংঘ সংস্কারের জন্য একটি দশ দফা কর্মপরিকল্পনা প্রস্তাব করেছিলেন, যেখানে জবাবদিহিতা, বাজেট দক্ষতা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে গতি আনতে আহ্বান জানানো হয়। তার আগেও বুতরোস বুতরোস-ঘালি সংস্থাটির কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছিলেন, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতিসংঘের অদক্ষতা ও কার্যহীনতার মূল কারণ হলো এর প্রতিনিধিত্ব কাঠামোর অসমতা, অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও বড় শক্তিগুলোর অযাচিত প্রভাব।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ), যা জাতিসংঘের প্রধান বিচারিক অঙ্গ, বর্তমানে বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে রয়েছে। ২০২৪ সালে এই আদালত ইসরায়েলের ফিলিস্তিন দখল অবৈধ ঘোষণা করলেও সেই রায় কার্যকর করার কোনো ক্ষমতা তাদের নেই। কারণ, এর বাস্তবায়ন সম্পূর্ণ নির্ভর করে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। একইভাবে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) ইসরায়েলের মতো অ-এনপিটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণেও কার্যত অক্ষম।

এইসব দ্বৈত নীতি ও ব্যর্থতা উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে জাতিসংঘের প্রতি আস্থা নষ্ট করেছে। ভারত, ব্রাজিল, তুরস্ক ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলো এখন নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ সম্প্রসারণসহ কাঠামোগত সংস্কারের দাবি তুলেছে, যাতে বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়।

জাতিসংঘ আজ তার ৮০ বছর পূর্তিতে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। শান্তি, সমতা ও ন্যায়ের যে আদর্শে এই সংস্থার জন্ম হয়েছিল, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন সাহসী সংস্কার, বৈশ্বিক ঐকমত্য এবং সত্যিকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কাঠামোগত পরিবর্তন ও প্রতিনিধিত্বমূলক সংস্কার ছাড়া জাতিসংঘ ক্রমেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে—একটি এমন প্রতিষ্ঠান হিসেবে, যা একদিন নিজেই নিজের আদর্শের স্মারক হয়ে দাঁড়াবে।

একটি ন্যায়সঙ্গত, ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকর জাতিসংঘই পারে ভবিষ্যৎ বিশ্বের শান্তি, নিরাপত্তা ও মানবতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে। এখন প্রশ্ন শুধু একটাই—বিশ্বনেতারা কি সেই পরিবর্তনের সাহস দেখাতে পারবেন, নাকি জাতিসংঘ ইতিহাসের এক ব্যর্থ প্রতীক হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে?

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

জাতিসংঘের ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: অর্জন, ব্যর্থতা ও সংস্কারের অপরিহার্যতা

Update Time : ০৯:১৫:৩৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৫

7185d2726c9160cd4b7ade6f3acad14d 68fa9ba6e894d

বিশ্বের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সংস্থা জাতিসংঘ (United Nations – UN) আজ তার ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে। ১৯৪৫ সালের এই দিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর ৫১টি দেশ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল এই সংস্থা। বর্তমানে এর সদস্যসংখ্যা ১৯৩, যার মধ্যে বাংলাদেশ ১৩৬তম সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়। আট দশকের দীর্ঘ পথচলায় জাতিসংঘ মানবাধিকার রক্ষা, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে এসেছে। তবুও এর সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতার প্রশ্নও সমানভাবে আলোচিত হয়ে আসছে। কেউ এর বিশাল অর্জনের দিকে নজর দেন, আবার কেউ সমালোচনা করেন এর সীমাবদ্ধতা ও পক্ষপাতদুষ্ট কাঠামোর কারণে।

জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থাগুলো বিশ্ব উন্নয়নে অসামান্য ভূমিকা রেখেছে। ইউনিসেফ (UNICEF), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP), খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO), ইউনেস্কো (UNESCO) এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP)—এসব সংস্থা দারিদ্র্য দূরীকরণ, ক্ষুধা মোকাবিলা, শিক্ষা বিস্তার, এবং টেকসই উন্নয়নের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। জাতিসংঘের উদ্যোগেই বাস্তবায়িত হয় সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (MDGs), এবং পরবর্তীতে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs), যা বৈশ্বিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। কোটি মানুষের জীবন বাঁচানো, রোগ প্রতিরোধ, দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন এবং শরণার্থী সহায়তায় জাতিসংঘের অবদান অনস্বীকার্য। এইসব কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘ ও তার সহযোগী সংস্থাগুলো একাধিকবার নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করেছে।

তবে জাতিসংঘের এই মহৎ অর্জনের বিপরীতে রয়েছে অসংখ্য ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত। সংস্থাটির কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা ও রাজনৈতিক প্রভাব-নির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এর অন্যতম বড় দুর্বলতা। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্স—সংস্থাটির সিদ্ধান্তে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে। তাদের ‘ভেটো ক্ষমতা’ প্রায়ই জাতিসংঘকে পঙ্গু করে দেয়, ফলে বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব বাস্তবায়নের আগেই থেমে যায়।

১৯৪৫ সালে যখন জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন বিশ্বের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখনকার বিশ্ব ছিল দুই মেরুভিত্তিক, আর আজকের বিশ্ব বহু-মেরুকেন্দ্রিক। কিন্তু জাতিসংঘের কাঠামো সেই প্রেক্ষাপটেই আটকে আছে। পাঁচ স্থায়ী সদস্যের একচ্ছত্র ক্ষমতা আজও অক্ষুণ্ণ। এই অপ্রতিসম কাঠামো জাতিসংঘের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা হ্রাস করেছে।

২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোট জাতিসংঘের অনুমতি ছাড়াই ইরাকে আক্রমণ চালায়—যা আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতার পরিপন্থী ছিল। “বিধ্বংসী অস্ত্রের অস্তিত্ব” নামের মিথ্যা অজুহাতে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ ইরাকের কোটি মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করে তোলে। একইভাবে আফগানিস্তান, লিবিয়া ও সিরিয়ায় পশ্চিমা হস্তক্ষেপের সময়ও জাতিসংঘ কার্যকর ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে ইসরায়েল বারবার গাজা ও পশ্চিম তীরে নির্বিচারে হামলা চালালেও জাতিসংঘের প্রতিক্রিয়া সীমিত থাকে ‘উদ্বেগ প্রকাশ’ বা ‘নিন্দা’ পর্যন্ত। নিরাপত্তা পরিষদে হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব আলোচিত হলেও, ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের নিন্দা বা দণ্ড আরোপে জাতিসংঘ ব্যর্থ।

এই দ্বিচারিতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে ইউক্রেন সংকটে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে জাতিসংঘ ও পশ্চিমা দেশগুলো একযোগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, কিন্তু ফিলিস্তিন কিংবা রোহিঙ্গা সংকটে সেই তৎপরতা দেখা যায় না। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা গণহত্যা প্রতিরোধ কিংবা তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের ভূমিকা আজও কেবল “মানবিক সাহায্য” সীমায় আটকে আছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘ বড় বড় যুদ্ধ প্রতিরোধে সীমিত সাফল্য পেলেও, ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত অনেক। কোরিয়া যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, আফ্রিকার রুয়ান্ডা (১৯৯৪) ও বসনিয়ার স্রেব্রেনিৎসা (১৯৯৫) গণহত্যা প্রতিরোধে জাতিসংঘের ব্যর্থতা আজও ইতিহাসের কালো অধ্যায়। সোমালিয়া, লিবিয়া ও ইরাকে পশ্চিমা আগ্রাসনের সময়ও সংস্থাটির ভূমিকা ছিল নিষ্ক্রিয় দর্শকের মতো।

জাতিসংঘের এই দুর্বলতা মূলত এর প্রাচীন কাঠামো থেকে উদ্ভূত। সাবেক মহাসচিব কফি আনান জাতিসংঘ সংস্কারের জন্য একটি দশ দফা কর্মপরিকল্পনা প্রস্তাব করেছিলেন, যেখানে জবাবদিহিতা, বাজেট দক্ষতা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে গতি আনতে আহ্বান জানানো হয়। তার আগেও বুতরোস বুতরোস-ঘালি সংস্থাটির কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছিলেন, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতিসংঘের অদক্ষতা ও কার্যহীনতার মূল কারণ হলো এর প্রতিনিধিত্ব কাঠামোর অসমতা, অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও বড় শক্তিগুলোর অযাচিত প্রভাব।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ), যা জাতিসংঘের প্রধান বিচারিক অঙ্গ, বর্তমানে বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে রয়েছে। ২০২৪ সালে এই আদালত ইসরায়েলের ফিলিস্তিন দখল অবৈধ ঘোষণা করলেও সেই রায় কার্যকর করার কোনো ক্ষমতা তাদের নেই। কারণ, এর বাস্তবায়ন সম্পূর্ণ নির্ভর করে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। একইভাবে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) ইসরায়েলের মতো অ-এনপিটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণেও কার্যত অক্ষম।

এইসব দ্বৈত নীতি ও ব্যর্থতা উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে জাতিসংঘের প্রতি আস্থা নষ্ট করেছে। ভারত, ব্রাজিল, তুরস্ক ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলো এখন নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ সম্প্রসারণসহ কাঠামোগত সংস্কারের দাবি তুলেছে, যাতে বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়।

জাতিসংঘ আজ তার ৮০ বছর পূর্তিতে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। শান্তি, সমতা ও ন্যায়ের যে আদর্শে এই সংস্থার জন্ম হয়েছিল, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন সাহসী সংস্কার, বৈশ্বিক ঐকমত্য এবং সত্যিকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কাঠামোগত পরিবর্তন ও প্রতিনিধিত্বমূলক সংস্কার ছাড়া জাতিসংঘ ক্রমেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে—একটি এমন প্রতিষ্ঠান হিসেবে, যা একদিন নিজেই নিজের আদর্শের স্মারক হয়ে দাঁড়াবে।

একটি ন্যায়সঙ্গত, ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকর জাতিসংঘই পারে ভবিষ্যৎ বিশ্বের শান্তি, নিরাপত্তা ও মানবতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে। এখন প্রশ্ন শুধু একটাই—বিশ্বনেতারা কি সেই পরিবর্তনের সাহস দেখাতে পারবেন, নাকি জাতিসংঘ ইতিহাসের এক ব্যর্থ প্রতীক হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে?