সময়: বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৌদি আরবে কাফালা ব্যবস্থা বাতিল:অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য ঐতিহাসিক পরিবর্তন

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৫:২০:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৫
  • / ১৮৫ Time View

186115 Abul 6

186115 Abul 6

সৌদি আরবে কর্মরত লাখো অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য অবশেষে এলো এক যুগান্তকারী সুখবর। দেশটির সরকার বহুদিনের বিতর্কিত ও শোষণমূলক “কাফালা ব্যবস্থা” বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে—যা অভিবাসী শ্রমিকদের কর্মজীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্তের ফলে সৌদি আরবের শ্রমবাজারে ব্যাপক সংস্কার ঘটবে এবং বিদেশি শ্রমিকদের অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সৌদি আরবসহ সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চলে চালু ছিল কাফালা নামের এই পৃষ্ঠপোষকতা ব্যবস্থা। এর অধীনে কোনো বিদেশি শ্রমিকের চাকরি, বসবাস ও দেশত্যাগ সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করত স্থানীয় নিয়োগকর্তা বা স্পনসরের অনুমতির ওপর। অর্থাৎ একজন শ্রমিক শুধুমাত্র সেই নিয়োগকর্তার অধীনেই কাজ করতে পারতেন—চাকরি বদলানো, অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ নেয়া, কিংবা দেশে ফিরে যাওয়া পর্যন্তও সম্ভব ছিল না তার অনুমতি ছাড়া। ফলে নিয়োগকর্তারা হয়ে উঠেছিলেন শ্রমিকদের জীবনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক, যা বাস্তবে এক ধরনের ‘আধুনিক দাসপ্রথা’র রূপ নিয়েছিল।

সমালোচক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বহু বছর ধরেই কাফালা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। বিশেষ করে নির্মাণ শ্রমিক, গৃহকর্মী, ও নিম্নবেতনের শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি শোষণের শিকার হতেন এই কাঠামোর ভেতরে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের আগে দক্ষিণ এশিয়ার হাজারো শ্রমিক—বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের নাগরিকরা—অমানবিক কর্মপরিবেশে প্রাণ হারান, যা আন্তর্জাতিক মহলে প্রবল সমালোচনার জন্ম দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে সৌদি সরকার ২০২৫ সালে ঘোষণা দেয়, তারা কাফালা ব্যবস্থা বাতিল করছে এবং এর পরিবর্তে নতুন এক “চুক্তিভিত্তিক শ্রম ব্যবস্থা” চালু করবে। এই সংস্কার সৌদি আরবের “ভিশন ২০৩০” ও “ন্যাশনাল ট্রান্সফরমেশন প্রোগ্রাম”-এর অংশ, যার লক্ষ্য দেশটির শ্রমবাজারকে আরও আধুনিক, মানবিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে তোলা।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, নতুন এই ব্যবস্থার ফলে অন্তত ১০ লাখেরও বেশি অভিবাসী শ্রমিক সরাসরি উপকৃত হবেন। নতুন শ্রমচুক্তি অনুযায়ী—

  • শ্রমিকরা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়াই নতুন চাকরিতে যোগ দিতে পারবেন।
  • ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে নিয়োগকর্তাকে অবহিত করে দেশে ফিরে যাওয়া, পুনরায় সৌদি আরবে আসা বা স্থায়ীভাবে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
  • নিয়োগকর্তার অনুমোদন বাধ্যতামূলক থাকবে না, ফলে শ্রমিকদের চলাচল ও সিদ্ধান্তগ্রহণের স্বাধীনতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।

সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই সংস্কার শুধু শ্রমিকদের স্বাধীনতা নিশ্চিতই করবে না, বরং সৌদি আরবের শ্রমবাজারকে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও দক্ষ কর্মীদের জন্য আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে।

মধ্যপ্রাচ্যে এর আগে বাহরাইন ২০০৯ সালে প্রথম দেশ হিসেবে কাফালা ব্যবস্থা বাতিল করে। এরপর সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০১৫ সালে তা শিথিল করে, যাতে শ্রমিকরা চুক্তির মেয়াদ শেষে ছয় মাসের “চাকরি অনুসন্ধান ভিসা” নিয়ে দেশে অবস্থান করতে পারেন। তবে এখনো কুয়েত, কাতার ও ওমানের মতো দেশগুলোতে কাফালা ব্যবস্থার বিভিন্ন রূপে অস্তিত্ব রয়ে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের এই সিদ্ধান্ত উপসাগরীয় অঞ্চলে শ্রম অধিকার সংস্কারের এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, এর ফলে আগামী বছরগুলোতে অন্য দেশগুলোও একই পথে হাঁটবে, এবং শ্রমিকদের মর্যাদা ও মানবাধিকার রক্ষায় এটি এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সৌদি আরবে কাফালা ব্যবস্থা বাতিল:অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য ঐতিহাসিক পরিবর্তন

Update Time : ০৫:২০:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৫

186115 Abul 6

সৌদি আরবে কর্মরত লাখো অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য অবশেষে এলো এক যুগান্তকারী সুখবর। দেশটির সরকার বহুদিনের বিতর্কিত ও শোষণমূলক “কাফালা ব্যবস্থা” বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে—যা অভিবাসী শ্রমিকদের কর্মজীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্তের ফলে সৌদি আরবের শ্রমবাজারে ব্যাপক সংস্কার ঘটবে এবং বিদেশি শ্রমিকদের অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সৌদি আরবসহ সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চলে চালু ছিল কাফালা নামের এই পৃষ্ঠপোষকতা ব্যবস্থা। এর অধীনে কোনো বিদেশি শ্রমিকের চাকরি, বসবাস ও দেশত্যাগ সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করত স্থানীয় নিয়োগকর্তা বা স্পনসরের অনুমতির ওপর। অর্থাৎ একজন শ্রমিক শুধুমাত্র সেই নিয়োগকর্তার অধীনেই কাজ করতে পারতেন—চাকরি বদলানো, অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ নেয়া, কিংবা দেশে ফিরে যাওয়া পর্যন্তও সম্ভব ছিল না তার অনুমতি ছাড়া। ফলে নিয়োগকর্তারা হয়ে উঠেছিলেন শ্রমিকদের জীবনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক, যা বাস্তবে এক ধরনের ‘আধুনিক দাসপ্রথা’র রূপ নিয়েছিল।

সমালোচক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বহু বছর ধরেই কাফালা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। বিশেষ করে নির্মাণ শ্রমিক, গৃহকর্মী, ও নিম্নবেতনের শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি শোষণের শিকার হতেন এই কাঠামোর ভেতরে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের আগে দক্ষিণ এশিয়ার হাজারো শ্রমিক—বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের নাগরিকরা—অমানবিক কর্মপরিবেশে প্রাণ হারান, যা আন্তর্জাতিক মহলে প্রবল সমালোচনার জন্ম দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে সৌদি সরকার ২০২৫ সালে ঘোষণা দেয়, তারা কাফালা ব্যবস্থা বাতিল করছে এবং এর পরিবর্তে নতুন এক “চুক্তিভিত্তিক শ্রম ব্যবস্থা” চালু করবে। এই সংস্কার সৌদি আরবের “ভিশন ২০৩০” ও “ন্যাশনাল ট্রান্সফরমেশন প্রোগ্রাম”-এর অংশ, যার লক্ষ্য দেশটির শ্রমবাজারকে আরও আধুনিক, মানবিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে তোলা।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, নতুন এই ব্যবস্থার ফলে অন্তত ১০ লাখেরও বেশি অভিবাসী শ্রমিক সরাসরি উপকৃত হবেন। নতুন শ্রমচুক্তি অনুযায়ী—

  • শ্রমিকরা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়াই নতুন চাকরিতে যোগ দিতে পারবেন।
  • ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে নিয়োগকর্তাকে অবহিত করে দেশে ফিরে যাওয়া, পুনরায় সৌদি আরবে আসা বা স্থায়ীভাবে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
  • নিয়োগকর্তার অনুমোদন বাধ্যতামূলক থাকবে না, ফলে শ্রমিকদের চলাচল ও সিদ্ধান্তগ্রহণের স্বাধীনতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।

সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই সংস্কার শুধু শ্রমিকদের স্বাধীনতা নিশ্চিতই করবে না, বরং সৌদি আরবের শ্রমবাজারকে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও দক্ষ কর্মীদের জন্য আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে।

মধ্যপ্রাচ্যে এর আগে বাহরাইন ২০০৯ সালে প্রথম দেশ হিসেবে কাফালা ব্যবস্থা বাতিল করে। এরপর সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০১৫ সালে তা শিথিল করে, যাতে শ্রমিকরা চুক্তির মেয়াদ শেষে ছয় মাসের “চাকরি অনুসন্ধান ভিসা” নিয়ে দেশে অবস্থান করতে পারেন। তবে এখনো কুয়েত, কাতার ও ওমানের মতো দেশগুলোতে কাফালা ব্যবস্থার বিভিন্ন রূপে অস্তিত্ব রয়ে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের এই সিদ্ধান্ত উপসাগরীয় অঞ্চলে শ্রম অধিকার সংস্কারের এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, এর ফলে আগামী বছরগুলোতে অন্য দেশগুলোও একই পথে হাঁটবে, এবং শ্রমিকদের মর্যাদা ও মানবাধিকার রক্ষায় এটি এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে।