সময়: বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পূবালী ব্যাংকে ৬৬ বছর আগের সোনালী ব্যাংকের বিনিয়োগ ফেরত দাবি

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৬:৩৮:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ অক্টোবর ২০২৫
  • / ৪১৫ Time View

6160bd180ad45fb4b2a32c0df956af36 68f87693769d8

6160bd180ad45fb4b2a32c0df956af36 68f87693769d8

প্রায় ছয় দশকেরও বেশি সময় আগে করা এক ঐতিহাসিক বিনিয়োগ নিয়ে এখন দুই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মধ্যে তৈরি হয়েছে বিরল এক আইনি ও আর্থিক জটিলতা। ১৯৫৯ সালে তৎকালীন ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান (যা স্বাধীনতার পর সোনালী ব্যাংক নামে পরিচিত হয়) বিনিয়োগ করেছিল ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক-এ—যার বর্তমান নাম পূবালী ব্যাংক। সেই সময় ব্যাংকটি ৩৮ হাজার ৩৩৫টি শেয়ার ক্রয় করেছিল, যা ১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে বোনাস শেয়ার যুক্ত হয়ে ৫১ হাজার ২২টিতে উন্নীত হয়। শেয়ারগুলোর তৎকালীন অভিহিত মূল্য ছিল পাঁচ লাখ ১০ হাজার ২২০ টাকা।

কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই বিনিয়োগের অর্থ বা শেয়ারের অধিকার আজও ফিরে পায়নি সোনালী ব্যাংক। ব্যাংকটির দাবি, পূবালী ব্যাংকের কাছে এখনও ওই শেয়ারগুলো তাদের বৈধ সম্পদ হিসেবে রয়ে গেছে, যা ফেরত দেওয়া হয়নি।

সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছে সোনালী ব্যাংক

সাম্প্রতিককালে সোনালী ব্যাংক আবারও বিষয়টি আলোচনায় নিয়ে এসেছে। ব্যাংকটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে একটি চিঠি দিয়ে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, স্বাধীনতার পর পূবালী ব্যাংক বেসরকারি খাতে হস্তান্তরিত হওয়ার সময় ‘ভেন্ডর এগ্রিমেন্ট’-এর আওতায় শেয়ারধারীদের আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। অন্য বিনিয়োগকারীরা তখন তাদের শেয়ার ফেরত পেলেও, কোনো কারণে সোনালী ব্যাংক তা ফেরত পায়নি।

এর পর থেকে দুই ব্যাংকের মধ্যে একাধিকবার বৈঠক ও চিঠি চালাচালি হয়েছে। এমনকি অর্থ মন্ত্রণালয়ও ১৯৯৮ সালে বিষয়টি নিয়ে এক বৈঠকে বসেছিল। তৎকালীন যুগ্ম সচিব (ব্যাংকিং) আমিনুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেই সভায় আইন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি স্পষ্টভাবে মত দেন যে, “এ ধরনের আর্থিক দাবি কখনো বিলুপ্ত হয় না।” তাই পূবালী ব্যাংক যদি দাবি পরিশোধে ব্যর্থ হয়, তবে সরকারের ওপরই এর দায় বর্তাবে।

বারবার আলোচনার পরও নিষ্পত্তি হয়নি

এরপরও সমস্যার সমাধান মেলেনি। ২০১৬ সালের অক্টোবরে অতিরিক্ত সচিব মো. ফজলুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আরেকটি সভায় বিষয়টি পুনরায় আলোচিত হয়। তৎপরবর্তী বছরগুলোতে আরও কয়েক দফা বৈঠক, চিঠি বিনিময় ও নোটিশ পাঠানো হলেও সমঝোতার কোনো পথ তৈরি হয়নি। সোনালী ব্যাংকের দাবি, সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর তারা পূবালী ব্যাংকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠিয়েছিল, কিন্তু তার কোনো উত্তর মেলেনি।

পূবালী ব্যাংকের ব্যাখ্যা

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, “১৯৮৩ সালে বেসরকারীকরণের সময় ভেন্ডর এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী শেয়ার ফেরত দেওয়ার জন্য শেয়ারধারীদের আবেদন আহ্বান করা হয়েছিল। যারা আবেদন করেছিলেন, তাদের শেয়ার বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। তখনই বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়ার কথা।” তিনি আরও জানান, বর্তমানে পূবালী ব্যাংকের ব্যালান্স শিটেও সোনালী ব্যাংকের বিনিয়োগ সংক্রান্ত কোনো উল্লেখ নেই।

বর্তমান বাজারমূল্য

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ২১ অক্টোবর (মঙ্গলবার) পূবালী ব্যাংকের প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ২৭ টাকা ৪০ পয়সা। এই হিসাবে ৫১ হাজার ২২টি শেয়ারের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৪ লাখ টাকা। যদিও এই অঙ্ক এখন তুলনামূলকভাবে ছোট মনে হলেও, বিষয়টির ঐতিহাসিক ও নীতিগত গুরুত্ব অনেক বেশি।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পাকিস্তানি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর সম্পদ জাতীয়করণ করা হয়। ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের নাম পরিবর্তন করে পূবালী ব্যাংক রাখা হয় এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান হয়ে যায় সোনালী ব্যাংক। উভয় ব্যাংকই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়। তবে ১৯৮৩ সালে পূবালী ব্যাংককে বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা হলে এর মালিকানা কাঠামো পরিবর্তন হয়। সেই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় অনেক পুরোনো শেয়ারের হিসাব জটিলতায় পড়ে যায়, যার মধ্যে সোনালী ব্যাংকের এই বিনিয়োগ অন্যতম।

দীর্ঘসূত্রতার শেষ কোথায়?

প্রায় ৬৬ বছর ধরে অমীমাংসিত এই বিনিয়োগের জটিলতা এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সোনালী ব্যাংক তাদের দাবির পক্ষে আইনগত ব্যাখ্যা ও ঐতিহাসিক দলিলপত্র তুলে ধরছে, অন্যদিকে পূবালী ব্যাংক বলছে, বিষয়টি বহু আগেই নিষ্পত্তি হয়েছে। সরকার যদি পুনরায় বিষয়টি পর্যালোচনায় নেয়, তাহলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে দীর্ঘমেয়াদি এক আর্থিক দ্বন্দ্বের সমাধান হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

পূবালী ব্যাংকে ৬৬ বছর আগের সোনালী ব্যাংকের বিনিয়োগ ফেরত দাবি

Update Time : ০৬:৩৮:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ অক্টোবর ২০২৫

6160bd180ad45fb4b2a32c0df956af36 68f87693769d8

প্রায় ছয় দশকেরও বেশি সময় আগে করা এক ঐতিহাসিক বিনিয়োগ নিয়ে এখন দুই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মধ্যে তৈরি হয়েছে বিরল এক আইনি ও আর্থিক জটিলতা। ১৯৫৯ সালে তৎকালীন ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান (যা স্বাধীনতার পর সোনালী ব্যাংক নামে পরিচিত হয়) বিনিয়োগ করেছিল ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক-এ—যার বর্তমান নাম পূবালী ব্যাংক। সেই সময় ব্যাংকটি ৩৮ হাজার ৩৩৫টি শেয়ার ক্রয় করেছিল, যা ১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে বোনাস শেয়ার যুক্ত হয়ে ৫১ হাজার ২২টিতে উন্নীত হয়। শেয়ারগুলোর তৎকালীন অভিহিত মূল্য ছিল পাঁচ লাখ ১০ হাজার ২২০ টাকা।

কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই বিনিয়োগের অর্থ বা শেয়ারের অধিকার আজও ফিরে পায়নি সোনালী ব্যাংক। ব্যাংকটির দাবি, পূবালী ব্যাংকের কাছে এখনও ওই শেয়ারগুলো তাদের বৈধ সম্পদ হিসেবে রয়ে গেছে, যা ফেরত দেওয়া হয়নি।

সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছে সোনালী ব্যাংক

সাম্প্রতিককালে সোনালী ব্যাংক আবারও বিষয়টি আলোচনায় নিয়ে এসেছে। ব্যাংকটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে একটি চিঠি দিয়ে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, স্বাধীনতার পর পূবালী ব্যাংক বেসরকারি খাতে হস্তান্তরিত হওয়ার সময় ‘ভেন্ডর এগ্রিমেন্ট’-এর আওতায় শেয়ারধারীদের আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। অন্য বিনিয়োগকারীরা তখন তাদের শেয়ার ফেরত পেলেও, কোনো কারণে সোনালী ব্যাংক তা ফেরত পায়নি।

এর পর থেকে দুই ব্যাংকের মধ্যে একাধিকবার বৈঠক ও চিঠি চালাচালি হয়েছে। এমনকি অর্থ মন্ত্রণালয়ও ১৯৯৮ সালে বিষয়টি নিয়ে এক বৈঠকে বসেছিল। তৎকালীন যুগ্ম সচিব (ব্যাংকিং) আমিনুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেই সভায় আইন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি স্পষ্টভাবে মত দেন যে, “এ ধরনের আর্থিক দাবি কখনো বিলুপ্ত হয় না।” তাই পূবালী ব্যাংক যদি দাবি পরিশোধে ব্যর্থ হয়, তবে সরকারের ওপরই এর দায় বর্তাবে।

বারবার আলোচনার পরও নিষ্পত্তি হয়নি

এরপরও সমস্যার সমাধান মেলেনি। ২০১৬ সালের অক্টোবরে অতিরিক্ত সচিব মো. ফজলুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আরেকটি সভায় বিষয়টি পুনরায় আলোচিত হয়। তৎপরবর্তী বছরগুলোতে আরও কয়েক দফা বৈঠক, চিঠি বিনিময় ও নোটিশ পাঠানো হলেও সমঝোতার কোনো পথ তৈরি হয়নি। সোনালী ব্যাংকের দাবি, সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর তারা পূবালী ব্যাংকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠিয়েছিল, কিন্তু তার কোনো উত্তর মেলেনি।

পূবালী ব্যাংকের ব্যাখ্যা

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, “১৯৮৩ সালে বেসরকারীকরণের সময় ভেন্ডর এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী শেয়ার ফেরত দেওয়ার জন্য শেয়ারধারীদের আবেদন আহ্বান করা হয়েছিল। যারা আবেদন করেছিলেন, তাদের শেয়ার বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। তখনই বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়ার কথা।” তিনি আরও জানান, বর্তমানে পূবালী ব্যাংকের ব্যালান্স শিটেও সোনালী ব্যাংকের বিনিয়োগ সংক্রান্ত কোনো উল্লেখ নেই।

বর্তমান বাজারমূল্য

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ২১ অক্টোবর (মঙ্গলবার) পূবালী ব্যাংকের প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ২৭ টাকা ৪০ পয়সা। এই হিসাবে ৫১ হাজার ২২টি শেয়ারের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৪ লাখ টাকা। যদিও এই অঙ্ক এখন তুলনামূলকভাবে ছোট মনে হলেও, বিষয়টির ঐতিহাসিক ও নীতিগত গুরুত্ব অনেক বেশি।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পাকিস্তানি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর সম্পদ জাতীয়করণ করা হয়। ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের নাম পরিবর্তন করে পূবালী ব্যাংক রাখা হয় এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান হয়ে যায় সোনালী ব্যাংক। উভয় ব্যাংকই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়। তবে ১৯৮৩ সালে পূবালী ব্যাংককে বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা হলে এর মালিকানা কাঠামো পরিবর্তন হয়। সেই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় অনেক পুরোনো শেয়ারের হিসাব জটিলতায় পড়ে যায়, যার মধ্যে সোনালী ব্যাংকের এই বিনিয়োগ অন্যতম।

দীর্ঘসূত্রতার শেষ কোথায়?

প্রায় ৬৬ বছর ধরে অমীমাংসিত এই বিনিয়োগের জটিলতা এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সোনালী ব্যাংক তাদের দাবির পক্ষে আইনগত ব্যাখ্যা ও ঐতিহাসিক দলিলপত্র তুলে ধরছে, অন্যদিকে পূবালী ব্যাংক বলছে, বিষয়টি বহু আগেই নিষ্পত্তি হয়েছে। সরকার যদি পুনরায় বিষয়টি পর্যালোচনায় নেয়, তাহলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে দীর্ঘমেয়াদি এক আর্থিক দ্বন্দ্বের সমাধান হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।