ঢাকা বিমানবন্দরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি ক্ষতির আশঙ্কা
- Update Time : ০৭:০৬:০০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৫
- / ১৩৬ Time View

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ার কার্গো কমপ্লেক্সে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বিপুল পরিমাণ পণ্য এবং অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। আগুনের তীব্রতায় একাধিক গুদাম, রপ্তানিযোগ্য পোশাক, ওষুধ, কৃষিপণ্য ও আমদানিকৃত কাঁচামাল সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ক্ষতির সঠিক পরিমাণ এখনও নির্ধারণ করা না গেলেও প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটি ডলার বা তারও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় ঘটনাটি তদন্ত ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য ৫ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে।
ইন্টারন্যাশনাল এয়ার এক্সপ্রেস অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের সভাপতি কবির আহমেদ খান বলেন, “এই মুহূর্তে প্রত্যক্ষ ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন। তবে আমদানি-রপ্তানির ওপর এর প্রভাব হবে ভয়াবহ, যার আর্থিক প্রভাব ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, “কার্গো এলাকায় বেশিরভাগই ছিল রপ্তানিযোগ্য পণ্য, যেগুলো ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন ক্রেতাদের কাছে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছিল। এই সরবরাহ ব্যাহত হলে ক্রেতাদের আস্থা ও বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর নির্বাহী সভাপতি ফজলি শামীম এহসান বলেন, “এই অগ্নিকাণ্ডের প্রভাব কেবল সরাসরি পণ্যের ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং কাঁচামাল সরবরাহে বিলম্ব, বিকল্প পরিবহন ব্যয়, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের বাধ্যতামূলক ছাড় প্রদান, এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নমুনা বা পণ্য না পৌঁছানোর কারণে অর্ডার বাতিলের মতো জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়বে আমাদের তৈরি পোশাক খাত।”
তিনি আরও যোগ করেন, “ছোট ছোট রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের জন্য এই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, আমি হয়তো মাত্র দুই হাজার ডলারের পণ্য হারিয়েছি, কিন্তু এর ফলে দুই লাখ ডলারের রপ্তানি স্থবির হয়ে পড়েছে। কারণ, এসব পণ্য জরুরি ভিত্তিতে বিমানপথে পাঠানোর প্রয়োজন ছিল। এখন পুনরায় আমদানি ও পাঠাতে গেলে সময় ও ব্যয় দুটোই কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। এতে করে ক্রেতারা হয়তো অর্ডার বাতিল করবেন বা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দাবি করতে পারেন।”
কার্গো কমপ্লেক্সে পোশাক ছাড়াও ওষুধ, কৃষিপণ্য, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ এবং বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল সংরক্ষিত ছিল। বিজিএমইএ-এর সহ-সভাপতি মো. শেহাব উদুজা চৌধুরী বলেন, “এই আগুন শুধু গুদামের পণ্যই নয়, গোটা রপ্তানি সরবরাহ চেইনকে অচল করে দিয়েছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রপ্তানি বিমানপথে সম্পন্ন হয়। ফলে এই ঘটনায় পুরো খাতই গভীর সংকটে পড়বে।”
অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল এয়ার এক্সপ্রেস অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে বাংলাদেশে ৬০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক বিমান কুরিয়ার পরিষেবা সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এই অগ্নিকাণ্ডে তাদেরও কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অনেক আন্তর্জাতিক কুরিয়ার প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা খুঁজতে শুরু করেছে, যা দেশের রপ্তানি খরচকে আরও বাড়িয়ে দেবে।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বলছে, এই দুর্ঘটনা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য এক বড় ধাক্কা। বিমানবন্দর কার্গো এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই অবকাঠামোগত সংকটে ভুগছিল। সেখানে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা দুর্বল, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিংয়ের অভাব ছিল। ফলে এই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
তারা সরকারের কাছে দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছেন। বিকেএমইএ ও বিজিএমইএ নেতারা বলেন, “এই বিপর্যয় শুধু একটি শিল্পের নয়, বরং পুরো দেশের বৈদেশিক আয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। তাই অবিলম্বে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আধুনিক কার্গো অবকাঠামো স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি।”
চূড়ান্তভাবে বলা যায়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এই অগ্নিকাণ্ড বাংলাদেশের অর্থনীতি, রপ্তানি আস্থা, এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক ভাবমূর্তির জন্য এক গুরুতর ধাক্কা হয়ে এসেছে। এই বিপর্যয় মোকাবিলায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপই এখন সবচেয়ে জরুরি।











