মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের মুখে শেখ হাসিনা: ব্রিটিশ দৈনিক ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর প্রতিবেদন
- Update Time : ০৩:০৩:৩১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৫
- / ১৪১ Time View

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের মুখে পড়েছেন বলে জানিয়েছে প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে শেখ হাসিনা নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই অভিযানে প্রায় ১,৪০০ জন সাধারণ নাগরিক ও বিক্ষোভকারী নিহত হন। এছাড়া আহতদের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধা দেওয়া, লাশ গায়েব করা ও মরদেহ পুড়িয়ে ফেলার মতো ভয়াবহ অপরাধেরও অভিযোগ তোলা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে— তিনি নিজ হাতে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক আইনে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। আদালতে ইতিমধ্যেই উপস্থাপিত হয়েছে ফোনালাপের রেকর্ড, ভিডিও ও অডিও ক্লিপ, স্যাটেলাইট ছবি এবং প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি, যা প্রমাণ করে যে এই দমন অভিযান তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়েছিল।
প্রসিকিউশন দলের মুখপাত্র ময়নুল করিম বলেন, “আমাদের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ আছে যে শেখ হাসিনাই এই হত্যাযজ্ঞের মূল নির্দেশদাতা। সন্দেহাতীতভাবে আমরা প্রমাণ করতে পারব যে তিনি মৃত্যুদণ্ডের যোগ্য।”
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শেখ হাসিনা ও তার তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল-এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। তারা বর্তমানে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অপরদিকে, সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন গত জুলাই মাসে গ্রেপ্তারের পর আদালতে দোষ স্বীকার করেছেন। তার স্বীকারোক্তিতে উঠে এসেছে, শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশে হেলিকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়।
জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ওই অভিযানে অন্তত এক হাজার চারশ জন নিহত ও কয়েক হাজার আহত হন। এই নৃশংস অভিযানের পর আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং এর ফলেই শেখ হাসিনার ১৫ বছরের ক্ষমতাকাল হঠাৎ
প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, “এই হত্যাকাণ্ডগুলো এককভাবে শেখ হাসিনার পরিকল্পনায় সংঘটিত। তিনি এক হাজার চারশ হত্যাকাণ্ডের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার যোগ্য, তবে আমরা ন্যূনতম একটি মৃত্যুদণ্ড দাবি করছি যা তার অপরাধের প্রতীকী প্রতিফলন হবে।”
তাজুল ইসলাম আরও যোগ করেন, “শেখ হাসিনার লক্ষ্য ছিল নিজের এবং পরিবারের রাজনৈতিক আধিপত্য স্থায়ী করা। এজন্য তিনি নির্মমভাবে জনগণের কণ্ঠরোধ করেছেন। এখন তিনি ইতিহাসে একজন নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক ও মানবতাবিরোধী অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন।”
অন্যদিকে, শেখ হাসিনা তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা বলে দাবি করেছেন। তার আইনজীবীরা বলছেন, এটি একটি ‘রাজনৈতিক প্রতিশোধমূলক মামলা’, যা নতুন সরকার ও আন্তর্জাতিক মহল তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের অবসান ঘটানোর জন্য ব্যবহার করছে।
তবুও, আদালতে উপস্থাপিত নথিপত্র, ভিডিও প্রমাণ ও সাক্ষ্য-জবানবন্দির ভিত্তিতে মামলাটি এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) তত্ত্বাবধানে চলছে। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে শেখ হাসিনা হবেন দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম সাবেক নারী প্রধানমন্ত্রী, যিনি মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হবেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই মামলাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি, বিরোধী দমন, গুম-খুন ও দমননীতির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
এটি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিচার নয়— এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের একটি ঐতিহাসিক মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত বলে বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন।











