সময়: বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আফগানিস্তানে ভয়াবহ বিমান হামলা পাকিস্তানের, নিহত বেড়ে ৪০: সীমান্তে আবারও রক্তাক্ত সংঘর্ষের শঙ্কা

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১১:০৯:১৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৫
  • / ১০২ Time View

1760757682 a6346ff6e2fa3d2e927c0016cf446ceb

1760757682 a6346ff6e2fa3d2e927c0016cf446ceb

আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কান্দাহার প্রদেশের সীমান্তবর্তী শহর স্পিন বোলদাক-এ পাকিস্তানের ভয়াবহ বিমান হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ জনে, আর আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৭০ জন। হতাহতদের অধিকাংশই নারী, শিশু নিরীহ বেসামরিক নাগরিক, এমন তথ্য জানিয়েছে আফগান সংবাদমাধ্যম তোলো নিউজ। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা করিমুল্লাহ জুবাইর আগা জানিয়েছেন, পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর এই আক্রমণে পুরো শহরটি প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

স্পিন বোলদাক শহরটি আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তের একেবারে কাছেই অবস্থিত। এটি দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় সময় ১৭ অক্টোবর দুপুর একটার দিকে পাকিস্তানের যুদ্ধবিমানগুলো শহরজুড়ে একাধিকবার বোমা বর্ষণ করে। একইসঙ্গে স্থলবাহিনী নোকলি, হাজি হাসান কেলাই, ওয়ার্দাক, কুচিয়ান, শহীদ শোরবাক এলাকায় ব্যাপক আর্টিলারি গোলাবর্ষণ চালায়। এতে বহু ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও বাজার এলাকা ধ্বংস হয়ে যায়। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো অনেকে আটকা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তোলো নিউজকে আহত এক প্রত্যক্ষদর্শী হাজি বাহরাম বলেন, “আমি আমার জীবনে এমন ভয়াবহ দৃশ্য কখনও দেখিনি। যারা নিজেদের মুসলিম বলে দাবি করে, তারা কিভাবে নিরীহ নারী-শিশুদের ওপর এভাবে হামলা চালাতে পারে? এটি ইতিহাসের এক অমানবিক অধ্যায়।”

উল্লেখ্য, ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত, হামলাপাল্টা হামলা চলার পর ১৫ অক্টোবর থেকে ৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়। তবে ১৭ অক্টোবর দুপুরে সেই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরই পাকিস্তানের এই ভয়াবহ হামলা সংঘটিত হয়। একই সময়ে পাকিস্তানের ভেতরে মির আলী সেনা ক্যাম্পে বড়সড় হামলার ঘটনাও ঘটে, যা সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এই নতুন সংঘাতের পেছনে পুরনো টানাপোড়েন আবারও সামনে এসেছে। পাকিস্তান দাবি করছে, আফগানিস্তানের বর্তমান তালেবান সরকার তাদের ভেতরের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তেহরিক তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-কে আশ্রয় ও সমর্থন দিচ্ছে। এই টিটিপি পাকিস্তানের ভেতরে একাধিক হামলার সঙ্গে জড়িত। তবে কাবুল

প্রশাসন বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে, বরং পাকিস্তানকেই উসকানিমূলক আচরণের জন্য দায়ী করছে।

২০২১ সালে তালেবানরা আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফেরার পর টিটিপি আরও বেপরোয়া সংগঠিত হয়ে ওঠে। তাদের প্রধান ঘাঁটি এখন পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী প্রদেশ খাইবার পাখতুনখোয়া। পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী গত কয়েক মাসে একাধিকবার সীমান্তের ওপারে টিটিপির অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় অক্টোবর, যখন পাকিস্তানের বিমান বাহিনী কাবুলে এক গোপন অভিযানে টিটিপির শীর্ষ নেতা নূর ওয়ালি মেহসুদকে হত্যা করে। এর পর থেকেই টিটিপি ও আফগান সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। ১১ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সংঘাত চার দিন ধরে চলতে থাকে, এবং ১৫ অক্টোবর সাময়িক যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে তা থামে। কিন্তু যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতেই আবারও রক্তপাত শুরু হলো—যা ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।

কান্দাহারের স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে অনেকেই স্কুলশিক্ষক, দোকানদার কৃষক—যাদের সঙ্গে কোনো সামরিক সম্পৃক্ততা ছিল না। ধ্বংস হওয়া এলাকা এখনো সাধারণ মানুষে শূন্য, বহু পরিবার নিরাপত্তার খোঁজে গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে।

আন্তর্জাতিক মহলও এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। জাতিসংঘের আফগান মিশন ইউএনএএমএ এক বিবৃতিতে বলেছে, “নিরীহ নাগরিকদের ওপর বিমান হামলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অবিলম্বে সংঘাত বন্ধ করা এবং তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা জরুরি।”

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে এই নতুন সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে উঠছে। দুই দেশের সীমান্তজুড়ে এখন উত্তেজনা চরমে, এবং পরিস্থিতি যেকোনো সময় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

সূত্র: তোলো নিউজ, আল জাজিরা, ডন নিউজ।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আফগানিস্তানে ভয়াবহ বিমান হামলা পাকিস্তানের, নিহত বেড়ে ৪০: সীমান্তে আবারও রক্তাক্ত সংঘর্ষের শঙ্কা

Update Time : ১১:০৯:১৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৫

1760757682 a6346ff6e2fa3d2e927c0016cf446ceb

আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কান্দাহার প্রদেশের সীমান্তবর্তী শহর স্পিন বোলদাক-এ পাকিস্তানের ভয়াবহ বিমান হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ জনে, আর আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৭০ জন। হতাহতদের অধিকাংশই নারী, শিশু নিরীহ বেসামরিক নাগরিক, এমন তথ্য জানিয়েছে আফগান সংবাদমাধ্যম তোলো নিউজ। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা করিমুল্লাহ জুবাইর আগা জানিয়েছেন, পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর এই আক্রমণে পুরো শহরটি প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

স্পিন বোলদাক শহরটি আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তের একেবারে কাছেই অবস্থিত। এটি দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় সময় ১৭ অক্টোবর দুপুর একটার দিকে পাকিস্তানের যুদ্ধবিমানগুলো শহরজুড়ে একাধিকবার বোমা বর্ষণ করে। একইসঙ্গে স্থলবাহিনী নোকলি, হাজি হাসান কেলাই, ওয়ার্দাক, কুচিয়ান, শহীদ শোরবাক এলাকায় ব্যাপক আর্টিলারি গোলাবর্ষণ চালায়। এতে বহু ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও বাজার এলাকা ধ্বংস হয়ে যায়। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো অনেকে আটকা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তোলো নিউজকে আহত এক প্রত্যক্ষদর্শী হাজি বাহরাম বলেন, “আমি আমার জীবনে এমন ভয়াবহ দৃশ্য কখনও দেখিনি। যারা নিজেদের মুসলিম বলে দাবি করে, তারা কিভাবে নিরীহ নারী-শিশুদের ওপর এভাবে হামলা চালাতে পারে? এটি ইতিহাসের এক অমানবিক অধ্যায়।”

উল্লেখ্য, ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত, হামলাপাল্টা হামলা চলার পর ১৫ অক্টোবর থেকে ৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়। তবে ১৭ অক্টোবর দুপুরে সেই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরই পাকিস্তানের এই ভয়াবহ হামলা সংঘটিত হয়। একই সময়ে পাকিস্তানের ভেতরে মির আলী সেনা ক্যাম্পে বড়সড় হামলার ঘটনাও ঘটে, যা সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এই নতুন সংঘাতের পেছনে পুরনো টানাপোড়েন আবারও সামনে এসেছে। পাকিস্তান দাবি করছে, আফগানিস্তানের বর্তমান তালেবান সরকার তাদের ভেতরের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তেহরিক তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-কে আশ্রয় ও সমর্থন দিচ্ছে। এই টিটিপি পাকিস্তানের ভেতরে একাধিক হামলার সঙ্গে জড়িত। তবে কাবুল

প্রশাসন বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে, বরং পাকিস্তানকেই উসকানিমূলক আচরণের জন্য দায়ী করছে।

২০২১ সালে তালেবানরা আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফেরার পর টিটিপি আরও বেপরোয়া সংগঠিত হয়ে ওঠে। তাদের প্রধান ঘাঁটি এখন পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী প্রদেশ খাইবার পাখতুনখোয়া। পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী গত কয়েক মাসে একাধিকবার সীমান্তের ওপারে টিটিপির অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় অক্টোবর, যখন পাকিস্তানের বিমান বাহিনী কাবুলে এক গোপন অভিযানে টিটিপির শীর্ষ নেতা নূর ওয়ালি মেহসুদকে হত্যা করে। এর পর থেকেই টিটিপি ও আফগান সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। ১১ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সংঘাত চার দিন ধরে চলতে থাকে, এবং ১৫ অক্টোবর সাময়িক যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে তা থামে। কিন্তু যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতেই আবারও রক্তপাত শুরু হলো—যা ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।

কান্দাহারের স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে অনেকেই স্কুলশিক্ষক, দোকানদার কৃষক—যাদের সঙ্গে কোনো সামরিক সম্পৃক্ততা ছিল না। ধ্বংস হওয়া এলাকা এখনো সাধারণ মানুষে শূন্য, বহু পরিবার নিরাপত্তার খোঁজে গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে।

আন্তর্জাতিক মহলও এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। জাতিসংঘের আফগান মিশন ইউএনএএমএ এক বিবৃতিতে বলেছে, “নিরীহ নাগরিকদের ওপর বিমান হামলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অবিলম্বে সংঘাত বন্ধ করা এবং তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা জরুরি।”

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে এই নতুন সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে উঠছে। দুই দেশের সীমান্তজুড়ে এখন উত্তেজনা চরমে, এবং পরিস্থিতি যেকোনো সময় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

সূত্র: তোলো নিউজ, আল জাজিরা, ডন নিউজ।