জুলাই জাতীয় সনদের স্বাক্ষর নিয়ে অনিশ্চয়তা: সন্ধ্যায় জরুরি বৈঠকে বসছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন
- Update Time : ০৫:০১:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৫
- / ১৭১ Time View

জুলাই জাতীয় সনদের স্বাক্ষর ঘিরে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গভীর মতপার্থক্য এই অনিশ্চয়তার মূল কারণ বলে জানা গেছে। এর ফলে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সনদে স্বাক্ষর হবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা।
এই পরিস্থিতিতে বুধবার (১৫ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টায় ‘অতি জরুরি’ বৈঠকে বসছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। বৈঠকে অংশ নেবে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বৈঠকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানেই চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত হতে পারে দলগুলো সনদে সই করবে কি না। এর আগে কমিশনের সদস্যরা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছেন।
সূত্র জানায়, জুলাই জাতীয় সনদটি দেশের ভবিষ্যৎ সংস্কার কাঠামো নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সর্বমোট ছয়টি সংস্কার কমিশনের ৮৪টি সুপারিশের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে এই সনদ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) এটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর হওয়ার কথা। গত মঙ্গলবার রাতে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সনদের চূড়ান্ত খসড়া পাঠানো হয়। তবে বাস্তবায়ন পদ্ধতি ও আইনি ভিত্তি নিয়ে এখনো কোনো ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি। কমিশন এই বিষয়ে একটি পরিপূরক সুপারিশ দেওয়ার কথা থাকলেও, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
গণভোটের মাধ্যমে সনদ বাস্তবায়নের ব্যাপারে প্রাথমিকভাবে ঐকমত্য হলেও, ভোটের তারিখ, পদ্ধতি ও প্রশ্নপত্র নিয়ে বিভাজন এখনো তীব্র। কিছু দল সনদে সই করার আগে গণভোটের আইনি কাঠামো ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গতকাল রাতে কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে জানায়, তারা সংবিধান সংশোধন বা নতুন ‘সংবিধান আদেশ’ জারি ছাড়া সনদে সই করবে না। দলটির মতে, জুলাই ঘোষণাপত্রে কিছু ছাড় দেওয়া হলেও এবার সেই সুযোগ নেই। এনসিপি চায়, সনদ বাস্তবায়নের আগে সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে তার আইনি ভিত্তি সুদৃঢ় করা হোক।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। দলটির নীতিনির্ধারকদের বৈঠক আজ রাতে অনুষ্ঠিত হবে। দলের এক শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন, তারা সনদের কপি হাতে পেয়েছেন এবং কোনো অসঙ্গতি থাকলে কমিশনকে অবহিত করবেন। তবে তিনি অভিযোগ করেন, “সনদ বাস্তবায়ন ঘিরে নানামুখী অপতৎপরতা ও বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।”
বামপন্থী কয়েকটি দল ইতিমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা সনদে সই করবে না। তাদের অভিযোগ, সনদের সংস্কার প্রস্তাবগুলো ‘প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি অতিরিক্ত সহনশীল’ এবং ‘গণতান্ত্রিক সংস্কারের চেতনাকে দুর্বল’ করে। অন্যদিকে, বিএনপি সনদের অঙ্গীকার অংশে একটি নতুন ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু কমিশন তা গ্রহণ করেনি।
গত ৩১ জুলাই কমিশন বিভিন্ন দলের কাছ থেকে সংস্কার প্রস্তাব সংগ্রহ শেষ করে। এরপর ৯ অক্টোবর পর্যন্ত রাজনৈতিক দল ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে একাধিক পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়। তবে সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে ঐকমত্য এলেও, গণভোটের সময়সূচি, ভিত্তি ও প্রশ্নপত্র নিয়ে ভিন্নমত রয়ে গেছে। বিশেষ করে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির অবস্থান একে অপরের থেকে আলাদা।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, আজকের বৈঠকেই সনদে সই-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতে পারে। প্রয়োজনে বাস্তবায়নের রূপরেখা নিয়েও নতুন করে আলোচনা হতে পারে। বৈঠকটি সরাসরি সম্প্রচার করবে বিটিভি নিউজ, যাতে সাধারণ জনগণও আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন।
কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, “আমরা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছি। আজ সন্ধ্যায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হবে। আশা করছি, গণতান্ত্রিক ঐক্যের স্বার্থে সবাই ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জুলাই জাতীয় সনদ কেবল একটি চুক্তি নয়—এটি দেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠন ও সংস্কার যাত্রার একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তবে বাস্তবায়নের পথ যদি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে, তাহলে জাতীয় ঐক্যের স্বপ্ন আবারও বিভক্তির পথে যেতে পারে।











