উপদেষ্টাদের ক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদি করার অপচেষ্টার পরিণতি: ‘সেইফ এক্সিট’ বিতর্কে জাতি কোথায় দাঁড়িয়েছে?
- Update Time : ১১:২৩:১৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ অক্টোবর ২০২৫
- / ১৫৫ Time View

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের রাজনীতি। এর কেন্দ্রবিন্দুতে এখন আলোচনায় অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের ‘সেইফ এক্সিট’ বা নিরাপদ প্রস্থানের প্রসঙ্গ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ, বিশ্লেষক এবং সাধারণ জনগণের মধ্যেও চলছে জোর বিতর্ক। প্রশ্ন উঠছে—যারা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, তারা এখন কেন নিরাপদ প্রস্থান নিয়ে ব্যস্ত? তারা কি ক্ষমতা হস্তান্তরের আগেই আতঙ্কে ভুগছেন? নাকি ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায় থেকে রক্ষা পাওয়ার পথ খুঁজছেন?
‘সেইফ এক্সিট’ অর্থাৎ নিরাপদ প্রস্থান—যেটি সাধারণত একটি অস্থায়ী বা অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষেত্রে ঘটে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে। এই ধারা অতীতে ১৯৯০, ২০০৭ ও ২০০৮ সালেও অনুসৃত হয়েছে। কিন্তু এবার বিতর্কের জন্ম দিয়েছে উপদেষ্টাদের একাংশের কথিত আতঙ্ক ও গোপন সমঝোতার প্রচেষ্টা।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলীয় সংগঠক সারজিস আলম এক বিস্ফোরক মন্তব্যে বলেছেন—“কিছু উপদেষ্টা রয়েছেন, যাদের জন্য মৃত্যু ছাড়া কোনো সেফ এক্সিট নেই।” তাঁর মতে, কিছু উপদেষ্টা গণঅভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, নিজেরা আখের গোছানোর খেলায় মেতেছেন, এমনকি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করছেন ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার আশায়। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছেন—“কিছু উপদেষ্টা ইতিমধ্যে রাজনৈতিক লিয়াজোঁ শুরু করে দিয়েছেন; সময় এলে আমরা তাদের নাম প্রকাশ করব।”
এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনকে নাড়া দিয়েছে। সত্যিই কি উপদেষ্টারা ভয় পাচ্ছেন? তারা কি ক্ষমতা ছাড়ার পর জনরোষ, তদন্ত, বা আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর যখন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়, তখন দেশজুড়ে আশা তৈরি হয়েছিল—দুর্নীতিমুক্ত, সংস্কারমুখী এক নতুন বাংলাদেশের। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই সে আশার মেঘে দেখা দিয়েছে অন্ধকার।
সরকারের ভেতর থেকেই এখন নানা অভিযোগ শোনা যাচ্ছে—কিছু উপদেষ্টা প্রশাসনিক ক্ষমতা ও নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছেন, কেউ আত্মীয়প্রীতির আশ্রয় নিয়েছেন, কেউ আবার বিদেশি সংযোগের জোরে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছেন। আরও উদ্বেগের বিষয়, নির্বাচনের আগে পিআর পদ্ধতি, দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদ, জুলাই সনদ বা গণভোটের মতো বিষয় সামনে এনে নির্বাচন বিলম্বিত করার চেষ্টার অভিযোগ উঠছে।
রেল, সড়ক ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “৭২ বছর বয়সে যদি সেফ এক্সিটের কথা ভাবতে হয়, তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক।” অন্যদিকে বন ও জলবায়ু বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সরাসরি জবাব দিয়েছেন—“আমি কখনো পালাইনি, এবারও পালাব না।” মহিলা ও শিশু-বিষয়ক উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদও বলেছেন—“উপদেষ্টাদের সেফ এক্সিটের দরকার নেই, কারণ এই সরকার একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়েছে।”
তবে সামাজিক বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। দেশের অর্থনীতি টালমাটাল অবস্থায় রয়েছে। ব্যাংকিং সেক্টর সংকটে, বেকারত্ব ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষা করছে নির্বাচিত সরকারের জন্য। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর যে জনআশা জেগেছিল, তা এখন হতাশায় রূপ নিচ্ছে।
সাংবাদিক মাসুদ কামাল এ বিষয়ে বলেন—“সংস্কার কাজ রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া সম্ভব নয়। বিদেশি পরামর্শে, ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কার করা যায় না। যেহেতু অনেক উপদেষ্টা দ্বৈত নাগরিক, তাই তাদের পাসপোর্ট জব্দ করে তদন্ত করা উচিত। যারা অনিয়মে জড়িত নয়, তারা নিশ্চিন্তে থাকতে পারবেন; কিন্তু অপরাধীদের অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘সেইফ এক্সিট’ ইস্যুটি মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের নৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রতিফলন। জনগণ চায় দ্রুত নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক উত্তরণ; কিন্তু কিছু উপদেষ্টা ক্ষমতার মেয়াদ বাড়ানোর পন্থা খুঁজছেন। এই মানসিকতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে সরকার জনগণের আস্থা হারাবে।
বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক রুমিন ফারহানা মন্তব্য করেছেন—“বেশিরভাগ উপদেষ্টার দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকায় তারা চাইলে সহজেই বিদেশে চলে যেতে পারেন। কিন্তু নৈতিকভাবে দায় এড়াতে পারবেন না। অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থানের সুযোগ তৈরি করছে।”
গণ-অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান আরও কঠোর ভাষায় বলেন—“এনজিও উপদেষ্টারা শপথ নেওয়ার দিনই গণঅভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পথে হাঁটতে শুরু করেছে। অদক্ষ, রাজনীতি-বিমুখ মানুষদের উপদেষ্টা বানিয়ে ছাত্রনেতারা ভুল করেছেন।”
ইতিহাস সাক্ষী, ১৯৯০-এর পর প্রতিটি অস্থায়ী সরকার তাদের নির্ধারিত মেয়াদে নির্বাচন দিয়ে সরে গেছে—এটাই ‘সেইফ এক্সিট’-এর রেওয়াজ। ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের পর ড. ফখরুদ্দীন আহমদ ও মইন ইউ আহমদ নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব শেষ করে বিদেশে গেছেন—তাদেরও ‘সেফ এক্সিট’ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আজকের বাস্তবতা ভিন্ন—অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ক্রমেই ক্ষীণ হচ্ছে।
যদি উপদেষ্টারা সত্যিই সংস্কার চান, তবে তাদের উচিত হবে নিজেদের দায় স্বীকার করা, স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করে দেশের ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারের হাতে তুলে দেওয়া। অন্যথায়, এই ‘সেইফ এক্সিট’ বিতর্ক ইতিহাসের পৃষ্ঠায় আরেকটি ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।











