সময়: বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি: শান্তির নতুন অধ্যায়ে বিশ্বজুড়ে আশার আলো

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১২:৫৭:২১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর ২০২৫
  • / ৯৫ Time View

1759990118 d0096ec6c83575373e3a21d129ff8fef

1759990118 d0096ec6c83575373e3a21d129ff8fef

অবশেষে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর গাজায় শান্তির এক ঝলক দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধের অবসানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ২০ দফা শান্তি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে উভয় পক্ষ। খবর পাওয়া গেছে, প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করেছে হামাস ও ইসরায়েল — যা যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। তবে চুক্তিটি কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠছে। তবুও, ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত গাজার জনগণ শান্তির এ বার্তাকে স্বাগত জানিয়েছে আনন্দ ও কৃতজ্ঞতায়।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই শান্তি চুক্তিকে “ঐতিহাসিক সুযোগ” বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি, ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিনিময় এবং গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পথ উন্মুক্ত হবে। পাশাপাশি, মানবিক সহায়তার প্রবেশ নিশ্চিত হলে ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজা উপত্যকায় পুনর্গঠনের কাজ শুরু করা যাবে।

চুক্তির ঘোষণা আসার পর থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা একে অভিনন্দন জানিয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, “আজ ইসরায়েলের জন্য একটি মহান দিন।” তিনি মন্ত্রিসভায় চুক্তি অনুমোদনের কথা জানিয়ে বলেন, এটি ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। অন্যদিকে, হামাস নেতারা যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও মিশরের মধ্যস্থতাকারীদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, “আমরা দায়িত্বশীলভাবে আলোচনায় অংশ নিয়েছি, এখন ইসরায়েলের দায়িত্ব চুক্তিটি বিলম্ব ছাড়াই বাস্তবায়ন করা।”

জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেস আরও বলেন, “এই চুক্তি শুধু যুদ্ধবিরতির ঘোষণা নয়, এটি মানবতার জন্য এক নতুন সূচনা। এখন দরকার বাস্তবায়ন ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার।” তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মানবিক সহায়তা দ্রুত গাজায় পৌঁছানোর আহ্বান জানান।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শান্তি চুক্তিকে “আরব ও মুসলিম বিশ্ব, ইসরায়েল এবং সমগ্র মানবজাতির জন্য এক মহান দিন” হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি কাতার, মিশর ও তুরস্কের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রশংসা করে বলেন, “আমরা একসাথে ইতিহাস লিখেছি।”

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এক বিবৃতিতে বলেন, “এটি গভীর স্বস্তির মুহূর্ত। এখন প্রয়োজন ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়া।” অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজও এই চুক্তিকে “শান্তির পথে এক অপরিহার্য পদক্ষেপ” হিসেবে অভিহিত করেছেন।

গাজা উপত্যকায় চুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়তেই মানুষ উল্লাসে ফেটে পড়েছে। রয়টার্স জানায়, দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। স্থানীয় বাসিন্দা ওয়ায়েল রাদওয়ান বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, যুদ্ধ শেষ! আমরা অবশেষে একটু নিশ্বাস নিতে পারছি।” একই এলাকার আরেক বাসিন্দা আব্দুল মাজিদ রাব্বো বলেন, “রক্তপাতের এই অবসান আল্লাহর অশেষ রহমত। আজ শুধু গাজা নয়, গোটা আরব দুনিয়া খুশি।”

মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকার চিকিৎসক মুসা বিবিসিকে বলেন, “দুই বছরের যুদ্ধে আমরা সবকিছু হারিয়েছি। তবু এই যুদ্ধবিরতি আমাদের বাঁচার নতুন আশার বার্তা দিচ্ছে।”

অন্যদিকে, ইসরায়েলের তেল আবিবে হোস্টেজ স্কোয়ারে জিম্মি পরিবারের সদস্যরা উল্লাসে মেতে ওঠেন। মাতান জাঙ্গাউকার নামে এক জিম্মির মা আইনাভ আতশবাজি জ্বালিয়ে বলেন, “তারা ফিরে আসছে, মাতান বাড়ি ফিরছে!” জিম্মি পরিবারের সংগঠন ‘হোস্টেজ ফ্যামিলিজ ফোরাম’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেছে, “এই দিনটি ইতিহাসে মানবতার বিজয়ের দিন হিসেবে লেখা থাকবে।”

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেন, “জিম্মিদের মুক্তি আমাদের সবার জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। আমরা কৃতজ্ঞ মার্কিন নেতৃত্বের প্রতি, যারা এই চুক্তিকে সম্ভব করেছে।”

এই যুদ্ধবিরতি যদি দীর্ঘমেয়াদি শান্তির রূপ নেয়, তবে এটি শুধু ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন নয়, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নতুন এক অধ্যায় সূচনা করবে— এমনটাই আশা করছেন বিশ্লেষকরা।

সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, এপি

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি: শান্তির নতুন অধ্যায়ে বিশ্বজুড়ে আশার আলো

Update Time : ১২:৫৭:২১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর ২০২৫

1759990118 d0096ec6c83575373e3a21d129ff8fef

অবশেষে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর গাজায় শান্তির এক ঝলক দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধের অবসানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ২০ দফা শান্তি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে উভয় পক্ষ। খবর পাওয়া গেছে, প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করেছে হামাস ও ইসরায়েল — যা যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। তবে চুক্তিটি কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠছে। তবুও, ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত গাজার জনগণ শান্তির এ বার্তাকে স্বাগত জানিয়েছে আনন্দ ও কৃতজ্ঞতায়।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই শান্তি চুক্তিকে “ঐতিহাসিক সুযোগ” বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি, ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিনিময় এবং গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পথ উন্মুক্ত হবে। পাশাপাশি, মানবিক সহায়তার প্রবেশ নিশ্চিত হলে ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজা উপত্যকায় পুনর্গঠনের কাজ শুরু করা যাবে।

চুক্তির ঘোষণা আসার পর থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা একে অভিনন্দন জানিয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, “আজ ইসরায়েলের জন্য একটি মহান দিন।” তিনি মন্ত্রিসভায় চুক্তি অনুমোদনের কথা জানিয়ে বলেন, এটি ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। অন্যদিকে, হামাস নেতারা যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও মিশরের মধ্যস্থতাকারীদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, “আমরা দায়িত্বশীলভাবে আলোচনায় অংশ নিয়েছি, এখন ইসরায়েলের দায়িত্ব চুক্তিটি বিলম্ব ছাড়াই বাস্তবায়ন করা।”

জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেস আরও বলেন, “এই চুক্তি শুধু যুদ্ধবিরতির ঘোষণা নয়, এটি মানবতার জন্য এক নতুন সূচনা। এখন দরকার বাস্তবায়ন ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার।” তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মানবিক সহায়তা দ্রুত গাজায় পৌঁছানোর আহ্বান জানান।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শান্তি চুক্তিকে “আরব ও মুসলিম বিশ্ব, ইসরায়েল এবং সমগ্র মানবজাতির জন্য এক মহান দিন” হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি কাতার, মিশর ও তুরস্কের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রশংসা করে বলেন, “আমরা একসাথে ইতিহাস লিখেছি।”

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এক বিবৃতিতে বলেন, “এটি গভীর স্বস্তির মুহূর্ত। এখন প্রয়োজন ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়া।” অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজও এই চুক্তিকে “শান্তির পথে এক অপরিহার্য পদক্ষেপ” হিসেবে অভিহিত করেছেন।

গাজা উপত্যকায় চুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়তেই মানুষ উল্লাসে ফেটে পড়েছে। রয়টার্স জানায়, দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। স্থানীয় বাসিন্দা ওয়ায়েল রাদওয়ান বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, যুদ্ধ শেষ! আমরা অবশেষে একটু নিশ্বাস নিতে পারছি।” একই এলাকার আরেক বাসিন্দা আব্দুল মাজিদ রাব্বো বলেন, “রক্তপাতের এই অবসান আল্লাহর অশেষ রহমত। আজ শুধু গাজা নয়, গোটা আরব দুনিয়া খুশি।”

মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকার চিকিৎসক মুসা বিবিসিকে বলেন, “দুই বছরের যুদ্ধে আমরা সবকিছু হারিয়েছি। তবু এই যুদ্ধবিরতি আমাদের বাঁচার নতুন আশার বার্তা দিচ্ছে।”

অন্যদিকে, ইসরায়েলের তেল আবিবে হোস্টেজ স্কোয়ারে জিম্মি পরিবারের সদস্যরা উল্লাসে মেতে ওঠেন। মাতান জাঙ্গাউকার নামে এক জিম্মির মা আইনাভ আতশবাজি জ্বালিয়ে বলেন, “তারা ফিরে আসছে, মাতান বাড়ি ফিরছে!” জিম্মি পরিবারের সংগঠন ‘হোস্টেজ ফ্যামিলিজ ফোরাম’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেছে, “এই দিনটি ইতিহাসে মানবতার বিজয়ের দিন হিসেবে লেখা থাকবে।”

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেন, “জিম্মিদের মুক্তি আমাদের সবার জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। আমরা কৃতজ্ঞ মার্কিন নেতৃত্বের প্রতি, যারা এই চুক্তিকে সম্ভব করেছে।”

এই যুদ্ধবিরতি যদি দীর্ঘমেয়াদি শান্তির রূপ নেয়, তবে এটি শুধু ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন নয়, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নতুন এক অধ্যায় সূচনা করবে— এমনটাই আশা করছেন বিশ্লেষকরা।

সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, এপি