পাবনায় জনতা ব্যাংকের ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা নিয়ে শাখা ব্যবস্থাপক নিখোঁজ, রহস্যে পুলিশ-দুদক
- Update Time : ০৭:২০:৩৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর ২০২৫
- / ১৮৬ Time View

পাবনার ঈশ্বরদীতে জনতা ব্যাংকের পাকশী শাখার ব্যবস্থাপক খালেদ সাইফুল্লাহ গত তিন দিন ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁর সঙ্গে ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ—প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা—অদৃশ্য হয়ে গেছে। ঘটনাটি প্রকাশ পেলে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ঘটনাটি শুরু হয় গত রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে। পাকশী শাখার ব্যবস্থাপক খালেদ সাইফুল্লাহ অফিসের প্রয়োজনে ঈশ্বরদী করপোরেট শাখায় যান। এর আগের দিন শনিবার তিনি টেলিফোনে করপোরেট শাখায় জানান যে তাঁর শাখায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকার প্রয়োজন। শাখায় নগদ সংকট থাকায় তাঁকে জানানো হয়, সর্বোচ্চ ৬০–৭০ লাখ টাকা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু পরদিন তিনি একাধিক শাখা থেকে অর্থ উত্তোলন করেন।
জিডি থেকে জানা যায়, রোববার সকাল ১১টা ১৫ মিনিটে তিনি জনতা ব্যাংকের দাশুড়িয়া বাজার শাখা থেকে ৩০ লাখ টাকা উত্তোলন করেন। এরপর ১১টা ৩৫ মিনিটে ঈশ্বরদী করপোরেট শাখায় এসে আরও ১ কোটি টাকা নগদ গ্রহণ করেন। টাকার ব্যাগ হাতে নেওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত আনসার সদস্য মাহবুব।
ঈশ্বরদী করপোরেট শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মো. মোহছানাতুল হক বলেন,
“ব্যবস্থাপক খালেদ সাইফুল্লাহ প্রয়োজনীয় ভাউচার ও রেজিস্টারে স্বাক্ষর করে ১১টা ৪৫ মিনিটে পাকশী শাখার উদ্দেশ্যে রওনা হন। গাড়িতে ছিলেন চালক মো. ইসমাইল হোসেন ও আনসার সদস্য মাহবুব।”
কিন্তু কিছুক্ষণ পর থেকেই খালেদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে পাকশী শাখার সহকারী ব্যবস্থাপকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানা যায়, তিনি এখনো শাখায় পৌঁছাননি। তখনই ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পুলিশকে জানায় এবং ঈশ্বরদী থানায় একটি সাধারণ
আনসার সদস্য মাহবুব বলেন,
“আমরা ঈশ্বরদী ব্র্যাক ব্যাংকের সামনে পৌঁছালে স্যার (খালেদ সাইফুল্লাহ) আমাকে গাড়ি থেকে নামতে বলেন। তিনি বলেন, ‘তুমি এখানেই অপেক্ষা করো।’ আমি নেমে গেলে গাড়ি চলে যায়। তারপর থেকে তাঁর কোনো খোঁজ পাইনি।”
অন্যদিকে, দাশুড়িয়া শাখার ব্যবস্থাপক শাহিনুর রহমান জানান,
“খালেদ সাইফুল্লাহ নিয়ম মেনেই দাশুড়িয়া শাখা থেকে টাকা নিয়েছিলেন। টাকাগুলো ব্যাংকের নথিতে সঠিকভাবে রেকর্ড করা আছে।”
নিখোঁজ ব্যবস্থাপকের স্ত্রী দিলরুবা বেগম বলেন,
“রোববার সকালেও তিনি প্রতিদিনের মতো অফিসে গিয়েছিলেন। বিকেলে ব্যাংকের কর্মকর্তারা এসে জানান, তিনি নিখোঁজ। এরপর থেকে তাঁর ফোন বন্ধ। আমরা জানি না, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে গেছেন, নাকি কেউ তাঁকে অপহরণ করেছে।”
ঘটনার পর থেকে ব্যাংকের রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয় ও সদর দপ্তরও তৎপর হয়ে ওঠে। জনতা ব্যাংক পিএলসি রাজশাহী অঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) জাহাঙ্গীর হোসেন জোয়ার্দ্দার বলেন,
“ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুতর। বিষয়টি আমরা গুরুত্বসহকারে তদন্ত করছি। নিখোঁজ ব্যবস্থাপকের গতিবিধি, আর্থিক লেনদেন ও পারিবারিক যোগাযোগ—সব দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
এদিকে, ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আ স ম আবদুন নূর জানান,
“ঘটনার পরপরই আমরা তদন্ত শুরু করেছি। বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। নিখোঁজ ব্যাংক কর্মকর্তাকে উদ্ধারের পাশাপাশি টাকার উৎস ও গন্তব্য সম্পর্কেও অনুসন্ধান চলছে। পাশাপাশি **দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)**ও ঘটনাটি নিয়ে পৃথক তদন্ত শুরু করেছে।”
স্থানীয় সূত্র জানায়, খালেদ সাইফুল্লাহ ব্যাংকিং খাতে ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে কর্মরত। তিনি সদ্য পাকশী শাখায় বদলি হয়ে যোগ দেন। পেশাগত জীবনে তাঁকে সত্-সুনামধারী কর্মকর্তা হিসেবে জানতেন সহকর্মীরা। ফলে হঠাৎ এ নিখোঁজ হওয়া অনেকের কাছেই রহস্যজনক মনে হচ্ছে।
পুলিশ বলছে, ঘটনাটি অপহরণ, আত্মগোপন বা অর্থ আত্মসাতের কোনো জটিল চক্রের অংশ কিনা, তা যাচাই করা হচ্ছে। এদিকে নিখোঁজ কর্মকর্তার পরিবার মানববন্ধন কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং দ্রুত উদ্ধার চেয়ে প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছে।
ঈশ্বরদী ও পাকশী এলাকায় এখন আতঙ্ক ও গুঞ্জন—১ কোটি ৩০ লাখ টাকার সেই নগদ অর্থ কোথায় গেল, আর কোথায় গেলেন খালেদ সাইফুল্লাহ?











