সার কারখানার জন্য গ্যাসের দাম দ্বিগুণ করার প্রস্তাব—বিইআরসি যেন ফ্যাসিস্ট সরকারের হাতিয়ার,দেশকে আমদানি বাজারে পরিণত করার ষড়যন্ত্র
- Update Time : ০৬:৫৭:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ অক্টোবর ২০২৫
- / ১৬৭ Time View

বাংলাদেশে কৃষি খাত এখন এক ভয়াবহ সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। ইউরিয়া সার উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম দ্বিগুণ করার প্রস্তাব দিয়েছে জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। অথচ কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও অনেকাংশে সারের ওপর নির্ভরশীল। কৃষি উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে যেখানে প্রয়োজন সরকারি ভর্তুকি, সেখানে গ্যাসের দাম বাড়িয়ে কার্যত কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। সমালোচকরা বলছেন, বিইআরসি এখন জনগণের স্বার্থরক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান নয়, বরং সরকারের রাজস্ব বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে—যেন এক ধরনের ফ্যাসিস্ট অর্থনৈতিক শাসনেরই প্রতিফলন।
গ্যাস সংকটের অজুহাতে নতুন বোঝা
বাংলাদেশে প্রতি বছর গ্যাসের অভাবে সরকারি মালিকানাধীন সার কারখানাগুলো বছরের বড় অংশ সময় বন্ধ থাকে। গ্যাস না থাকায় যমুনা, আশুগঞ্জ, শাহজালাল ও চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যমুনা সার কারখানা বন্ধ ছিল ৩৫১ দিন—অর্থাৎ পুরো বছরে মাত্র ১৪ দিন উৎপাদন চালু ছিল। আশুগঞ্জ সার কারখানা ২৫৯ দিন বন্ধ ছিল, শাহজালাল ১৪৭ দিন এবং চট্টগ্রাম কারখানা ৮১ দিন। ২০০৬ সাল থেকেই প্রতি বছর গ্যাস সরবরাহ বন্ধের এই অচলাবস্থা চলে আসছে। অথচ এখন এই ব্যর্থতার দায় কৃষকের ঘাড়ে চাপিয়ে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার।
দাম বাড়ানোর প্রস্তাব ও কারিগরি যুক্তি
রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে সোমবার অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে পেট্রোবাংলা ও ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানি সার কারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা করার প্রস্তাব দেয়। যদিও বিইআরসির কারিগরি কমিটি কিছুটা “সাশ্রয়ী” প্রস্তাব দিয়েছে—প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম ৩০ টাকা নির্ধারণের। অর্থাৎ, আগের দামের প্রায় দ্বিগুণ। সরকারি যুক্তি হলো, প্রতি ঘনমিটার গ্যাস উৎপাদনে গড়ে খরচ হচ্ছে ২৮ টাকা ৭৮ পয়সা, কিন্তু বিক্রি হচ্ছে ২২ টাকা ৯৩ পয়সায়। ফলে প্রতি ঘনমিটারে লোকসান হচ্ছে প্রায় ৬ টাকা। চলতি অর্থবছরে এই ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি, আর ভর্তুকি বরাদ্দ আছে মাত্র ৬ হাজার কোটি টাকা। তাই ঘাটতি কমাতে গ্যাসের দাম বাড়ানো জরুরি—এটাই তাদের যুক্তি।
অতীত অভিজ্ঞতা: প্রতিশ্রুতির বরফ গলেনি
২০২২ সালে একই যুক্তিতে শিল্পখাতে ১৭৯ শতাংশ পর্যন্ত গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, দাম বাড়লে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে। বাস্তবে হলো উল্টো—বেশির ভাগ শিল্প কারখানা পর্যাপ্ত গ্যাসই পায়নি। সার কারখানাগুলোও বন্ধই ছিল। অথচ প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম ৪ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৬ টাকা করার পরও উৎপাদন বাড়েনি। এখন আবার সেই দাম ৩০ বা ৪০ টাকায় উন্নীত করার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। এই ধারাবাহিক দামবৃদ্ধিকে অনেকেই “ফ্যাসিস্ট অর্থনৈতিক নীতি” বলছেন—যেখানে জনস্বার্থ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ও আমলাতান্ত্রিক লোভই মুখ্য হয়ে উঠছে।
কৃষিতে বিপর্যয়ের আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাসের দাম বাড়লে সার উৎপাদনের খরচ বাড়বে, এবং সরকার যদি সেই বাড়তি খরচ ভর্তুকি দিয়ে না মেটায়, তবে শেষ পর্যন্ত কৃষককে বেশি দামে সার কিনতে হবে। এতে কৃষিপণ্যের দাম বাড়বে, যা সরাসরি সাধারণ ভোক্তার জীবনে প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশের কৃষি ইতিমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন, ভূমি সংকট ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপের কারণে বিপর্যস্ত। এখন গ্যাসের দাম বাড়ালে কৃষক আরও বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এ বিষয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে। সংগঠনের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেছেন, “আগেও বলা হয়েছিল, দাম বাড়লে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে, কিন্তু কিছুই হয়নি। এখন আবার দাম বাড়িয়ে কৃষি ধ্বংসের পথ তৈরি করা হচ্ছে। গ্যাসের দাম বাড়লে সারের দাম বাড়বে, এরপর খাদ্য উৎপাদন কমবে, আর শেষ পর্যন্ত খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে। দেশ ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত হচ্ছে।”
ভেতরের সংকট ও দক্ষতার প্রশ্ন
বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে সার উৎপাদন ছিল ১৮ লাখ টন, যা কমতে কমতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৯৪ হাজার টনে। যদিও ২০২৪ সালে ঘোড়াশাল নতুন সার কারখানা চালু হওয়ায় উৎপাদন কিছুটা বেড়ে ১০ লাখ টন ছাড়ায়, তবে এর মধ্যে পুরোনো কারখানাগুলোর উৎপাদন ছিল মাত্র ২ লাখ টন। অর্থাৎ, সরকারি মালিকানাধীন পুরোনো সার কারখানাগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
শুনানিতে প্রশ্ন উঠেছে—যখন এসব কারখানার যন্ত্রপাতি পুরোনো, জ্বালানির ব্যবহার অদক্ষ, এবং গ্যাস লস বা অপচয় ব্যাপক, তখন শুধু দাম বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে কীভাবে? বরং এটা নতুন আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট
বিইআরসি এখন কার্যত সরকারের এক্সটেনশন হিসেবে কাজ করছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গণশুনানির নামে আনুষ্ঠানিকতা পালন করে আগেই নেওয়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াকে অনেকে বলছেন “অর্থনৈতিক ফ্যাসিজম”—যেখানে জনগণের মতামত, কৃষকের স্বার্থ বা ন্যায্য বাজার বিশ্লেষণ উপেক্ষা করে প্রশাসনিকভাবে দাম নির্ধারণ করা হয়।
যেখানে কৃষি বাংলাদেশের প্রাণ, সেখানে কৃষকের পিঠে আরও বোঝা চাপানো মানে দেশের খাদ্যনিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা। অথচ সরকার এখনো নিরব—কারণ এই নীতির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় আয় বৃদ্ধি ও আমদানিনির্ভর করনীতিকে টিকিয়ে রাখার সুযোগ তৈরি হয়।
গ্যাসের দাম বৃদ্ধি শুধু একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রতিফলন। কৃষিনির্ভর দেশের নীতিনির্ধারকরা যখন কৃষিকে নয়, বরং রাজস্ব ও আমদানিকে অগ্রাধিকার দেন, তখন তা গণতান্ত্রিক নয়, ফ্যাসিস্ট অর্থনৈতিক কাঠামোরই প্রকাশ। আজ প্রয়োজন ছিল গ্যাস সরবরাহের দক্ষ ব্যবস্থাপনা, কারখানাগুলোর আধুনিকীকরণ ও কৃষকের স্বার্থরক্ষা; কিন্তু সরকার বেছে নিয়েছে সহজ পথ—দাম বাড়ানো। এই সিদ্ধান্ত শুধু সার কারখানার নয়, পুরো দেশের খাদ্য ভবিষ্যতের জন্য এক অশনি সংকেত।











