নির্বাচনের দিন গণভোট চায় বিএনপি-এনসিপি, জামায়াতের দাবি—আগে আয়োজন হোক
- Update Time : ১০:৫৮:০২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৬ অক্টোবর ২০২৫
- / ১৩৭ Time View

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরল এক ঐকমত্য গড়ে উঠেছে। সনদটি বাস্তবায়নে জনগণের অংশগ্রহণ ও সম্মতি নিশ্চিত করতে গণভোট আয়োজনের বিষয়ে সবাই একমত হলেও, এ গণভোটের সময়সূচি নিয়ে দ্বিধা তৈরি হয়েছে বিএনপি, এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে।
রোববার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের এক বিস্তৃত আলোচনা শেষে কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, “জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোট আয়োজনের বিষয়ে সব রাজনৈতিক দল নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। তবে বিএনপি ও এনসিপি মনে করে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই সাধারণ ভোটের পাশাপাশি আলাদা ব্যালটে গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী মনে করে, নির্বাচনের আগে নভেম্বর বা ডিসেম্বরের মধ্যেই গণভোট সম্পন্ন হলে তা আরও ফলপ্রসূ হবে।”
ঐকমত্যের সূচনা
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, এটি জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রথম বাস্তব পদক্ষেপ, যা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত ঐকমত্যের পথ তৈরি করবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বিষয়েও এ ঐক্য বজায় থাকবে।
তিনি আরও জানান, কমিশন আগামী ১০ অক্টোবরের মধ্যে সরকারের কাছে এক বা একাধিক সুপারিশ জমা দেবে। তার আগে ৮ অক্টোবর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আবারও আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, “আমরা চাই, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর যে নতুন আইনসভা গঠিত হবে, তারা যেন জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করে এবং তা যেন টেকসই হয়। রাজনৈতিক দলগুলো এই ব্যাপারে একমত।”
বিএনপির প্রস্তাব: একই দিনে ভোট ও গণভোট
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ আলোচনায় বলেন, “জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট সংসদ নির্বাচনের দিনই আয়োজন করা যেতে পারে। আলাদা ব্যালট পেপারে জনগণ ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে পারবে। এ জন্য সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করে নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্ব দিতে পারে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “জনরায়ই হবে চূড়ান্ত। এটি জনগণের সিদ্ধান্ত, কোনো চাপিয়ে দেওয়া ব্যবস্থা নয়। ভবিষ্যতে পার্লামেন্ট এই সিদ্ধান্ত বাতিল বা অমান্য করতে পারবে না।”
জামায়াতের অবস্থান: নির্বাচনের আগে গণভোট
জামায়াতে ইসলামী ভিন্ন অবস্থানে থেকে বলছে, গণভোট নির্বাচনের আগে হলে সেটি আরও স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব। সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “আমরা মনে করি, নভেম্বর বা ডিসেম্বরের মধ্যে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে পারে। এতে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই জনগণের স্পষ্ট মতামত পাওয়া যাবে। এরপর ফেব্রুয়ারিতে নির্দ্বিধায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা সম্ভব হবে।”
তিনি আরও বলেন, “গণভোট হয়ে গেলে সেটিকে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না। পরবর্তী সংসদও তা অগ্রাহ্য করতে পারবে না, কারণ এটি সরাসরি জনগণের রায়।”
এনসিপির প্রস্তাব: একসঙ্গে দুই ভোট
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, “জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী সরকারই এখন এই বিষয়টির সমাধান করবে। জাতীয় নির্বাচনের দিন ভোটাররা দুটি ব্যালট পাবে—একটি সাধারণ নির্বাচনের জন্য এবং অন্যটি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে বা বিপক্ষে মত দেওয়ার জন্য। এই ব্যবস্থাই সবচেয়ে যৌক্তিক।”
তিনি বলেন, “ভাষাগত কিছু পার্থক্য থাকলেও মূল বিষয়ে দলগুলো প্রায় একমত। জনগণের রায় নেওয়াই সর্বোত্তম গণতান্ত্রিক পথ। আমাদের বিশ্বাস, গণভোট হলে জনগণ জুলাই সনদের পক্ষে রায় দেবে।”
অন্যান্য দলের অবস্থান
গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বলেন, “জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে ৮০ শতাংশ ঐকমত্য ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে। বাকি ২০ শতাংশ বিষয়ে কমিশন নিজের এখতিয়ার অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারে।”
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকিও জাতীয় নির্বাচনের দিনই গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
ইতিহাসে গণভোটের নজির
বাংলাদেশের ইতিহাসে এ পর্যন্ত তিনটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে—দুবার প্রশাসনিক উদ্দেশ্যে এবং একবার সাংবিধানিক প্রশ্নে। ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের গণভোট হলে সেটি হবে দেশের চতুর্থ গণভোট, তবে প্রথমবারের মতো এমন একটি জনমত যাচাই হবে যেখানে জাতীয় নীতি ও সংস্কার কাঠামো নিয়ে সরাসরি জনগণের রায় নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই গণভোট যদি সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক হয়, তবে তা শুধু জুলাই সনদের আইনি ভিত্তিই নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও নতুন এক যুগের সূচনা করতে পারে—যেখানে জাতীয় সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকবে জনগণের মতামত, দলীয় স্বার্থ নয়।











