বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান ও সাবেক ১৯ কর্মকর্তার বিষয়ে তথ্য নিচ্ছে দুদক
- Update Time : ১১:৫৯:৩১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ অক্টোবর ২০২৫
- / ১৬৮ Time View

বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান ও সাবেক ১৭ কর্মকর্তা এবং দুইজন ভারতীয় নাগরিকসহ মোট ১৯ জনের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ সংক্রান্ত একটি চিঠি সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের বরাবর পাঠানো হয়েছে, যেখানে উল্লিখিত ব্যক্তিদের জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট নম্বর, দায়িত্বকাল, কর্মক্ষেত্র, ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।
দুদকের সূত্র বলছে, এই ১৯ জনের অনেকের বিরুদ্ধেই বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলা, নীতিগত শিথিলতা এবং প্রভাব খাটিয়ে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে তাদের আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নতুন করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রিজার্ভ চুরির সময়কার শীর্ষ কর্মকর্তারা তালিকায়
তালিকায় আছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক তিন গভর্নর—ড. আতিউর রহমান, ফজলে কবির ও আব্দুর রউফ তালুকদার। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রিজার্ভ চুরির সময় আতিউর রহমান গভর্নর পদে ছিলেন। সেই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রক্ষিত ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়। পরবর্তীতে দেশ-বিদেশে তীব্র সমালোচনার মুখে ১৫ মার্চ তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন।
এ ছাড়া সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস. কে. সুর চৌধুরী, আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান, এস. এম. মনিরুজ্জামান, কাজী ছাইদুর রহমান, আবু ফরাহ মো. নাছের, আহমেদ জামাল এবং বিএফআইইউ (বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট)-এর সাবেক প্রধান মো. মাসুদ বিশ্বাসের বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে। সাবেক নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহাও রয়েছেন ওই তালিকায়।
বর্তমান কর্মকর্তারাও নজরদারিতে
দুদকের চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান কিছু কর্মকর্তার বিষয়েও তথ্য চাওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রাজশাহী অফিসের নির্বাহী পরিচালক মো. মেজবাউল হক (যিনি সম্প্রতি এক মাসের নোটিশে পদত্যাগ করেছেন) এবং আইসিটি বিভাগের দেবদুলাল রায়। এছাড়া কমন সার্ভিস বিভাগ–২-এর পরিচালক মো. তফাজ্জল হোসেন, বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স কাউন্সিলের সভাপতি মাসুম বিল্লাহ, আইসিটি বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মসিউজ্জামান খান ও রাহাত উদ্দিনের নামও অন্তর্ভুক্ত।
দুদকের চিঠিতে মসিউজ্জামান খানের নাম দুটি স্থানে উল্লেখ রয়েছে—এক জায়গায় অতিরিক্ত পরিচালক হিসেবে, অন্য জায়গায় উপপরিচালক হিসেবে। পরে জানা গেছে, দুজনই একই ব্যক্তি। মাসুম বিল্লাহ ছাড়া বাকিরা রিজার্ভ রক্ষণাবেক্ষণ বা আইটি–সম্পর্কিত বিভাগে কর্মরত ছিলেন, যা রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সরাসরি সংশ্লিষ্ট।
রিজার্ভ চুরির ঘটনার পটভূমি
২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভে রক্ষিত অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে চুরি হয়। এই অর্থ জাল সুইফট (SWIFT) মেসেজ ব্যবহার করে ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন ব্যাংকে স্থানান্তর করা হয়।
শ্রীলঙ্কায় পাঠানো দুই কোটি ডলার ফেরত পাওয়া গেলেও ফিলিপাইনে স্থানান্তরিত আট কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে এখন পর্যন্ত দেড় কোটি ডলারের মতো ফেরত এসেছে। বাকি অর্থ উদ্ধারে ফিলিপাইনের আদালত ও বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে ১২টি মামলা এখনো চলমান।
রিজার্ভ রক্ষণাবেক্ষণ ও অর্থ ছাড়ের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের চারটি বিভাগ সরাসরি সম্পৃক্ত—
১. ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ
২. ইনফরমেশন টেকনোলজি (আইটি) বিভাগ
৩. পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগ
৪. অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগ
ভারতীয় দুই নাগরিককেও অনুসন্ধানের আওতায় এনেছে দুদক
তালিকায় ভারতীয় নাগরিক নীলা ভান্নান এবং রাকেশ আস্তানার নামও রয়েছে। নীলা ভান্নান রিজার্ভ চুরির আগে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে ‘সুইফট’ সংযোগ স্থাপনের কাজ করছিলেন। আর রিজার্ভ চুরির পর ‘ফায়ারওয়াল’ ভেদ করে কীভাবে চুরি সংঘটিত হলো, তা অনুসন্ধানের জন্য রাকেশ আস্তানাকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান।
দুদক এখন জানতে চায়—এই দুই বিদেশি পরামর্শক বাংলাদেশ ব্যাংকের কোন কোন নথি বা সিস্টেমে প্রবেশাধিকার পেয়েছিলেন এবং তাঁদের সঙ্গে চুক্তির প্রকৃতি কী ছিল।
তদন্তের নতুন দিক
দুদকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির অনুসন্ধান নয়, বরং রিজার্ভ চুরির পেছনে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, আইটি সিস্টেমের দুর্বলতা, এবং দায়িত্বে অবহেলার শিকড় খুঁজে বের করার একটি সমন্বিত তদন্ত। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ত্রুটি ও দায়বদ্ধতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বল দিকগুলোও পর্যালোচনা করা হবে।
একজন দুদক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “রিজার্ভ চুরি শুধু প্রযুক্তিগত নয়, প্রশাসনিক ব্যর্থতারও ফল। এ ঘটনায় যারা কোনোভাবে দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের আর্থিক ও প্রশাসনিক রেকর্ড যাচাই করা হবে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন মুখপাত্র বলেন, দুদকের চিঠি পাওয়া গেছে এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের প্রক্রিয়া চলছে। তিনি আরও জানান, “এই তদন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনে সহায়ক হবে। যাদের দায় রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
রিজার্ভ চুরির প্রায় এক দশক পরও এই ঘটনার ছায়া এখনো বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর রয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় পর দুদকের এই পদক্ষেপ অনেকের কাছে ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হলেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এত বছর পরও কি প্রকৃত দায়ীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে?
তদন্তের ফলাফলই বলে দেবে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির এই অধ্যায়ের শেষ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।











