সময়: বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশে নতুন আতঙ্ক অ্যানথ্রাক্স: কী এটি, কীভাবে ছড়ায় ও প্রতিরোধের উপায়

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১১:৪৪:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ অক্টোবর ২০২৫
  • / ১৩৭ Time View

dee57ab9263b47226b04d7742dff16bf 68e1f8e972906

dee57ab9263b47226b04d7742dff16bf 68e1f8e972906

রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় সম্প্রতি অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। পাশাপাশি মিঠাপুকুর ও কাউনিয়া উপজেলাতেও অ্যানথ্রাক্স সন্দেহে কয়েকজনের নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত জুলাই ও সেপ্টেম্বর মাসে পীরগাছায় অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে, যা এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে।

আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে

পীরগাছা ও আশপাশের এলাকাগুলিতে অন্তত অর্ধশত মানুষ ত্বকজনিত সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে অনেকেই গবাদিপশুর মাংস কাটাকাটি, জবাই বা চামড়া ছাড়ানোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, গত দুই মাসে তিন শতাধিক গবাদিপশু মারা গেছে। অসুস্থ পশু জবাই করে মাংস নাড়াচাড়া করার কারণে একই পরিবারের চারজনসহ অন্তত ১০ জন অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছেন।

যদিও দেশে অ্যানথ্রাক্স কোনো নতুন রোগ নয়—এর আগে কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, চট্টগ্রাম, মেহেরপুর, নাটোরসহ বিভিন্ন জেলায় সংক্রমণ দেখা গিয়েছিল—তবুও প্রতি বারই রোগটি দেখা দিলে নতুন করে জনমনে ভীতি ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে।

অ্যানথ্রাক্স আসলে কী?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তথ্যমতে, অ্যানথ্রাক্স হলো ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস (Bacillus anthracis) নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। এটি প্রধানত প্রাণী থেকে মানুষের দেহে ছড়ায়। গরু, ছাগল, ভেড়া, উট বা মহিষের মতো চারণভূমির পশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়।

এই ব্যাকটেরিয়া মাটিতে দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে, কারণ এটি স্পোর (spore) তৈরি করে—যা বছরের পর বছর জীবিত থাকে। মানুষ সংক্রমিত হয় যখন সেই স্পোর ত্বকের ক্ষত, শ্বাসপ্রশ্বাস বা খাদ্যের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে।

মানুষের মধ্যে তিন ধরনের অ্যানথ্রাক্স

১. ত্বকজনিত অ্যানথ্রাক্স (Cutaneous Anthrax):
সবচেয়ে সাধারণ রূপ। আক্রান্ত পশুর চামড়া বা মাংসের সংস্পর্শে এলে ত্বকে ছোট ফোঁটা বা চুলকানির মতো দাগ দেখা দেয়। পরে তা কালো কেন্দ্রযুক্ত ঘায়ে রূপ নেয়। জ্বর, ক্লান্তি, মাথাব্যথা বা হালকা বমি হতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা না হলে এটি রক্তে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

২. গ্যাস্ট্রোইনটেস্টিনাল অ্যানথ্রাক্স:
আক্রান্ত পশুর কাঁচা বা অপরিপক্ব মাংস খেলে এটি হয়। এতে পেটব্যথা, ডায়রিয়া, বমি, রক্তবমি বা জ্বর দেখা দিতে পারে।

৩. ইনহেলেশন অ্যানথ্রাক্স (শ্বাসজনিত ধরন):
সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ। বাতাসে থাকা স্পোর ফুসফুসে প্রবেশ করলে তীব্র শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, রক্তচাপ হ্রাস এবং মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এ ছাড়া ইউরোপে নেশাজাতীয় ড্রাগ ইনজেকশন নেওয়ার মাধ্যমে “ইনজেকশন অ্যানথ্রাক্স” ধরা পড়েছিল, যা অপেক্ষাকৃত নতুন রূপ।

সংক্রমণ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

চিকিৎসকরা বলছেন, অ্যানথ্রাক্সে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকা জরুরি। সময়মতো অ্যান্টিবায়োটিক দিলে সংক্রমণ পুরোপুরি সেরে যায়। অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ সন্দেহ হলে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে এবং আক্রান্ত ত্বক খোঁচানো বা ঢেকে রাখার চেষ্টা করা যাবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রমণ প্রতিরোধের মূল উপায় হলো—

  • অসুস্থ বা মৃত পশু জবাই না করা।
  • আক্রান্ত পশুর মাংস বা চামড়া ব্যবহার না করা।
  • মৃত পশুর দেহ নিরাপদে মাটি চাপা বা পুড়িয়ে ফেলা।
  • আক্রান্ত এলাকায় জীবাণুমুক্তকরণ ও কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
  • মাংস বিক্রেতা, চামড়াশিল্পের কর্মী ও পশুপালকদের নিয়মিত হাত ধোয়া ও সুরক্ষা গ্লাভস ব্যবহার করা।

বর্তমান পরিস্থিতি ও সরকারি উদ্যোগ

রংপুরের সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আক্রান্তদের অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হচ্ছে এবং আশপাশের এলাকায় পশুর টিকাদান শুরু হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন অসুস্থ পশু বিক্রি বা জবাই নিষিদ্ধ করেছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গবাদিপশুর নিয়মিত টিকাদান ও সংক্রমণ-প্রবণ এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হচ্ছে। পাশাপাশি পশুর হাটগুলোতেও সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

সচেতন থাকুন, আতঙ্ক নয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যানথ্রাক্স ভয়ংকর হলেও এটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিৎসাযোগ্য রোগ। হঠাৎ কোনো পশু অসুস্থ হলে বা মারা গেলে তার মাংস না খাওয়া, চামড়া না ব্যবহার করা এবং স্থানীয় প্রশাসন বা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে জানানো সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।

দেশে অ্যানথ্রাক্স নতুন নয়—তবে পুরোনো অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোই হতে পারে এই সংক্রমণ প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি।
অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণই আমাদের সবার সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিতে পারে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

দেশে নতুন আতঙ্ক অ্যানথ্রাক্স: কী এটি, কীভাবে ছড়ায় ও প্রতিরোধের উপায়

Update Time : ১১:৪৪:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ অক্টোবর ২০২৫

dee57ab9263b47226b04d7742dff16bf 68e1f8e972906

রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় সম্প্রতি অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। পাশাপাশি মিঠাপুকুর ও কাউনিয়া উপজেলাতেও অ্যানথ্রাক্স সন্দেহে কয়েকজনের নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত জুলাই ও সেপ্টেম্বর মাসে পীরগাছায় অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে, যা এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে।

আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে

পীরগাছা ও আশপাশের এলাকাগুলিতে অন্তত অর্ধশত মানুষ ত্বকজনিত সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে অনেকেই গবাদিপশুর মাংস কাটাকাটি, জবাই বা চামড়া ছাড়ানোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, গত দুই মাসে তিন শতাধিক গবাদিপশু মারা গেছে। অসুস্থ পশু জবাই করে মাংস নাড়াচাড়া করার কারণে একই পরিবারের চারজনসহ অন্তত ১০ জন অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছেন।

যদিও দেশে অ্যানথ্রাক্স কোনো নতুন রোগ নয়—এর আগে কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, চট্টগ্রাম, মেহেরপুর, নাটোরসহ বিভিন্ন জেলায় সংক্রমণ দেখা গিয়েছিল—তবুও প্রতি বারই রোগটি দেখা দিলে নতুন করে জনমনে ভীতি ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে।

অ্যানথ্রাক্স আসলে কী?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তথ্যমতে, অ্যানথ্রাক্স হলো ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস (Bacillus anthracis) নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। এটি প্রধানত প্রাণী থেকে মানুষের দেহে ছড়ায়। গরু, ছাগল, ভেড়া, উট বা মহিষের মতো চারণভূমির পশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়।

এই ব্যাকটেরিয়া মাটিতে দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে, কারণ এটি স্পোর (spore) তৈরি করে—যা বছরের পর বছর জীবিত থাকে। মানুষ সংক্রমিত হয় যখন সেই স্পোর ত্বকের ক্ষত, শ্বাসপ্রশ্বাস বা খাদ্যের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে।

মানুষের মধ্যে তিন ধরনের অ্যানথ্রাক্স

১. ত্বকজনিত অ্যানথ্রাক্স (Cutaneous Anthrax):
সবচেয়ে সাধারণ রূপ। আক্রান্ত পশুর চামড়া বা মাংসের সংস্পর্শে এলে ত্বকে ছোট ফোঁটা বা চুলকানির মতো দাগ দেখা দেয়। পরে তা কালো কেন্দ্রযুক্ত ঘায়ে রূপ নেয়। জ্বর, ক্লান্তি, মাথাব্যথা বা হালকা বমি হতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা না হলে এটি রক্তে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

২. গ্যাস্ট্রোইনটেস্টিনাল অ্যানথ্রাক্স:
আক্রান্ত পশুর কাঁচা বা অপরিপক্ব মাংস খেলে এটি হয়। এতে পেটব্যথা, ডায়রিয়া, বমি, রক্তবমি বা জ্বর দেখা দিতে পারে।

৩. ইনহেলেশন অ্যানথ্রাক্স (শ্বাসজনিত ধরন):
সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ। বাতাসে থাকা স্পোর ফুসফুসে প্রবেশ করলে তীব্র শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, রক্তচাপ হ্রাস এবং মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এ ছাড়া ইউরোপে নেশাজাতীয় ড্রাগ ইনজেকশন নেওয়ার মাধ্যমে “ইনজেকশন অ্যানথ্রাক্স” ধরা পড়েছিল, যা অপেক্ষাকৃত নতুন রূপ।

সংক্রমণ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

চিকিৎসকরা বলছেন, অ্যানথ্রাক্সে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকা জরুরি। সময়মতো অ্যান্টিবায়োটিক দিলে সংক্রমণ পুরোপুরি সেরে যায়। অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ সন্দেহ হলে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে এবং আক্রান্ত ত্বক খোঁচানো বা ঢেকে রাখার চেষ্টা করা যাবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রমণ প্রতিরোধের মূল উপায় হলো—

  • অসুস্থ বা মৃত পশু জবাই না করা।
  • আক্রান্ত পশুর মাংস বা চামড়া ব্যবহার না করা।
  • মৃত পশুর দেহ নিরাপদে মাটি চাপা বা পুড়িয়ে ফেলা।
  • আক্রান্ত এলাকায় জীবাণুমুক্তকরণ ও কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
  • মাংস বিক্রেতা, চামড়াশিল্পের কর্মী ও পশুপালকদের নিয়মিত হাত ধোয়া ও সুরক্ষা গ্লাভস ব্যবহার করা।

বর্তমান পরিস্থিতি ও সরকারি উদ্যোগ

রংপুরের সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আক্রান্তদের অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হচ্ছে এবং আশপাশের এলাকায় পশুর টিকাদান শুরু হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন অসুস্থ পশু বিক্রি বা জবাই নিষিদ্ধ করেছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গবাদিপশুর নিয়মিত টিকাদান ও সংক্রমণ-প্রবণ এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হচ্ছে। পাশাপাশি পশুর হাটগুলোতেও সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

সচেতন থাকুন, আতঙ্ক নয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যানথ্রাক্স ভয়ংকর হলেও এটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিৎসাযোগ্য রোগ। হঠাৎ কোনো পশু অসুস্থ হলে বা মারা গেলে তার মাংস না খাওয়া, চামড়া না ব্যবহার করা এবং স্থানীয় প্রশাসন বা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে জানানো সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।

দেশে অ্যানথ্রাক্স নতুন নয়—তবে পুরোনো অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোই হতে পারে এই সংক্রমণ প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি।
অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণই আমাদের সবার সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিতে পারে।