সময়: বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জনপ্রশাসনে বড় পরিবর্তনের পথে বাংলাদেশ: বদলে যাচ্ছে ডিসি ও ইউএনও পদের নাম

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৫:২২:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ অক্টোবর ২০২৫
  • / ১৫৩ Time View

dcf90a005d67fdb44688dd9d76b30108 68e24490044fd

dcf90a005d67fdb44688dd9d76b30108 68e24490044fd

বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় আসছে আমূল পরিবর্তন। বহুদিন ধরেই আলোচনায় থাকা জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়নের মাধ্যমে এবার গঠিত হতে যাচ্ছে সুপিরিয়র এক্সিকিউটিভ সার্ভিস’ (এসইএস)—যা দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এই কাঠামোর আওতায় উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত সব পদ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অর্থাৎ, এখন থেকে এসব পদে নিয়োগ ও পদোন্নতি হবে মেধা, যোগ্যতা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ভিত্তিতে, যা প্রশাসনে দীর্ঘদিন ধরে চলা আন্তঃক্যাডার বৈষম্য দূর করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পদবি পরিবর্তন ও কাঠামোগত সংস্কার

সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদের নাম পরিবর্তন করে করা হবে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জেলা কমিশনার’, এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পদের নতুন নাম হবে উপজেলা কমিশনার’
এ ছাড়া অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)’ পদবি পরিবর্তন করে রাখা হবে অতিরিক্ত জেলা কমিশনার (ভূমি ব্যবস্থাপনা)’

প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে গত জুলাই মাসেই এই সংস্কার বাস্তবায়নে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে নির্দেশনা পাঠানো হয়। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসসংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (নিকার) ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে বলেছে।

নতুন সার্ভিস কাঠামো ও নিয়োগ পদ্ধতি

‘সুপিরিয়র এক্সিকিউটিভ সার্ভিস’ বা এসইএস-এর আওতায় থাকবে তিনটি প্রধান পদ: উপসচিব, যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিব। এই পদগুলোতে নিয়োগ হবে সব ক্যাডার সার্ভিসের মধ্য থেকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে
কমপক্ষে ১০ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা এবং সিনিয়র স্কেলপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন।

পরীক্ষা নেবে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (বিপিএসসি), এবং তারা প্রতিবছর এই তিনটি পদের জন্য আলাদা আলাদা পরীক্ষা আয়োজন করবে। একজন কর্মকর্তা দুইবার পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন; দুইবার ব্যর্থ হলে তিনি আর এই সার্ভিসে আবেদন করতে পারবেন না।

এসইএসে উত্তীর্ণ কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হবে সম্মিলিত মেধাক্রম অনুযায়ী। এবং একবার এই সার্ভিসে যোগ দিলে আর আগের ক্যাডারে ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।

প্রশাসনে নতুন ধারা

বর্তমানে যারা উপসচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদে আছেন, তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসইএসের অন্তর্ভুক্ত হবেন। সচিব, মুখ্য সচিব এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিবও এই সার্ভিসের সদস্য হবেন। একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হবে, যা অতিরিক্ত সচিবদের মধ্য থেকে সচিব এবং সচিবদের মধ্য থেকে মুখ্য সচিব পদে পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করবে।

সংস্কার কমিশনের মতে, এই কাঠামো চালু হলে যোগ্যতা, দক্ষতা মেধার ভিত্তিতে পদোন্নতি দায়িত্ব বণ্টন নিশ্চিত করা যাবে। একই সঙ্গে দুর্নীতি, অদক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রভাব হ্রাস পাবে।

স্থানীয় প্রশাসনে পরিবর্তনের প্রভাব

এসইএস চালু হলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রশাসনিক কাঠামোতেও পরিবর্তন আসবে। সহকারী কমিশনার, সিনিয়র সহকারী কমিশনার, উপজেলা কমিশনার, জেলা কমিশনার, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার ও বিভাগীয় কমিশনার পর্যায়েও প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা নিয়োগ পাবেন।
যদিও জেলা কমিশনার পদের দায়িত্ব এসইএস কাঠামোর অংশ হিসেবে থাকবে, তবে সেই পদে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের মর্যাদা ও সুবিধা এসইএস কর্মকর্তাদের সমমানের নাও হতে পারে।

সংস্কারের উদ্দেশ্য ও প্রত্যাশা

জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন ইতোমধ্যে ২০০টিরও বেশি প্রস্তাব দিয়েছে, যার মূল লক্ষ্য একটি দক্ষ, জনবান্ধব, শিক্ষানুরাগী জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলা। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে শুধু পদবি নয়, প্রশাসনের মনোভাব, কাজের ধরন এবং সেবাদানের মানও বদলে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সরকারি সূত্রের ভাষায়, “এসইএস বাস্তবায়িত হলে এটি হবে বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সংস্কার।”

তথ্যসূত্র: কালের কণ্ঠ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অভ্যন্তরীণ সূত্র

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রশাসনে বড় পরিবর্তনের পথে বাংলাদেশ: বদলে যাচ্ছে ডিসি ও ইউএনও পদের নাম

Update Time : ০৫:২২:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ অক্টোবর ২০২৫

dcf90a005d67fdb44688dd9d76b30108 68e24490044fd

বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় আসছে আমূল পরিবর্তন। বহুদিন ধরেই আলোচনায় থাকা জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়নের মাধ্যমে এবার গঠিত হতে যাচ্ছে সুপিরিয়র এক্সিকিউটিভ সার্ভিস’ (এসইএস)—যা দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এই কাঠামোর আওতায় উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত সব পদ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অর্থাৎ, এখন থেকে এসব পদে নিয়োগ ও পদোন্নতি হবে মেধা, যোগ্যতা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ভিত্তিতে, যা প্রশাসনে দীর্ঘদিন ধরে চলা আন্তঃক্যাডার বৈষম্য দূর করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পদবি পরিবর্তন ও কাঠামোগত সংস্কার

সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদের নাম পরিবর্তন করে করা হবে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জেলা কমিশনার’, এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পদের নতুন নাম হবে উপজেলা কমিশনার’
এ ছাড়া অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)’ পদবি পরিবর্তন করে রাখা হবে অতিরিক্ত জেলা কমিশনার (ভূমি ব্যবস্থাপনা)’

প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে গত জুলাই মাসেই এই সংস্কার বাস্তবায়নে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে নির্দেশনা পাঠানো হয়। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসসংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (নিকার) ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে বলেছে।

নতুন সার্ভিস কাঠামো ও নিয়োগ পদ্ধতি

‘সুপিরিয়র এক্সিকিউটিভ সার্ভিস’ বা এসইএস-এর আওতায় থাকবে তিনটি প্রধান পদ: উপসচিব, যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিব। এই পদগুলোতে নিয়োগ হবে সব ক্যাডার সার্ভিসের মধ্য থেকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে
কমপক্ষে ১০ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা এবং সিনিয়র স্কেলপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন।

পরীক্ষা নেবে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (বিপিএসসি), এবং তারা প্রতিবছর এই তিনটি পদের জন্য আলাদা আলাদা পরীক্ষা আয়োজন করবে। একজন কর্মকর্তা দুইবার পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন; দুইবার ব্যর্থ হলে তিনি আর এই সার্ভিসে আবেদন করতে পারবেন না।

এসইএসে উত্তীর্ণ কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হবে সম্মিলিত মেধাক্রম অনুযায়ী। এবং একবার এই সার্ভিসে যোগ দিলে আর আগের ক্যাডারে ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।

প্রশাসনে নতুন ধারা

বর্তমানে যারা উপসচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদে আছেন, তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসইএসের অন্তর্ভুক্ত হবেন। সচিব, মুখ্য সচিব এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিবও এই সার্ভিসের সদস্য হবেন। একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হবে, যা অতিরিক্ত সচিবদের মধ্য থেকে সচিব এবং সচিবদের মধ্য থেকে মুখ্য সচিব পদে পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করবে।

সংস্কার কমিশনের মতে, এই কাঠামো চালু হলে যোগ্যতা, দক্ষতা মেধার ভিত্তিতে পদোন্নতি দায়িত্ব বণ্টন নিশ্চিত করা যাবে। একই সঙ্গে দুর্নীতি, অদক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রভাব হ্রাস পাবে।

স্থানীয় প্রশাসনে পরিবর্তনের প্রভাব

এসইএস চালু হলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রশাসনিক কাঠামোতেও পরিবর্তন আসবে। সহকারী কমিশনার, সিনিয়র সহকারী কমিশনার, উপজেলা কমিশনার, জেলা কমিশনার, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার ও বিভাগীয় কমিশনার পর্যায়েও প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা নিয়োগ পাবেন।
যদিও জেলা কমিশনার পদের দায়িত্ব এসইএস কাঠামোর অংশ হিসেবে থাকবে, তবে সেই পদে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের মর্যাদা ও সুবিধা এসইএস কর্মকর্তাদের সমমানের নাও হতে পারে।

সংস্কারের উদ্দেশ্য ও প্রত্যাশা

জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন ইতোমধ্যে ২০০টিরও বেশি প্রস্তাব দিয়েছে, যার মূল লক্ষ্য একটি দক্ষ, জনবান্ধব, শিক্ষানুরাগী জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলা। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে শুধু পদবি নয়, প্রশাসনের মনোভাব, কাজের ধরন এবং সেবাদানের মানও বদলে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সরকারি সূত্রের ভাষায়, “এসইএস বাস্তবায়িত হলে এটি হবে বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সংস্কার।”

তথ্যসূত্র: কালের কণ্ঠ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অভ্যন্তরীণ সূত্র