আটক গ্রেটা থুনবার্গকে নির্যাতন ও ইসরায়েলি পতাকায় চুমু খেতে বাধ্য করার অভিযোগে বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ
- Update Time : ১১:৩১:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ অক্টোবর ২০২৫
- / ১১৬ Time View

ফিলিস্তিনের গাজা অভিমুখী মানবিক ত্রাণবাহী নৌবহর ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ থেকে আটক হওয়া সুইডিশ পরিবেশ ও মানবাধিকার কর্মী গ্রেটা থুনবার্গের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণকারীরা ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে দাবি করেছেন—ইসরায়েলি সৈন্যরা গ্রেটাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেছে, শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছে এবং জোর করে তাঁকে ইসরায়েলি পতাকায় চুমু খেতে বাধ্য করেছে।
বন্দিদের ফেরত পাঠানো ও তুরস্কের প্রতিক্রিয়া
শনিবার (৪ অক্টোবর) গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা থেকে আটক ১৩৭ জন অধিকারকর্মীকে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৩৬ জন তুরস্কের নাগরিক এবং বাকিরা যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, মালয়েশিয়া, কুয়েত, সুইজারল্যান্ড, তিউনিসিয়া, লিবিয়া ও জর্ডানসহ বিভিন্ন দেশের মানবাধিকারকর্মী। তুরস্ক সরকার জানায়, ফেরত আসা সবাইকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, কারণ তাঁরা শারীরিক ও মানসিকভাবে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় ফিরেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা
ফেরত আসা তুরস্কের সাংবাদিক এরসিন সেলিক জানান, তিনি নিজ চোখে দেখেছেন গ্রেটা থুনবার্গকে ইসরায়েলি সৈন্যরা মাটিতে ফেলে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তাঁর দাবি, গ্রেটাকে অপমানজনকভাবে ইসরায়েলি পতাকায় মোড়ানো হয় এবং তাঁকে সেই পতাকায় চুমু খেতে বাধ্য করা হয়। একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার অধিকারকর্মী হাজওয়ানি হেলমি ও যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকারকর্মী উইন্ডফিল্ড বিবার।
মালয়েশিয়ার হাজওয়ানি হেলমি বলেন, “এটা ছিল এক দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা। আমাদের সঙ্গে পশুর মতো আচরণ করা হয়েছে। আটক করার পর তিন দিন আমাদের খাবার, পানি বা ওষুধ কিছুই দেওয়া হয়নি। টয়লেটের পানিই আমাদের পান করতে হয়েছে।”
যুক্তরাষ্ট্রের উইন্ডফিল্ড বিবার জানান, থুনবার্গকে ‘রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার’ বানাতে ইসরায়েলি নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে জোরপূর্বক একটি কক্ষে নিয়ে যায়, যেখানে উপস্থিত ছিলেন ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির। তিনি আরও বলেন, “আমাদের তিন দিন ধরে অনাহারে রাখা হয়, আমরা অসহায়ভাবে টয়লেটের পানি পান করেছি। চরম গরমে শরীর ঝলসে যাচ্ছিল।”
style="text-align: justify;">“গাজাবাসীর কষ্ট এখন বুঝতে পারছি”
তুরস্কের টেলিভিশন উপস্থাপক ইকবাল গুরপিনারও একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমাদের কুকুরের মতো আচরণ করা হয়েছে। তিন দিন ধরে কোনো খাবার বা পানি দেওয়া হয়নি। আমরা গরমে দগ্ধ হচ্ছিলাম। এখন বুঝতে পারছি, গাজার সাধারণ মানুষ প্রতিদিন কী ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে বেঁচে থাকে।”
ইতালির সাংবাদিক লরেঞ্জো আগোস্তিনো, যিনি একই ফ্লোটিলায় ছিলেন, তুরস্কের আনাদোলু সংবাদ সংস্থাকে জানান, “গ্রেটা থুনবার্গ মাত্র ২২ বছরের এক সাহসী নারী। তাঁকে অপমান করা হয়েছে, তাঁর গায়ে জোর করে ইসরায়েলি পতাকা জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁকে যেন এক ট্রফির মতো প্রদর্শন করা হয়েছে—যেন ইসরায়েলি বাহিনী মানবিকতা ও বিবেকের ওপর বিজয় উদ্যাপন করছে।”
রক্তমাখা দেয়াল ও বন্দিশালার ভয়াবহতা
অন্য এক তুর্কি অধিকারকর্মী আয়চিন কানতুগলু জানান, তাঁরা বন্দিশালার দেয়ালে রক্তের দাগ এবং আগের বন্দিদের লেখা বার্তা দেখতে পেয়েছেন। “অনেক মা তাঁদের সন্তানের নাম দেয়ালে লিখে রেখেছিলেন—যেন কোনোদিন কেউ তাদের কথা মনে রাখে,” বলেন আয়চিন। “আমরা বুঝতে পারছিলাম, ফিলিস্তিনিরা কতটা ভয়ংকর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।”
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি জানিয়েছেন, ইতালির ২৬ জন নাগরিককে ফেরত পাঠানো হয়েছে, তবে ১৫ জন এখনো ইসরায়েলে আটক রয়েছেন। তুরস্ক ও মালয়েশিয়া সরকার ইসরায়েলি আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়েরের উদ্যোগ নিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি তুলেছে।
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা Adalah জানিয়েছে, আটক অধিকারকর্মীদের হাত পেছনে বেঁধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটু গেড়ে বসিয়ে রাখা হয়। খাবার, পানি বা ওষুধ কিছুই দেওয়া হয়নি, টয়লেট ব্যবহারের অনুমতি ছিল না। আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ থেকেও তাঁদের বঞ্চিত করা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের চরম লঙ্ঘন এবং যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়ে।
ইসরায়েলের অস্বীকার
তবে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এসব অভিযোগ ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ ও ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা দাবি করেছে, “গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা আন্তর্জাতিক আইন ভেঙে গাজায় প্রবেশের চেষ্টা করেছিল। আটককৃতদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী আচরণ করা হয়েছে।”
মানবাধিকার সংগঠনের দাবি
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও তুরস্কের মানবাধিকার কমিশন যৌথভাবে এক বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, “গ্রেটা থুনবার্গসহ আটক অধিকারকর্মীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ গভীরভাবে উদ্বেগজনক। ইসরায়েলকে অবিলম্বে আন্তর্জাতিক তদন্তে সহযোগিতা করতে হবে।”
বিশ্বজুড়ে সামাজিক মাধ্যমে #FreeGreta ও #JusticeForFlotilla হ্যাশট্যাগে প্রতিবাদের ঝড় বইছে। পরিবেশ ও মানবাধিকার আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠা তরুণী গ্রেটা থুনবার্গকে নিয়ে এই ঘটনা কেবল একটি ব্যক্তিকে নয়, বরং সমগ্র মানবতার বিবেককেই আহত করেছে।
চলমান গাজা যুদ্ধের পটভূমিতে ইসরায়েলের এই ঘটনাটি আরও একবার মনে করিয়ে দিচ্ছে—মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বিশ্ব যদি এখনো নীরব থাকে, তবে ভবিষ্যতে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর কোনো নৈতিক অধিকার আর মানবতার কাছে অবশিষ্ট থাকবে না।











