সময়: বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেউলিয়াত্ব ঠেকাতে রাকাবকে ২ হাজার কোটি টাকার ঋণ এক ব্যাংক পাবে এ অর্থ, পাঁচ শর্তে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৫:১৭:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ অক্টোবর ২০২৫
  • / ২০৮ Time View

rajshahi krishi unnayan bank risingbd 2011011312

rajshahi krishi unnayan bank risingbd 2011011312

দেশের বিশেষায়িত কৃষি খাতকেন্দ্রিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্যে আছে। বছর বছর লোকসান, মূলধনের চেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা সংকটের কারণে ব্যাংকটি প্রায় দেউলিয়ার পথে। এ অবস্থায় সরকার ব্যাংকটিকে বাঁচাতে নতুন করে ২ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়নযোগ্য ঋণ দিচ্ছে। এর বিপরীতে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিও দেওয়া হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ট্রেজারি অ্যান্ড ডেবট ম্যানেজমেন্ট (টিডিএম) বিভাগ জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে এ অর্থ প্রদান করা হবে। এর আগে রাকাবকে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি)-এর সঙ্গে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন সেই পরিকল্পনা স্থগিত রেখে, পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে ব্যাংকটিকে সচল রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

আগের ঋণও শোধ হয়নি, তবু নতুন ঋণ

এটি রাকাবের প্রথম আর্থিক সহায়তা নয়। কয়েক বছর আগে ‘বিশেষ কৃষি ও পল্লিঋণ কর্মসূচি’র আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল রাকাব। নির্ধারিত সময় আগস্ট ২০২৪-এ সেই ঋণ শোধ করার কথা থাকলেও ব্যাংকটি তা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়। পরে সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত করা হয়। অর্থাৎ পুরোনো ঋণ শোধ হয়নি, তবু নতুন করে আবার ২ হাজার কোটি টাকার ঋণ পাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের টিডিএম উইংয়ের প্রধান মোহা. রাশেদুল আমীন বলেন, “ঋণ না দিলে ব্যাংকটি দেউলিয়া হয়ে যেত। কোনো ঋণ কার্যক্রম চালানো সম্ভব হতো না। কৃষি উৎপাদন কার্যক্রম যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিই ছিল সরকারের প্রধান বিবেচনা।”

শর্তাবলি কঠোর করা হয়েছে

সরকার এবার রাকাবকে শর্তসাপেক্ষে ঋণ দিচ্ছে। প্রধান শর্তগুলো হলো—

  1. ব্যাংকের ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও পরিসর বাড়াতে হবে।
  2. খেলাপি ঋণের হার কমাতে হবে।
  3. দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে লোকসান কমাতে হবে।
  4. এক মাসের মধ্যে ব্যাংক পরিচালনার জন্য পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা জমা দিতে হবে।
  5. আগের ঋণ নির্দিষ্ট সময়ে পরিশোধ না করলে আর কোনো গ্যারান্টি দেওয়া হবে না।

তবে আর্থিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের অভিজ্ঞতা আশানুরূপ না হওয়ায় এসব শর্ত বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

লোকসান খেলাপির চিত্র

পরিসংখ্যান বলছে, রাকাব বছরের পর বছর লোকসানে চলছে। ডিসেম্বর ২০২4 পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট ঋণ বিতরণ ছিল ৭ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২১ শতাংশ। শুধু তাই নয়, উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করে সরকার নির্ধারিত কম সুদে কৃষিঋণ দেওয়ার কারণে লোকসানের বোঝা আরও বেড়েছে। বর্তমানে রাকাবের累计 লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৫৮২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, কৃষি খাতকে সহায়তা করার লক্ষ্য থাকলেও ব্যাংকটির অদক্ষ ব্যবস্থাপনা ও স্বেচ্ছাচারী ঋণ বিতরণই সংকট আরও বাড়িয়েছে। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, কৃষকদের পরিবর্তে উত্তরাঞ্চলের হিমাগার মালিক ও অটোরাইস মিল মালিকরা স্বল্প সুদে ঋণ পেয়েছে, যা ফেরত না আসায় ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়েছে।

একীভূতকরণ নাকি পুনঃঅর্থায়নপ্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

বাংলাদেশ ব্যাংক আগে থেকেই রাকাবকে বিকেবির সঙ্গে একীভূত করার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণে এখনো সে সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। সরকার প্রতি বছর নতুন করে ঋণ ও গ্যারান্টি দিয়ে ব্যাংকটিকে টিকিয়ে রাখছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা প্রশ্ন তুলেছেন, এভাবে নিয়মিত ঋণ ও গ্যারান্টি দিয়ে দেউলিয়াত্ব ঠেকানো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।

অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ড. সেলিম উদ্দিন মনে করেন, “এটি মূলত ঋণ দিয়ে বেঁচে থাকার কৌশল। যদি শর্তগুলো বাস্তবায়ন না হয়, তবে আগামী কয়েক বছর পর আবার একই সংকটে পড়বে রাকাব। ফলে সরকারকে টেকসই সমাধান নিয়ে ভাবতে হবে।”

শেষ কথা

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক মূলত কৃষি খাতের উন্নয়ন ও কৃষক পর্যায়ে ঋণ বিতরণের জন্য গঠিত হয়েছিল। কিন্তু দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অস্বচ্ছ ঋণ বিতরণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার শিথিলতার কারণে আজ দেউলিয়ার পথে। ২ হাজার কোটি টাকার এই পুনঃঅর্থায়ন ব্যাংকটিকে আপাতত টিকিয়ে রাখলেও, মূল সমস্যা সমাধান না হলে এটি কেবল সময়ক্ষেপণ ছাড়া আর কিছুই নয়।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

দেউলিয়াত্ব ঠেকাতে রাকাবকে ২ হাজার কোটি টাকার ঋণ এক ব্যাংক পাবে এ অর্থ, পাঁচ শর্তে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি

Update Time : ০৫:১৭:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ অক্টোবর ২০২৫

rajshahi krishi unnayan bank risingbd 2011011312

দেশের বিশেষায়িত কৃষি খাতকেন্দ্রিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্যে আছে। বছর বছর লোকসান, মূলধনের চেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা সংকটের কারণে ব্যাংকটি প্রায় দেউলিয়ার পথে। এ অবস্থায় সরকার ব্যাংকটিকে বাঁচাতে নতুন করে ২ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়নযোগ্য ঋণ দিচ্ছে। এর বিপরীতে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিও দেওয়া হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ট্রেজারি অ্যান্ড ডেবট ম্যানেজমেন্ট (টিডিএম) বিভাগ জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে এ অর্থ প্রদান করা হবে। এর আগে রাকাবকে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি)-এর সঙ্গে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন সেই পরিকল্পনা স্থগিত রেখে, পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে ব্যাংকটিকে সচল রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

আগের ঋণও শোধ হয়নি, তবু নতুন ঋণ

এটি রাকাবের প্রথম আর্থিক সহায়তা নয়। কয়েক বছর আগে ‘বিশেষ কৃষি ও পল্লিঋণ কর্মসূচি’র আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল রাকাব। নির্ধারিত সময় আগস্ট ২০২৪-এ সেই ঋণ শোধ করার কথা থাকলেও ব্যাংকটি তা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়। পরে সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত করা হয়। অর্থাৎ পুরোনো ঋণ শোধ হয়নি, তবু নতুন করে আবার ২ হাজার কোটি টাকার ঋণ পাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের টিডিএম উইংয়ের প্রধান মোহা. রাশেদুল আমীন বলেন, “ঋণ না দিলে ব্যাংকটি দেউলিয়া হয়ে যেত। কোনো ঋণ কার্যক্রম চালানো সম্ভব হতো না। কৃষি উৎপাদন কার্যক্রম যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিই ছিল সরকারের প্রধান বিবেচনা।”

শর্তাবলি কঠোর করা হয়েছে

সরকার এবার রাকাবকে শর্তসাপেক্ষে ঋণ দিচ্ছে। প্রধান শর্তগুলো হলো—

  1. ব্যাংকের ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও পরিসর বাড়াতে হবে।
  2. খেলাপি ঋণের হার কমাতে হবে।
  3. দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে লোকসান কমাতে হবে।
  4. এক মাসের মধ্যে ব্যাংক পরিচালনার জন্য পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা জমা দিতে হবে।
  5. আগের ঋণ নির্দিষ্ট সময়ে পরিশোধ না করলে আর কোনো গ্যারান্টি দেওয়া হবে না।

তবে আর্থিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের অভিজ্ঞতা আশানুরূপ না হওয়ায় এসব শর্ত বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

লোকসান খেলাপির চিত্র

পরিসংখ্যান বলছে, রাকাব বছরের পর বছর লোকসানে চলছে। ডিসেম্বর ২০২4 পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট ঋণ বিতরণ ছিল ৭ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২১ শতাংশ। শুধু তাই নয়, উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করে সরকার নির্ধারিত কম সুদে কৃষিঋণ দেওয়ার কারণে লোকসানের বোঝা আরও বেড়েছে। বর্তমানে রাকাবের累计 লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৫৮২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, কৃষি খাতকে সহায়তা করার লক্ষ্য থাকলেও ব্যাংকটির অদক্ষ ব্যবস্থাপনা ও স্বেচ্ছাচারী ঋণ বিতরণই সংকট আরও বাড়িয়েছে। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, কৃষকদের পরিবর্তে উত্তরাঞ্চলের হিমাগার মালিক ও অটোরাইস মিল মালিকরা স্বল্প সুদে ঋণ পেয়েছে, যা ফেরত না আসায় ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়েছে।

একীভূতকরণ নাকি পুনঃঅর্থায়নপ্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

বাংলাদেশ ব্যাংক আগে থেকেই রাকাবকে বিকেবির সঙ্গে একীভূত করার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণে এখনো সে সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। সরকার প্রতি বছর নতুন করে ঋণ ও গ্যারান্টি দিয়ে ব্যাংকটিকে টিকিয়ে রাখছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা প্রশ্ন তুলেছেন, এভাবে নিয়মিত ঋণ ও গ্যারান্টি দিয়ে দেউলিয়াত্ব ঠেকানো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।

অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ড. সেলিম উদ্দিন মনে করেন, “এটি মূলত ঋণ দিয়ে বেঁচে থাকার কৌশল। যদি শর্তগুলো বাস্তবায়ন না হয়, তবে আগামী কয়েক বছর পর আবার একই সংকটে পড়বে রাকাব। ফলে সরকারকে টেকসই সমাধান নিয়ে ভাবতে হবে।”

শেষ কথা

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক মূলত কৃষি খাতের উন্নয়ন ও কৃষক পর্যায়ে ঋণ বিতরণের জন্য গঠিত হয়েছিল। কিন্তু দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অস্বচ্ছ ঋণ বিতরণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার শিথিলতার কারণে আজ দেউলিয়ার পথে। ২ হাজার কোটি টাকার এই পুনঃঅর্থায়ন ব্যাংকটিকে আপাতত টিকিয়ে রাখলেও, মূল সমস্যা সমাধান না হলে এটি কেবল সময়ক্ষেপণ ছাড়া আর কিছুই নয়।