খেলাপি ঋণের জালে বন্দি পাঁচ ইসলামী ব্যাংক-গ্রাহকের সঞ্চয়ের ভবিষ্যৎ কী?
- Update Time : ১২:২৬:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ অক্টোবর ২০২৫
- / ২৬২ Time View

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বেসরকারি খাতের পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক ভয়াবহ আর্থিক সংকটে পড়ে কার্যত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে, বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে এই পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করে একটি নতুন রাষ্ট্রীয় ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। আকারে ও সম্পদে এটি হবে দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক।
ধসের মুখে পাঁচ ইসলামী ব্যাংক
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়াবহ বাস্তবতা। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক (এফএসআইবি) কার্যত দেউলিয়া হয়ে পড়েছে। আমানতকারীদের টাকা দিয়েই ব্যাংকটির কর্মীদের বেতন পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন এক সংকেত। শুধু ২০২৪ সালেই এ ব্যাংকের লোকসান দাঁড়িয়েছে ৫,৪৫০ কোটি টাকা। এর মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫৩,৮৯০ কোটি টাকায় এবং খেলাপি ঋণের হার ৯৯.৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
একই ধরনের সংকটে রয়েছে আরও চার ব্যাংক—
- গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকা
- ইউনিয়ন ব্যাংক
- সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল)
- এক্সিম ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, এই পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত আমানত প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বিপরীতে ঋণ ছাড়িয়েছে ২ লাখ কোটি টাকা। বিশাল অঙ্কের এ ঋণের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যেই খেলাপি হয়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতেও হিমশিম খাচ্ছে।
নতুন রাষ্ট্রীয় ইসলামী ব্যাংকের গঠন
সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক এগুলোকে একীভূত করে নতুন একটি রাষ্ট্রীয় ইসলামী ব্যাংক গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একীভূত হওয়ার পর ব্যাংকটির মোট সম্পদ দাঁড়াবে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধনের কাঠামো হবে এমন—
- ২০ হাজার কোটি টাকা দেবে সরকার
- ১০ হাজার কোটি টাকা আসবে ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স ফান্ড থেকে
- ৫ হাজার কোটি টাকা দেবে আন্তর্জাতিক
সংস্থা (আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এডিবি ইত্যাদি)
গ্রাহকের সঞ্চয় ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা
আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংক একটি বিশেষ পেমেন্ট স্কিম চালু করছে—
- সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত বিমার আওতায় দ্রুত ফেরত দেওয়া হবে (লাইসেন্স বাতিলের দুই মাসের মধ্যে)।
- দুই লাখ টাকার বেশি আমানত ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়া হবে।
- একাধিক ব্যাংকে হিসাব থাকলেও বিমার আওতায় সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পাওয়া যাবে।
- মধ্যবর্তী সময়ে আমানতের বিপরীতে ৪% হারে রিটার্ন দেওয়া হবে।
কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা
এই পাঁচ ব্যাংকে কর্মরত প্রায় ২১ হাজার কর্মকর্তা–কর্মচারী অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। শুধু এফএসআইবিতেই রয়েছেন প্রায় ৬ হাজার কর্মী। চেয়ারম্যানদের দাবি, নতুন শাখা খোলার মাধ্যমে কর্মসংস্থান ধরে রাখা সম্ভব হবে। তবে বাস্তবে একীভূতকরণের পর কতজন কর্মী চাকরি হারাবেন, তা নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
শেয়ারবাজারে ধস
পাঁচটি ব্যাংকই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত। তবে একীভূত হওয়ার পর এগুলোকে ডিলিস্ট করা হবে। ইতোমধ্যেই তাদের শেয়ারের দাম ১০ টাকার ফেস ভ্যালু থেকে নেমে গেছে ৫ টাকার নিচে। এতে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নয়, গোটা ব্যাংক খাতেই বিনিয়োগকারীদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রশাসক নিয়োগ
আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচ ব্যাংকেই প্রশাসক নিয়োগ করেছে—
- এক্সিম ব্যাংক – মো. শওকত উল আলম
- সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক – মুহাম্মদ বদিউল আলম দিদার
- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক – মো. সালাহ উদ্দীন
- ইউনিয়ন ব্যাংক – মো. আবুল হাসেম
- গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক – মকসুদুল আলম
দায়ী কারা?
অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যাংকগুলো নিয়ন্ত্রণ করেছে। ভুয়া প্রতিষ্ঠান তৈরি করে তারা হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ আত্মসাৎ করেছে। অন্যদিকে, এক্সিম ব্যাংক ছিল নাসা গ্রুপ চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম ও দুর্নীতি ছাড়া ব্যাংকগুলোর বর্তমান অবস্থা ব্যাখ্যা করার অন্য কোনো যুক্তি বিশেষজ্ঞরা খুঁজে পাননি।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
- সঠিকভাবে একীভূতকরণ সম্পন্ন হলে ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরতে পারে।
- তবে শুধু একীভূত করলেই চলবে না, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
- খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া এই উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভবিষ্যতের প্রশ্ন
সরকার বলছে, নতুন রাষ্ট্রীয় ইসলামী ব্যাংক গ্রাহকের আমানত সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেবে এবং ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—
- দুর্নীতির শেকড় কাটা যাবে তো?
- রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ হবে কি?
- দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
যদি এসব প্রশ্নের উত্তর ইতিবাচকভাবে না আসে, তবে আশঙ্কা থেকেই যায়—নতুন ব্যাংকও হয়তো একদিন আরেকটি বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।












