সময়: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিউইয়র্কের ঘটনায় বাংলাদেশ মিশনের কর্মকর্তার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৫:২৬:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • / ২৪১ Time View

500 321 inqilab white 20250924130745

500 321 inqilab white 20250924130745

নিউইয়র্কে প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গী রাজনৈতিক নেতাদের ওপর হামলার ঘটনায় জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশনের ভূমিকা এখন ব্যাপক প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে পূর্বপ্রস্তুতির কথা বলা হলেও বাস্তবে দেখা গেছে দায়িত্বহীনতা, অব্যবস্থাপনা এবং প্রটোকল ভঙ্গের এক জটিল চিত্র। অনেকেই মনে করছেন, এটি নিছক দুর্ঘটনা নয় বরং পূর্বপরিকল্পিত একটি নীলনকশার বাস্তবায়ন, যেখানে মিশনের কিছু কর্মকর্তা সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন।

একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি

বাংলাদেশি সাংবাদিক মহল ও প্রবাসীরা বলছেন, এ ধরনের হামলা নতুন নয়। অতীতেও সরকারের উচ্চপর্যায়ের উপদেষ্টাদের ওপর একই কায়দায় হামলা চালানো হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এবং এরও আগে আইন উপদেষ্টার ওপর নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মীরা হামলা চালিয়েছিল। এত ঘটনার পুনরাবৃত্তি সত্ত্বেও কেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি—এ প্রশ্ন উঠেছে সর্বত্র।

মিশনের ভেতরের যোগসাজশের অভিযোগ

প্রবাসী সাংবাদিক কনক সরওয়ার সরাসরি অভিযোগ করে বলেছেন, ফ্যাসিস্ট আমলে নিয়োগ পাওয়া মিশনের কিছু কর্মকর্তা আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে এ হামলার পরিকল্পনা করেছেন। বিশেষভাবে নাম এসেছে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরীর। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় এই হামলার পরিবেশ তৈরি করেছেন।

এখানে শোয়েব আব্দুল্লাহ নামের এক কর্মকর্তার ভূমিকাও আলোচনায় এসেছে। তিনি ছাত্রলীগের সাবেক সহসম্পাদক ছিলেন এবং প্রোটোকলের দায়িত্বে থাকাকালীন বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি নেতাদের বিভ্রান্ত করে পরিকল্পিতভাবে হেনস্তার পরিস্থিতি তৈরি করেন। লাগেজ হ্যান্ডলিং ও যানবাহন সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা আরেক কর্মকর্তা হাসান আল জামান রাফিকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।

কীভাবে ঘটল হামলা

ঘটনার দিন প্রধান উপদেষ্টা সরকারিভাবে বিমানবন্দর ত্যাগ করার প্রায় এক ঘণ্টা পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, হুমায়ুন কবির, জামায়াত নেতা তাহের, এনসিপি নেতা আখতার হোসেন ও ডা. তাসনিম জারা কোনো প্রটোকল ছাড়াই বের হন। এসময় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কর্মীরা তাঁদের ঘিরে ধরে গালিগালাজ শুরু করে এবং ইউনূসবিরোধী স্লোগান তোলে। একপর্যায়ে আখতার হোসেনের গায়ে ডিম নিক্ষেপ করা হয়।

/> পরে ঘটনাস্থল থেকে যুবলীগ কর্মী মিজানুর রহমানকে গ্রেফতার করে পুলিশ। কিন্তু ততক্ষণে হামলার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায় এবং প্রবাসী সমাজে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।

প্রবাসীদের প্রতিক্রিয়া সমালোচনা

প্রবাসী বাংলাদেশিরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে। তাঁদের দাবি, সরকার ও কূটনৈতিক মিশন যদি যথাযথ নিরাপত্তা দিত, তাহলে এ ধরনের লজ্জাজনক পরিস্থিতি তৈরি হতো না। অনেকেই মনে করছেন, হামলার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক আনুগত্যই এ ঘটনার মূল কারণ।

এনসিপির প্রতিক্রিয়া

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিউইয়র্ক কনস্যুলেটের ব্যর্থতাকে দায়ী করে ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে। এনসিপি দাবি জানিয়েছে, নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেলসহ পুরো ফরেন সার্ভিস টিমকে অবিলম্বে প্রত্যাহার ও শাস্তির আওতায় আনা হোক।

সরকারের অবস্থান

এ ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকার ‘গভীর দুঃখ’ প্রকাশ করেছে। প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভিভিআইপি প্রবেশাধিকার ও রাজনৈতিক নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকার বারবার অনুরোধ করলেও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তা উপেক্ষা করেছে।

নিউইয়র্কের এই ঘটনা কেবল একটি কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ। একই ধরনের হামলার পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে, মিশনের ভেতরে দুর্বলতা, অব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব বিদ্যমান। প্রশ্ন হলো—এবারও কি দায় এড়াতে সক্ষম হবেন মিশনের কর্মকর্তারা, নাকি প্রকৃত তদন্ত ও জবাবদিহির মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটিত হবে?

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

নিউইয়র্কের ঘটনায় বাংলাদেশ মিশনের কর্মকর্তার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই

Update Time : ০৫:২৬:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫

500 321 inqilab white 20250924130745

নিউইয়র্কে প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গী রাজনৈতিক নেতাদের ওপর হামলার ঘটনায় জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশনের ভূমিকা এখন ব্যাপক প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে পূর্বপ্রস্তুতির কথা বলা হলেও বাস্তবে দেখা গেছে দায়িত্বহীনতা, অব্যবস্থাপনা এবং প্রটোকল ভঙ্গের এক জটিল চিত্র। অনেকেই মনে করছেন, এটি নিছক দুর্ঘটনা নয় বরং পূর্বপরিকল্পিত একটি নীলনকশার বাস্তবায়ন, যেখানে মিশনের কিছু কর্মকর্তা সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন।

একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি

বাংলাদেশি সাংবাদিক মহল ও প্রবাসীরা বলছেন, এ ধরনের হামলা নতুন নয়। অতীতেও সরকারের উচ্চপর্যায়ের উপদেষ্টাদের ওপর একই কায়দায় হামলা চালানো হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এবং এরও আগে আইন উপদেষ্টার ওপর নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মীরা হামলা চালিয়েছিল। এত ঘটনার পুনরাবৃত্তি সত্ত্বেও কেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি—এ প্রশ্ন উঠেছে সর্বত্র।

মিশনের ভেতরের যোগসাজশের অভিযোগ

প্রবাসী সাংবাদিক কনক সরওয়ার সরাসরি অভিযোগ করে বলেছেন, ফ্যাসিস্ট আমলে নিয়োগ পাওয়া মিশনের কিছু কর্মকর্তা আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে এ হামলার পরিকল্পনা করেছেন। বিশেষভাবে নাম এসেছে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরীর। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় এই হামলার পরিবেশ তৈরি করেছেন।

এখানে শোয়েব আব্দুল্লাহ নামের এক কর্মকর্তার ভূমিকাও আলোচনায় এসেছে। তিনি ছাত্রলীগের সাবেক সহসম্পাদক ছিলেন এবং প্রোটোকলের দায়িত্বে থাকাকালীন বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি নেতাদের বিভ্রান্ত করে পরিকল্পিতভাবে হেনস্তার পরিস্থিতি তৈরি করেন। লাগেজ হ্যান্ডলিং ও যানবাহন সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা আরেক কর্মকর্তা হাসান আল জামান রাফিকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।

কীভাবে ঘটল হামলা

ঘটনার দিন প্রধান উপদেষ্টা সরকারিভাবে বিমানবন্দর ত্যাগ করার প্রায় এক ঘণ্টা পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, হুমায়ুন কবির, জামায়াত নেতা তাহের, এনসিপি নেতা আখতার হোসেন ও ডা. তাসনিম জারা কোনো প্রটোকল ছাড়াই বের হন। এসময় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কর্মীরা তাঁদের ঘিরে ধরে গালিগালাজ শুরু করে এবং ইউনূসবিরোধী স্লোগান তোলে। একপর্যায়ে আখতার হোসেনের গায়ে ডিম নিক্ষেপ করা হয়।

/> পরে ঘটনাস্থল থেকে যুবলীগ কর্মী মিজানুর রহমানকে গ্রেফতার করে পুলিশ। কিন্তু ততক্ষণে হামলার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায় এবং প্রবাসী সমাজে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।

প্রবাসীদের প্রতিক্রিয়া সমালোচনা

প্রবাসী বাংলাদেশিরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে। তাঁদের দাবি, সরকার ও কূটনৈতিক মিশন যদি যথাযথ নিরাপত্তা দিত, তাহলে এ ধরনের লজ্জাজনক পরিস্থিতি তৈরি হতো না। অনেকেই মনে করছেন, হামলার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক আনুগত্যই এ ঘটনার মূল কারণ।

এনসিপির প্রতিক্রিয়া

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিউইয়র্ক কনস্যুলেটের ব্যর্থতাকে দায়ী করে ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে। এনসিপি দাবি জানিয়েছে, নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেলসহ পুরো ফরেন সার্ভিস টিমকে অবিলম্বে প্রত্যাহার ও শাস্তির আওতায় আনা হোক।

সরকারের অবস্থান

এ ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকার ‘গভীর দুঃখ’ প্রকাশ করেছে। প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভিভিআইপি প্রবেশাধিকার ও রাজনৈতিক নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকার বারবার অনুরোধ করলেও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তা উপেক্ষা করেছে।

নিউইয়র্কের এই ঘটনা কেবল একটি কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ। একই ধরনের হামলার পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে, মিশনের ভেতরে দুর্বলতা, অব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব বিদ্যমান। প্রশ্ন হলো—এবারও কি দায় এড়াতে সক্ষম হবেন মিশনের কর্মকর্তারা, নাকি প্রকৃত তদন্ত ও জবাবদিহির মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটিত হবে?