সময়: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এক দেশে দুই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ১৫ ব্যাংকের লুটের কাহিনি

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১১:৪৭:৩২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • / ১৫৮ Time View

1758514427 b0af807b8d79c6a60702c899dd7a603b

1758514427 b0af807b8d79c6a60702c899dd7a603b

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনা চললেও সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক আলোচনায় এর প্রকট সংকট ও লুটপাটের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে কার্যত একসময় দুইটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করেছে। একটি হলো বাংলাদেশ ব্যাংক, যা আইন ও নীতিগতভাবে দেশের একমাত্র কেন্দ্রীয় ব্যাংক; আরেকটি পরিচালিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে, যেখানে থেকে ১২–১৪টি ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। ফলাফল হয়েছে ভয়াবহ—কমপক্ষে ১৫টি ব্যাংক সরাসরি বা পরোক্ষভাবে লুট হয়ে গেছে।

রবিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত ব্যাংক খাতের সংকট, সংস্কার নিয়ন্ত্রণ’ শীর্ষক আলোচনায় এসব তথ্য উঠে আসে। এ সম্মেলনের আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয় (ইউএপি) এবং জার্মানির ওটিএইচ অ্যামবার্গ-ওয়েইডেন। শনিবার ইউএপি ক্যাম্পাসে উদ্বোধনের পর দ্বিতীয় দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাংক খাতের গভীর সংকট নিয়ে আলোচনা হয়।

আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন মাহমুদ ওসমান ইমাম। তিনি বলেন, আর্থিক খাত সংস্কার একটি জটিল ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। দেশে ভালো ব্যাংক যেমন আছে, তেমনি রয়েছে জম্বি ব্যাংক’, যেগুলো কার্যত দেউলিয়া হলেও এখনো টিকে আছে। কিছু ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯০ শতাংশেরও বেশি, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য মারাত্মক হুমকি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংককে কার্যকর স্বাধীনতা না দিলে কোনো সংস্কার সফল হবে না।

মাহমুদ ওসমান ইমাম আরও প্রস্তাব দেন—

  • ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে এক পরিবারের সর্বোচ্চ দুজনকে পরিচালনা পর্ষদে রাখার সীমা নির্ধারণ করতে হবে।
  • পরিচালকদের মেয়াদ ১২ বছর থেকে কমিয়ে ৬ বছরে নামাতে হবে।
  • চেয়ারম্যান ও নির্বাহী চেয়ারম্যানের পদে মালিকপক্ষের বাইরে পেশাদার কাউকে বসাতে হবে।

সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, বর্তমানে ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৪ লাখ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ এবং আরও ৭ লাখ কোটি টাকা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ৬০টি ব্যাংকের মধ্যে প্রায় ১৫টি ব্যাংককে লুট

হওয়া ব্যাংক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭টি সরাসরি লুট হয়েছে, আর বাকি ৬–৭টি লুট হয়েছে পরোক্ষভাবে। সরকার বর্তমানে ৫টি জম্বি ব্যাংককে একীভূত করার প্রক্রিয়ায় আছে।

তিনি আরও বলেন, “আমরা বাংলাদেশে আসলে দুইটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রম দেখেছি। একটি হলো বাংলাদেশ ব্যাংক, আরেকটি পরিচালিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে। ওই স্থান থেকেই ১২–১৪টি ব্যাংকের সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। এটি দেশের ব্যাংক খাত ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ। একজন এস আলম বেনামে গোটা ব্যাংক খাতের ক্ষতি করেছেন।”

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা তুলে ধরে বলেন, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর নাগাদ এর পরিমাণ ছিল সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকা, মার্চ ২০২৫ নাগাদ তা ৪ লাখ কোটি ছাড়িয়েছে এবং ২০২৫ সালের জুন নাগাদ আরও দেড় লাখ কোটি টাকা বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে, অনেক আমানতকারী প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে পারছেন না।

ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হোসেন বলেন, ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হলে—

  • স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ কার্যকর করতে হবে,
  • ব্যবস্থাপনা সংস্কার করতে হবে,
  • এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘হুইসেলব্লোয়িং’ নীতি শক্তিশালী করতে হবে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা কেবল কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেও নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। আগামী নির্বাচন-পরবর্তী যে সরকারই আসুক না কেন, তাদের দায়িত্ব হবে ব্যাংক খাতে প্রকৃত সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।

সব মিলিয়ে আলোচনায় স্পষ্ট হয় যে, দেশের ব্যাংক খাত শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবেরও শিকার হয়েছে। এক দেশে কার্যত দুই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি হয়ে ব্যাংক খাতকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছে। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা সংস্কার, আইনি পরিবর্তন ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বয় ছাড়া এ খাতকে টিকিয়ে রাখাকে প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

এক দেশে দুই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ১৫ ব্যাংকের লুটের কাহিনি

Update Time : ১১:৪৭:৩২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫

1758514427 b0af807b8d79c6a60702c899dd7a603b

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনা চললেও সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক আলোচনায় এর প্রকট সংকট ও লুটপাটের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে কার্যত একসময় দুইটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করেছে। একটি হলো বাংলাদেশ ব্যাংক, যা আইন ও নীতিগতভাবে দেশের একমাত্র কেন্দ্রীয় ব্যাংক; আরেকটি পরিচালিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে, যেখানে থেকে ১২–১৪টি ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। ফলাফল হয়েছে ভয়াবহ—কমপক্ষে ১৫টি ব্যাংক সরাসরি বা পরোক্ষভাবে লুট হয়ে গেছে।

রবিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত ব্যাংক খাতের সংকট, সংস্কার নিয়ন্ত্রণ’ শীর্ষক আলোচনায় এসব তথ্য উঠে আসে। এ সম্মেলনের আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয় (ইউএপি) এবং জার্মানির ওটিএইচ অ্যামবার্গ-ওয়েইডেন। শনিবার ইউএপি ক্যাম্পাসে উদ্বোধনের পর দ্বিতীয় দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাংক খাতের গভীর সংকট নিয়ে আলোচনা হয়।

আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন মাহমুদ ওসমান ইমাম। তিনি বলেন, আর্থিক খাত সংস্কার একটি জটিল ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। দেশে ভালো ব্যাংক যেমন আছে, তেমনি রয়েছে জম্বি ব্যাংক’, যেগুলো কার্যত দেউলিয়া হলেও এখনো টিকে আছে। কিছু ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯০ শতাংশেরও বেশি, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য মারাত্মক হুমকি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংককে কার্যকর স্বাধীনতা না দিলে কোনো সংস্কার সফল হবে না।

মাহমুদ ওসমান ইমাম আরও প্রস্তাব দেন—

  • ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে এক পরিবারের সর্বোচ্চ দুজনকে পরিচালনা পর্ষদে রাখার সীমা নির্ধারণ করতে হবে।
  • পরিচালকদের মেয়াদ ১২ বছর থেকে কমিয়ে ৬ বছরে নামাতে হবে।
  • চেয়ারম্যান ও নির্বাহী চেয়ারম্যানের পদে মালিকপক্ষের বাইরে পেশাদার কাউকে বসাতে হবে।

সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, বর্তমানে ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৪ লাখ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ এবং আরও ৭ লাখ কোটি টাকা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ৬০টি ব্যাংকের মধ্যে প্রায় ১৫টি ব্যাংককে লুট

হওয়া ব্যাংক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭টি সরাসরি লুট হয়েছে, আর বাকি ৬–৭টি লুট হয়েছে পরোক্ষভাবে। সরকার বর্তমানে ৫টি জম্বি ব্যাংককে একীভূত করার প্রক্রিয়ায় আছে।

তিনি আরও বলেন, “আমরা বাংলাদেশে আসলে দুইটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রম দেখেছি। একটি হলো বাংলাদেশ ব্যাংক, আরেকটি পরিচালিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে। ওই স্থান থেকেই ১২–১৪টি ব্যাংকের সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। এটি দেশের ব্যাংক খাত ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ। একজন এস আলম বেনামে গোটা ব্যাংক খাতের ক্ষতি করেছেন।”

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা তুলে ধরে বলেন, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর নাগাদ এর পরিমাণ ছিল সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকা, মার্চ ২০২৫ নাগাদ তা ৪ লাখ কোটি ছাড়িয়েছে এবং ২০২৫ সালের জুন নাগাদ আরও দেড় লাখ কোটি টাকা বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে, অনেক আমানতকারী প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে পারছেন না।

ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হোসেন বলেন, ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হলে—

  • স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ কার্যকর করতে হবে,
  • ব্যবস্থাপনা সংস্কার করতে হবে,
  • এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘হুইসেলব্লোয়িং’ নীতি শক্তিশালী করতে হবে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা কেবল কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেও নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। আগামী নির্বাচন-পরবর্তী যে সরকারই আসুক না কেন, তাদের দায়িত্ব হবে ব্যাংক খাতে প্রকৃত সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।

সব মিলিয়ে আলোচনায় স্পষ্ট হয় যে, দেশের ব্যাংক খাত শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবেরও শিকার হয়েছে। এক দেশে কার্যত দুই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি হয়ে ব্যাংক খাতকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছে। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা সংস্কার, আইনি পরিবর্তন ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বয় ছাড়া এ খাতকে টিকিয়ে রাখাকে প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন।