সময়: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অস্থায়ী প্রশাসক বসছে পাঁচ ইসলামী ব্যাংকে, একীভূত হয়ে আসছে ‘ইউনাইটেড ইসলামী ব্যাংক’

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১২:৪০:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • / ১৪০ Time View

five banks(1)

five banks(1)

সংকটে জর্জরিত দেশের পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করার প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের আওতায় প্রতিটি ব্যাংকে একজন করে অস্থায়ী প্রশাসক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। প্রশাসকদের সহায়তার জন্য চারজন করে অতিরিক্ত কর্মকর্তা থাকবেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাবি, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে ব্যাংক খাতের প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠনই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

আজ মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত সার্বিক বিষয় অবহিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বিশেষ সভা আহ্বান করা হয়েছে। সভায় ‘এক্সিম ব্যাংক’, ‘সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক’, ‘ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক’, ‘ইউনিয়ন ব্যাংক’ ও ‘গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক’—এই পাঁচ শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করার বিষয়ে সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।

বিপুল খেলাপি ঋণের চাপ

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এসব ব্যাংকের ৪৮ থেকে ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ বর্তমানে খেলাপি হিসেবে পড়ে আছে, যা ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তিকে সম্পূর্ণভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। অতীত সরকার আমলে বিভিন্ন জালিয়াতি ও অনিয়মের কারণে এই ঋণ খেলাপির পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। সংকট মোকাবিলায় পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার জন্য মোট ৩৫ হাজার ২০০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে, যার মধ্যে সরকার সরাসরি ২০ হাজার ২০০ কোটি টাকা মূলধন জোগান দিচ্ছে।

নতুন ব্যাংকের কাঠামো

প্রশাসক নিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যমান পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ শূন্য ঘোষণা করা হবে। একইভাবে বিদ্যমান শেয়ারও বাতিল হয়ে যাবে। তবে আমানতকারী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। একীভূতকরণের পূর্বে নতুন একটি ব্যাংকের লাইসেন্স ইস্যু করা হবে, যার সম্ভাব্য নাম নির্ধারণ করা হয়েছে— ইউনাইটেড ইসলামী ব্যাংক’

সরকারের মূলধনে গঠিত এই নতুন ব্যাংকের অধীনে পাঁচ ব্যাংকের সব সম্পদ ও দায় একীভূত হয়ে যাবে। এরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ব্যাংকের যাত্রা শুরু হবে। একীভূতকরণের পর সরকারের বিনিয়োগ ধীরে ধীরে শেয়ার বাজারে ছাড়ার মাধ্যমে ফেরত নেওয়া হবে। পাশাপাশি বড় অঙ্কের আমানতকারীদের শেয়ার নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হবে, যাতে তারা নতুন কাঠামোর অংশ হতে পারেন। অন্যদিকে ছোট আমানতকারীরা চাইলে সহজে তাদের আমানত উত্তোলন করতে পারবেন।

style="text-align: justify;">আলোচনার শেষ ধাপ

চলতি মাসের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংক এই পাঁচ ব্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনা করে। সেখানে প্রতিটি ব্যাংকের কাছে শেষবারের মতো জানতে চাওয়া হয়— কেন তাদের একীভূত করা উচিত নয়। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক সরাসরি একীভূতে সম্মতি জানায়। অন্যদিকে এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক সময় চাইলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর অতিরিক্ত সময় দেয়নি।

আমানতকারীদের প্রতি আশ্বাস

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সম্প্রতি এক আলোচনায় বলেন, অমানতকারীদের সুরক্ষাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। ব্যাংকগুলো একীভূত হলেও আমানতকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সরকার তাদের অর্থ ফেরত নিশ্চিত করবে এবং পূর্ণ দায়িত্ব নেবে।”

বিশ্লেষণ

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই একীভূতকরণ কেবল সংকটে থাকা পাঁচ ব্যাংকের পুনর্গঠনই নয়, পুরো ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার জন্যও বড় ধরনের পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ। সরকারের পক্ষ থেকে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে এই উদ্যোগ সফল হলে, ভবিষ্যতে ব্যাংক খাতে জালিয়াতি ও অনিয়ম ঠেকানোর জন্য একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

অস্থায়ী প্রশাসক বসছে পাঁচ ইসলামী ব্যাংকে, একীভূত হয়ে আসছে ‘ইউনাইটেড ইসলামী ব্যাংক’

Update Time : ১২:৪০:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫

five banks(1)

সংকটে জর্জরিত দেশের পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করার প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের আওতায় প্রতিটি ব্যাংকে একজন করে অস্থায়ী প্রশাসক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। প্রশাসকদের সহায়তার জন্য চারজন করে অতিরিক্ত কর্মকর্তা থাকবেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাবি, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে ব্যাংক খাতের প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠনই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

আজ মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত সার্বিক বিষয় অবহিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বিশেষ সভা আহ্বান করা হয়েছে। সভায় ‘এক্সিম ব্যাংক’, ‘সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক’, ‘ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক’, ‘ইউনিয়ন ব্যাংক’ ও ‘গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক’—এই পাঁচ শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করার বিষয়ে সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।

বিপুল খেলাপি ঋণের চাপ

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এসব ব্যাংকের ৪৮ থেকে ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ বর্তমানে খেলাপি হিসেবে পড়ে আছে, যা ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তিকে সম্পূর্ণভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। অতীত সরকার আমলে বিভিন্ন জালিয়াতি ও অনিয়মের কারণে এই ঋণ খেলাপির পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। সংকট মোকাবিলায় পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার জন্য মোট ৩৫ হাজার ২০০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে, যার মধ্যে সরকার সরাসরি ২০ হাজার ২০০ কোটি টাকা মূলধন জোগান দিচ্ছে।

নতুন ব্যাংকের কাঠামো

প্রশাসক নিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যমান পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ শূন্য ঘোষণা করা হবে। একইভাবে বিদ্যমান শেয়ারও বাতিল হয়ে যাবে। তবে আমানতকারী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। একীভূতকরণের পূর্বে নতুন একটি ব্যাংকের লাইসেন্স ইস্যু করা হবে, যার সম্ভাব্য নাম নির্ধারণ করা হয়েছে— ইউনাইটেড ইসলামী ব্যাংক’

সরকারের মূলধনে গঠিত এই নতুন ব্যাংকের অধীনে পাঁচ ব্যাংকের সব সম্পদ ও দায় একীভূত হয়ে যাবে। এরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ব্যাংকের যাত্রা শুরু হবে। একীভূতকরণের পর সরকারের বিনিয়োগ ধীরে ধীরে শেয়ার বাজারে ছাড়ার মাধ্যমে ফেরত নেওয়া হবে। পাশাপাশি বড় অঙ্কের আমানতকারীদের শেয়ার নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হবে, যাতে তারা নতুন কাঠামোর অংশ হতে পারেন। অন্যদিকে ছোট আমানতকারীরা চাইলে সহজে তাদের আমানত উত্তোলন করতে পারবেন।

style="text-align: justify;">আলোচনার শেষ ধাপ

চলতি মাসের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংক এই পাঁচ ব্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনা করে। সেখানে প্রতিটি ব্যাংকের কাছে শেষবারের মতো জানতে চাওয়া হয়— কেন তাদের একীভূত করা উচিত নয়। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক সরাসরি একীভূতে সম্মতি জানায়। অন্যদিকে এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক সময় চাইলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর অতিরিক্ত সময় দেয়নি।

আমানতকারীদের প্রতি আশ্বাস

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সম্প্রতি এক আলোচনায় বলেন, অমানতকারীদের সুরক্ষাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। ব্যাংকগুলো একীভূত হলেও আমানতকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সরকার তাদের অর্থ ফেরত নিশ্চিত করবে এবং পূর্ণ দায়িত্ব নেবে।”

বিশ্লেষণ

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই একীভূতকরণ কেবল সংকটে থাকা পাঁচ ব্যাংকের পুনর্গঠনই নয়, পুরো ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার জন্যও বড় ধরনের পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ। সরকারের পক্ষ থেকে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে এই উদ্যোগ সফল হলে, ভবিষ্যতে ব্যাংক খাতে জালিয়াতি ও অনিয়ম ঠেকানোর জন্য একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে।