সময়: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্রিটিশ সংসদে কান্নায় ভেঙে পড়লেন এমপি আপসানা বেগম, সাবেক স্বামী এনসিপি নেতা এহতেশামুল হকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১০:৫৫:৫৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • / ১৮৫ Time View

2 20250906095607

2 20250906095607

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এক আবেগঘন মুহূর্তে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়লেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত স্বতন্ত্র এমপি আপসানা বেগম। হাউস অফ কমন্সে দেওয়া ওই বক্তব্যে তিনি সরাসরি তার সাবেক স্বামী, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক এহতেশামুল হকের বিরুদ্ধে হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগ আনেন। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক দল ও নিয়োগকর্তাদের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানান, পারিবারিক সহিংসতার শিকারদের জন্য “ডিউটি অফ কেয়ার” বা যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

সংসদে কান্নাভেজা আবেদন

পপলার ও লাইমহাউস আসনের এই এমপি বলেন, তার সাবেক স্বামী একটি সুপরিকল্পিত অভিযানের মাধ্যমে তাকে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছেন। আপসানা বেগম দাবি করেন, তার প্রাক্তন স্বামী নির্বাচনী এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন শুধুমাত্র তাকে “উন্মোচন” করার লক্ষ্য নিয়ে। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন—
আমি তার সহযোগীদের একটি চক্র দ্বারা এমপি হিসেবে আমাকে অন্যায়ভাবে অপসারণের নিরন্তর চেষ্টার পাশাপাশি ব্যক্তিগত হয়রানি সহ্য করে চলেছি। এর প্রভাব ছিল বিধ্বংসী। আমি প্রাতিষ্ঠানিক গ্যাসলাইটিংয়ের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার শিকার।”

সাবেক স্বামীর অবস্থান

এহতেশামুল হক অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এর আগেই এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, আপসানার প্রতি আমার কোনো ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নেই। আমি তাকে আমার সাবেক স্ত্রী হিসেবে সম্মান করি। তবে আমার সাবেক স্ত্রী এমপি হওয়ার কারণে আমি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হতে পারব না—এমন কোনো আইন নেই।”
গত নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে মাত্র ৪,৫৫৪ ভোট পান, যেখানে লেবার পার্টির হয়ে আপসানা বেগম পান ১৮,৫৩৫ ভোট। তার বর্তমান স্ত্রী, যিনি আগে লেবারের কাউন্সিলর ছিলেন, সম্প্রতি লেবার ত্যাগ করে টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র লুৎফুর রহমানের এস্পায়ার পার্টিতে যোগ দেন।

দম্পতির অতীত সম্পর্ক ও বিতর্ক

সাবেক এই দম্পতির সম্পর্ক শুরু হয় ২০১৩ সালের বিয়ে দিয়ে, তবে ২০১৫ সালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। দুজনের পৈতৃক নিবাস সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে হলেও তারা জন্ম ও বেড়ে ওঠেন পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসে। আপসানার বাবা মনির উদ্দিন স্থানীয় কাউন্সিলর ছিলেন।

/> ২০১৫ সালের পর থেকেই তাদের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক চলতে থাকে। ২০২০ সালে আপসানা প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, তিনি পারিবারিক সহিংসতা, জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। একই বছর তার বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলা হয়, যা আদালত ২০২১ সালে খারিজ করে দেন। আপসানা দাবি করেছিলেন, এটি তার সাবেক স্বামীর নেতৃত্বাধীন একটি বিদ্বেষমূলক প্রচারণার অংশ।

বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান

লেবার পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর আপসানা বেগম এখন স্বতন্ত্র এমপি হিসেবে কাজ করছেন। শোনা যাচ্ছে, আসন্ন নির্বাচনে তিনি জেরেমি করবিনপন্থী একটি নতুন দলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর এহতেশামুল হক এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, তার লক্ষ্য এমপি হওয়া নয়, বরং নতুন দল গোছানো।

সংসদে প্রতিক্রিয়া

আপসানার কান্নাভেজা বক্তব্য সংসদে উপস্থিত অন্য এমপিদেরও নাড়া দেয়। লেবার এমপি স্টেলা ক্রিসি ও কমন্স লিডার লুসি পাওয়েল তার সাহসের প্রশংসা করেন। তারা প্রতিশ্রুতি দেন যে, আসন্ন একটি নির্বাচনী বিলে প্রার্থীর উপযুক্ততা ও আচরণ নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করা হবে।

সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া

ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও এই ঘটনা নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, সাবেক স্বামীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কৌশল ছিল। অন্যদিকে, সমালোচকরা বলছেন, আপসানার ব্যক্তিগত জীবনের জটিলতা এখন রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে, যা তার ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলছে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ব্রিটিশ সংসদে কান্নায় ভেঙে পড়লেন এমপি আপসানা বেগম, সাবেক স্বামী এনসিপি নেতা এহতেশামুল হকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ

Update Time : ১০:৫৫:৫৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫

2 20250906095607

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এক আবেগঘন মুহূর্তে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়লেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত স্বতন্ত্র এমপি আপসানা বেগম। হাউস অফ কমন্সে দেওয়া ওই বক্তব্যে তিনি সরাসরি তার সাবেক স্বামী, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক এহতেশামুল হকের বিরুদ্ধে হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগ আনেন। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক দল ও নিয়োগকর্তাদের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানান, পারিবারিক সহিংসতার শিকারদের জন্য “ডিউটি অফ কেয়ার” বা যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

সংসদে কান্নাভেজা আবেদন

পপলার ও লাইমহাউস আসনের এই এমপি বলেন, তার সাবেক স্বামী একটি সুপরিকল্পিত অভিযানের মাধ্যমে তাকে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছেন। আপসানা বেগম দাবি করেন, তার প্রাক্তন স্বামী নির্বাচনী এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন শুধুমাত্র তাকে “উন্মোচন” করার লক্ষ্য নিয়ে। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন—
আমি তার সহযোগীদের একটি চক্র দ্বারা এমপি হিসেবে আমাকে অন্যায়ভাবে অপসারণের নিরন্তর চেষ্টার পাশাপাশি ব্যক্তিগত হয়রানি সহ্য করে চলেছি। এর প্রভাব ছিল বিধ্বংসী। আমি প্রাতিষ্ঠানিক গ্যাসলাইটিংয়ের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার শিকার।”

সাবেক স্বামীর অবস্থান

এহতেশামুল হক অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এর আগেই এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, আপসানার প্রতি আমার কোনো ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নেই। আমি তাকে আমার সাবেক স্ত্রী হিসেবে সম্মান করি। তবে আমার সাবেক স্ত্রী এমপি হওয়ার কারণে আমি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হতে পারব না—এমন কোনো আইন নেই।”
গত নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে মাত্র ৪,৫৫৪ ভোট পান, যেখানে লেবার পার্টির হয়ে আপসানা বেগম পান ১৮,৫৩৫ ভোট। তার বর্তমান স্ত্রী, যিনি আগে লেবারের কাউন্সিলর ছিলেন, সম্প্রতি লেবার ত্যাগ করে টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র লুৎফুর রহমানের এস্পায়ার পার্টিতে যোগ দেন।

দম্পতির অতীত সম্পর্ক ও বিতর্ক

সাবেক এই দম্পতির সম্পর্ক শুরু হয় ২০১৩ সালের বিয়ে দিয়ে, তবে ২০১৫ সালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। দুজনের পৈতৃক নিবাস সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে হলেও তারা জন্ম ও বেড়ে ওঠেন পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসে। আপসানার বাবা মনির উদ্দিন স্থানীয় কাউন্সিলর ছিলেন।

/> ২০১৫ সালের পর থেকেই তাদের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক চলতে থাকে। ২০২০ সালে আপসানা প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, তিনি পারিবারিক সহিংসতা, জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। একই বছর তার বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলা হয়, যা আদালত ২০২১ সালে খারিজ করে দেন। আপসানা দাবি করেছিলেন, এটি তার সাবেক স্বামীর নেতৃত্বাধীন একটি বিদ্বেষমূলক প্রচারণার অংশ।

বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান

লেবার পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর আপসানা বেগম এখন স্বতন্ত্র এমপি হিসেবে কাজ করছেন। শোনা যাচ্ছে, আসন্ন নির্বাচনে তিনি জেরেমি করবিনপন্থী একটি নতুন দলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর এহতেশামুল হক এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, তার লক্ষ্য এমপি হওয়া নয়, বরং নতুন দল গোছানো।

সংসদে প্রতিক্রিয়া

আপসানার কান্নাভেজা বক্তব্য সংসদে উপস্থিত অন্য এমপিদেরও নাড়া দেয়। লেবার এমপি স্টেলা ক্রিসি ও কমন্স লিডার লুসি পাওয়েল তার সাহসের প্রশংসা করেন। তারা প্রতিশ্রুতি দেন যে, আসন্ন একটি নির্বাচনী বিলে প্রার্থীর উপযুক্ততা ও আচরণ নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করা হবে।

সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া

ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও এই ঘটনা নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, সাবেক স্বামীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কৌশল ছিল। অন্যদিকে, সমালোচকরা বলছেন, আপসানার ব্যক্তিগত জীবনের জটিলতা এখন রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে, যা তার ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলছে।