সময়: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সমকামিতার অভিযোগে আচেহ প্রদেশে দুই যুবককে প্রকাশ্যে ৭৬ বেত্রাঘাত

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১২:১২:৪৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৫
  • / ১৩১ Time View

indu 20250828112308

indu 20250828112308

ইন্দোনেশিয়ার রক্ষণশীল প্রদেশ আচেহ-তে সমকামিতার অভিযোগে দুই যুবককে প্রকাশ্যে ৭৬টি বেত্রাঘাত করা হয়েছে। শরিয়া আদালতের রায়ে দেওয়া এই শাস্তি মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) বান্দা আচেহ শহরের একটি পার্কে কার্যকর করা হয়। সমকামী সম্পর্ক ইসলামে নিষিদ্ধ হওয়ায় স্থানীয় ইসলামী শরিয়া আইন অনুযায়ী তাদের এই শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, গত এপ্রিল মাসে আচেহ প্রদেশের একটি পার্কের শৌচাগারে দুই যুবককে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখে স্থানীয় এক ব্যক্তি পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ হাতেনাতে তাদের গ্রেপ্তার করে। আদালতে শুনানির পর তাদের ৮০ বেত্রাঘাতের রায় দেওয়া হলেও পরবর্তীতে তা কমিয়ে ৭৬ বেত্রাঘাত এবং চার মাসের কারাদণ্ড নির্ধারণ করা হয়।

ঘটনাস্থলে প্রায় ১০ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্য পালাক্রমে বেত্রাঘাত করেন। দুই যুবক ছাড়াও ওইদিন একই স্থানে বিভিন্ন অপরাধে আরও আটজনকে বেত্রাঘাত করা হয়। এদের মধ্যে তিনজন নারী ও পাঁচজন পুরুষ ছিলেন। তাদের মধ্যে কেউ বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্কের দায়ে, কেউ আবার অনলাইন জুয়া খেলার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন।

আচেহ প্রদেশে শরিয়া আইনের কঠোর প্রয়োগ

আচেহ প্রদেশ ইন্দোনেশিয়ার একমাত্র অঞ্চল যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামী শরিয়া আইন কার্যকর রয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইন্দোনেশিয়ার বাকি অংশে সমকামী সম্পর্ক আইনত অপরাধ নয়, তবে আচেহ প্রদেশে এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই অঞ্চলে জনসমক্ষে বেত্রাঘাতের মতো শাস্তি বহু বছর ধরে প্রচলিত এবং নিয়মিতভাবে কার্যকর হয়।
স্থানীয় সমাজে এই আইনগুলোর প্রতি সমর্থন রয়েছে বলে মনে করা হয়, তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের শাস্তিকে “মানবাধিকার লঙ্ঘন” হিসেবে অভিহিত করছে।

বান্দা আচেহ পুলিশের প্রধান রোজলিনা এ জলিল জানান, “আমরা আইন অনুযায়ী সাজা কার্যকর করেছি। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় অভিযুক্তদের প্রকাশ্যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।”

আন্তর্জাতিক মহলের নিন্দা

ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্ববিখ্যাত মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে এই শাস্তিকে “মধ্যযুগীয়” এবং “মানবাধিকারের ঘোরতর লঙ্ঘন” বলে নিন্দা জানিয়েছে। সংস্থার পরিচালক মন্টসে ফেরার বলেন, “সমকামী আচরণকে অপরাধ ঘোষণা করা মানব সমাজে কোনোভাবেই ন্যায়সঙ্গত নয়। কারও ব্যক্তিগত জীবনযাপন বা যৌন অভিমুখিতার জন্য তাকে অপরাধী বানানো সম্পূর্ণ অমানবিক।”

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আরও বলেছে, ইন্দোনেশিয়া সরকারের উচিত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির প্রতি সম্মান দেখানো এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। তারা আচেহ প্রদেশে এই ধরনের জনসমক্ষে বেত্রাঘাতের শাস্তি বন্ধ করার আহ্বান জানায়।

সমালোচনা বিতর্ক

সমকামিতার বিরুদ্ধে কঠোর শরিয়া আইন কার্যকর থাকলেও ইন্দোনেশিয়ার সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে এ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এই আইন শুধু সমকামী ব্যক্তিদের নয়, বরং সমাজে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর ভয় ও দমননীতিকে আরও শক্তিশালী করছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে আচেহ প্রদেশে বেত্রাঘাত, অঙ্গহানি ও জনসমক্ষে শাস্তি প্রদানের মতো প্রথা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে আসছে। তবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দাবি করে, এটি তাদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতিফলন এবং স্থানীয় জনগণের সমর্থন রয়েছে।

ঘটনাটি আবারও দেখিয়ে দিল, বিশ্বে অনেক দেশ এখনও যৌন অভিমুখিতার স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিতে পারেনি। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, যৌন অভিমুখিতা একটি ব্যক্তিগত বিষয় এবং এর জন্য কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে এই ধরনের কঠোর শরিয়া আইনের প্রয়োগ শুধু স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনার ঝড় তুলছে না, বরং এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মানবাধিকারের চ্যালেঞ্জকেও নতুন করে সামনে নিয়ে আসছে।

সূত্র: এনডিটিভি

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সমকামিতার অভিযোগে আচেহ প্রদেশে দুই যুবককে প্রকাশ্যে ৭৬ বেত্রাঘাত

Update Time : ১২:১২:৪৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৫

indu 20250828112308

ইন্দোনেশিয়ার রক্ষণশীল প্রদেশ আচেহ-তে সমকামিতার অভিযোগে দুই যুবককে প্রকাশ্যে ৭৬টি বেত্রাঘাত করা হয়েছে। শরিয়া আদালতের রায়ে দেওয়া এই শাস্তি মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) বান্দা আচেহ শহরের একটি পার্কে কার্যকর করা হয়। সমকামী সম্পর্ক ইসলামে নিষিদ্ধ হওয়ায় স্থানীয় ইসলামী শরিয়া আইন অনুযায়ী তাদের এই শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, গত এপ্রিল মাসে আচেহ প্রদেশের একটি পার্কের শৌচাগারে দুই যুবককে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখে স্থানীয় এক ব্যক্তি পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ হাতেনাতে তাদের গ্রেপ্তার করে। আদালতে শুনানির পর তাদের ৮০ বেত্রাঘাতের রায় দেওয়া হলেও পরবর্তীতে তা কমিয়ে ৭৬ বেত্রাঘাত এবং চার মাসের কারাদণ্ড নির্ধারণ করা হয়।

ঘটনাস্থলে প্রায় ১০ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্য পালাক্রমে বেত্রাঘাত করেন। দুই যুবক ছাড়াও ওইদিন একই স্থানে বিভিন্ন অপরাধে আরও আটজনকে বেত্রাঘাত করা হয়। এদের মধ্যে তিনজন নারী ও পাঁচজন পুরুষ ছিলেন। তাদের মধ্যে কেউ বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্কের দায়ে, কেউ আবার অনলাইন জুয়া খেলার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন।

আচেহ প্রদেশে শরিয়া আইনের কঠোর প্রয়োগ

আচেহ প্রদেশ ইন্দোনেশিয়ার একমাত্র অঞ্চল যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামী শরিয়া আইন কার্যকর রয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইন্দোনেশিয়ার বাকি অংশে সমকামী সম্পর্ক আইনত অপরাধ নয়, তবে আচেহ প্রদেশে এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই অঞ্চলে জনসমক্ষে বেত্রাঘাতের মতো শাস্তি বহু বছর ধরে প্রচলিত এবং নিয়মিতভাবে কার্যকর হয়।
স্থানীয় সমাজে এই আইনগুলোর প্রতি সমর্থন রয়েছে বলে মনে করা হয়, তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের শাস্তিকে “মানবাধিকার লঙ্ঘন” হিসেবে অভিহিত করছে।

বান্দা আচেহ পুলিশের প্রধান রোজলিনা এ জলিল জানান, “আমরা আইন অনুযায়ী সাজা কার্যকর করেছি। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় অভিযুক্তদের প্রকাশ্যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।”

আন্তর্জাতিক মহলের নিন্দা

ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্ববিখ্যাত মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে এই শাস্তিকে “মধ্যযুগীয়” এবং “মানবাধিকারের ঘোরতর লঙ্ঘন” বলে নিন্দা জানিয়েছে। সংস্থার পরিচালক মন্টসে ফেরার বলেন, “সমকামী আচরণকে অপরাধ ঘোষণা করা মানব সমাজে কোনোভাবেই ন্যায়সঙ্গত নয়। কারও ব্যক্তিগত জীবনযাপন বা যৌন অভিমুখিতার জন্য তাকে অপরাধী বানানো সম্পূর্ণ অমানবিক।”

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আরও বলেছে, ইন্দোনেশিয়া সরকারের উচিত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির প্রতি সম্মান দেখানো এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। তারা আচেহ প্রদেশে এই ধরনের জনসমক্ষে বেত্রাঘাতের শাস্তি বন্ধ করার আহ্বান জানায়।

সমালোচনা বিতর্ক

সমকামিতার বিরুদ্ধে কঠোর শরিয়া আইন কার্যকর থাকলেও ইন্দোনেশিয়ার সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে এ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এই আইন শুধু সমকামী ব্যক্তিদের নয়, বরং সমাজে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর ভয় ও দমননীতিকে আরও শক্তিশালী করছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে আচেহ প্রদেশে বেত্রাঘাত, অঙ্গহানি ও জনসমক্ষে শাস্তি প্রদানের মতো প্রথা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে আসছে। তবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দাবি করে, এটি তাদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতিফলন এবং স্থানীয় জনগণের সমর্থন রয়েছে।

ঘটনাটি আবারও দেখিয়ে দিল, বিশ্বে অনেক দেশ এখনও যৌন অভিমুখিতার স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিতে পারেনি। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, যৌন অভিমুখিতা একটি ব্যক্তিগত বিষয় এবং এর জন্য কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে এই ধরনের কঠোর শরিয়া আইনের প্রয়োগ শুধু স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনার ঝড় তুলছে না, বরং এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মানবাধিকারের চ্যালেঞ্জকেও নতুন করে সামনে নিয়ে আসছে।

সূত্র: এনডিটিভি