‘মঞ্চ ৭১’-এর আড়ালে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের গভীর ষড়যন্ত্র!
- Update Time : ০৬:০২:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৫
- / ২৯১ Time View

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে ‘মঞ্চ ৭১’। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ভালোবাসা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা রক্ষার দাবিতে আত্মপ্রকাশ করা এই সংগঠনটিকে ঘিরে অভিযোগ উঠেছে—এটি আসলে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ এবং পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার রাজনৈতিক পুনর্বাসনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
বিগত ১৬ বছরের আওয়ামী শাসনামলে সংঘটিত গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের দমন-পীড়ন, এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে চালানো রক্তাক্ত হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান না নেওয়ায় সংগঠনটির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি আবেগ ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের আড়ালে একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে তারা।
‘আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের সংবিধান’—বিতর্কিত গোলটেবিল বৈঠক
বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘মঞ্চ ৭১’ আয়োজিত ‘আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের সংবিধান’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অনুষ্ঠানে সাবেক আওয়ামীপন্থী রাজনীতিবিদ, প্রাক্তন মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ মহলের সদস্যদের উপস্থিতি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যদিও প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল প্রবীণ আইনজীবী এবং গণফোরামের সাবেক সভাপতি ড. কামাল হোসেনের, তিনি শেষ পর্যন্ত উপস্থিত হননি। সংগঠনটির নেতৃত্বে রয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ (বীর প্রতীক) এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না। সমালোচকদের অভিযোগ, শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ইস্যুতে যিনি সরাসরি অবস্থান নেননি, তার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের নাম ভাঙিয়ে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা একটি প্রহসন।
পুলিশি অভিযান ও প্রতিবাদ
অনুষ্ঠান ঘিরে উত্তেজনা চরমে পৌঁছে যায় যখন পুলিশ সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীসহ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকে আটক করে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে সবার নাম প্রকাশ করা হয়নি, তবুও ঘটনাটি রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
অন্যদিকে, ‘জুলাই যোদ্ধা’ ব্যানারে আল আমিন রাসেলের নেতৃত্বে একদল তরুণ সংগঠনের এই কর্মসূচির বিরোধিতা জানিয়ে অনুষ্ঠানস্থল ঘেরাও করে। তারা উপস্থিত আওয়ামীপন্থী নেতাদের অবরুদ্ধ করে রাখেন এবং ‘মঞ্চ ৭১’-কে শেখ হাসিনা ও তার রাজনৈতিক শিবিরের পুনর্বাসনমূলক প্ল্যাটফর্ম আখ্যা দেন।
রাজনৈতিক তাৎপর্য ও বিতর্ক
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো সবসময়ই বাংলাদেশে জনসমর্থন আদায়ের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। কিন্তু সেটি যদি ব্যবহার হয় একটি বিতর্কিত ও স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর তাদের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের হাতিয়ার হিসেবে, তাহলে তা কেবল ইতিহাস বিকৃতির সামিলই নয়, বরং ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
‘মঞ্চ ৭১’-এর নেতৃত্বে যারা রয়েছেন, তাদের রাজনৈতিক অতীত এবং ব্যক্তিগত অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এই সংগঠনটি শুধুমাত্র মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সংরক্ষণে কাজ করছে না, বরং রাজনৈতিক পুনর্বাসনের এক সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনামলে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম-খুন এবং দমননীতির বিষয়ে নীরবতা তাদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
জনমতের প্রতিক্রিয়া
গণমানুষের মধ্যে এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, ‘মঞ্চ ৭১’ আসলে একটি মুখোশধারী সংগঠন, যারা মুক্তিযুদ্ধের নাম ব্যবহার করে ফ্যাসিবাদী শক্তিকে পুনরায় সংগঠিত করার চেষ্টা করছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই ঘটনাটি বাংলাদেশে ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধের আবেগের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আওয়ামী লীগপন্থী ব্যক্তিদের উপস্থিতি এবং শেখ হাসিনার প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান এটিকে আরও সন্দেহজনক করে তুলেছে।
মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা কোনোভাবেই রাজনৈতিক পুনর্বাসনের হাতিয়ার হতে পারে না। ‘মঞ্চ ৭১’-এর মতো প্ল্যাটফর্ম যদি সত্যিই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে, তবে তাদের উচিত হবে শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধেও সরব হওয়া। অন্যথায় এই সংগঠনটি কেবলই ফ্যাসিস্ট শক্তির আরেকটি প্রোপাগান্ডা মেশিনে পরিণত হবে—যা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি।











