ধর্ষণের ঊর্ধ্বগতি!আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগে পুলিশ ও নারী অধিকার সংগঠন
- Update Time : ১১:৪৫:১২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৫
- / ১৩২ Time View

বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতা এবং ধর্ষণের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। নারীর অধিকার সংগঠন ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো বলছে, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এই পরিস্থিতিকে আরও ঘনীভূত করেছে। এমনকি পুলিশও সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে “সংকটপূর্ণ” বলে মন্তব্য করেছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম জানান, ২০২৪ সালের প্রথম ছয় মাসে যত ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে, তা ২০২৩ সালের পুরো বছরের প্রায় সমান। তিনি বলেন, “যখন আইন-শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে, তখন নারীর প্রতি সহিংসতাও বেড়ে যায়। সমাজে নারীদের প্রতি বিদ্বেষমূলক পরিবেশ তৈরির একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা চলছে।”
মহিলা পরিষদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসে ৩৫৪টি ধর্ষণের ঘটনা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে ২০২৩ সালে পুরো বছরে এই সংখ্যা ছিল ৩৬৪। সংগঠনের মতে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি, কারণ সামাজিক লজ্জা, ভয় এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থার কারণে অনেক নারী এখনও মামলা করতে সাহস পান না।
পুলিশের শঙ্কা ও পরিসংখ্যান
পুলিশের নিজস্ব তথ্যও ধর্ষণ ও সহিংসতা বৃদ্ধির এই প্রবণতাকে সমর্থন করে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের প্রথম ছয় মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল প্রায় ৯ হাজার। কিন্তু ২০২৪ সালের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজারের বেশি। যদিও পুলিশ ধর্ষণের নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি, তবে তারা সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে “অত্যন্ত উদ্বেগজনক” বলে উল্লেখ করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এ এইচ এম সাহাদাত হোসাইন বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতি একটি বড় ধরনের সংকটের ইঙ্গিত দেয়। পুলিশ সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে, তবে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা এই কাজকে কঠিন করে তুলছে।”
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সতর্কবার্তা
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর সমন্বয়ক আবু আহমেদ ফাইজুল কবির বলেন, “যে পরিবর্তনের পর আমরা গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন আশাবাদী হয়েছিলাম, বাস্তবে তার প্রতিফলন বিপরীত হয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতা ও সামগ্রিক অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া আমাদের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।”
নারীর নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক পরিবেশ
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম জানান, নারীরা ক্রমশই ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। তিনি অভিযোগ করেন, সাম্প্রদায়িকতা উস্কে দেওয়া এবং নারীবিদ্বেষী বক্তব্য প্রচারের ফলে সামাজিক পরিবেশ আরও বিষাক্ত হয়ে উঠছে। তার মতে, “এটি কেবল আইন-শৃঙ্খলার সংকট নয়, এটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন।”
নারীবাদী কর্মীরা বলছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর, বিশেষ করে গত বছরের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর থেকে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর উত্থান নারীদের জন্য নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। দেশের নারী অধিকারকর্মীদের মতে, এটি একটি সংগঠিত সন্ত্রাসী মনস্তত্ত্ব তৈরি করছে, যেখানে নারীদের সামাজিকভাবে দমিয়ে রাখা হচ্ছে এবং সহিংসতার মাধ্যমে ভয় দেখানো হচ্ছে।
আসন্ন নির্বাচন ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে আগামী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথমবারের মতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আইন-শৃঙ্খলার অবনতিশীল পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক বিভাজন নির্বাচনী পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলছে।
নারী অধিকারকর্মীরা মনে করেন, এই সংকট মোকাবেলায় শুধুমাত্র আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়; সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
বাংলাদেশে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার ক্রমবর্ধমান হার শুধু একটি অপরাধ পরিসংখ্যান নয়, এটি পুরো সমাজের নৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। মানবাধিকার সংগঠন ও নারী অধিকারকর্মীরা জোর দিচ্ছেন যে এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার, সুশীল সমাজ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। তা না হলে সহিংসতার এই প্রবণতা আগামী দিনে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
সূত্র: খালিজ টাইমস











