গাজায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ: অনাহারে আরও ১০ জনের মৃত্যু, শিশুরা মৃত্যুমুখে
- Update Time : ১০:৫৩:০২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৫
- / ১২৩ Time View

গাজা উপত্যকায় দুর্ভিক্ষ দিন দিন চরম আকার ধারণ করছে। ইসরায়েলের দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ, চলমান হামলা এবং মানবিক সহায়তার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে খাদ্য সংকট মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র গত কয়েক দিনে ক্ষুধা ও পুষ্টিহীনতায় আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলমান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজায় ক্ষুধাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১৩ জনে, যাদের মধ্যে ১১৯ জনই শিশু। আন্তর্জাতিক মহল এটিকে “মানবসৃষ্ট ও পরিকল্পিত দুর্ভিক্ষ” হিসেবে বর্ণনা করেছে।
বুধবার (২৭ আগস্ট) জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে (ইউএনএসসি) কর্মকর্তারা গাজার ভয়াবহ পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরেন। জাতিসংঘের উপ-মানবিক প্রধান জয়েস মুসুয়া জানান, গাজার উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে ইতোমধ্যেই দুর্ভিক্ষ নিশ্চিত হয়েছে এবং পরিস্থিতি দ্রুত দক্ষিণাঞ্চলের দেইর এল-বালাহ ও খান ইউনিস পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার মতে, বর্তমানে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ মৃত্যুভয় নিয়ে অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন, আর সেপ্টেম্বরের শেষে এই সংখ্যা ৬ লাখ ৪০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। মুসুয়া স্পষ্টভাবে বলেন, “গাজায় এমন কেউ নেই, যে ক্ষুধার প্রভাব থেকে মুক্ত।”
তিনি আরও জানান, গাজায় পাঁচ বছরের নিচে অন্তত ১ লাখ ৩২ হাজার শিশু তীব্র অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ৪৩ হাজার শিশু দ্রুত চিকিৎসা না পেলে প্রাণ হারাতে পারে। মুসুয়ার ভাষায়, “এটি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা খরার ফল নয়, এটি সম্পূর্ণ যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে সৃষ্ট মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ—যা মৃত্যু, ধ্বংস এবং ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির ভয়াবহ ফলাফল।”
ইসরায়েলের প্রতিবাদ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
গাজার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত ‘ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন’ (IPC) বা দুর্ভিক্ষ পর্যবেক্ষণ সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদনের বিরোধিতা করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক এডেন বার টাল এই প্রতিবেদনকে ‘ত্রুটিপূর্ণ ও অপেশাদার’ বলে অভিহিত করেছেন এবং এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করে না বলে দাবি করেছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ব্যতীত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অন্য ১৪ সদস্য দেশ IPC-এর কাজকে সমর্থন জানিয়ে যৌথ বিবৃতিতে গাজায় দুর্ভিক্ষ বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিবৃতিতে তাৎক্ষণিক, নিঃশর্ত ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতিরও দাবি জানানো হয়।
শিশুদের দুর্দশা: মানবতার জন্য এক কঠিন সতর্কবার্তা
আন্তর্জাতিক মানবিক সংগঠন ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’-এর প্রধান ইঙ্গার আশিং নিরাপত্তা পরিষদে এক আবেগঘন ভাষণে গাজার ভয়াবহ পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “গাজায় দুর্ভিক্ষ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। এটি পরিকল্পিত দুর্ভিক্ষ—মানুষকে ক্ষুধার কাছে জিম্মি করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। শিশুদের পদ্ধতিগতভাবে অনাহারে মৃত্যুর মুখে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। ক্ষুধাকে এখানে সরাসরি যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।”
তিনি উল্লেখ করেন, গাজার ক্লিনিকগুলোতে এখন নীরবতার রাজত্ব, যেখানে হাড়জিরজিরে শিশুদের কণ্ঠস্বরও শোনা যায় না, কারণ তারা কান্না করার শক্তি হারিয়ে ফেলছে। আশিং বলেন, “শিশুদের আঁকায় এখন আর স্কুলে ফেরার স্বপ্ন বা নিরাপদ ভবিষ্যতের ছবি দেখা যায় না, বরং সেখানে ফুটে উঠছে খাবারের আকুতি এবং মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা।”
তিনি একটি শিশুর আঁকার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে লেখা ছিল: “আমি জান্নাতে যেতে চাই, যেখানে আমার মা আছেন। সেখানে ভালোবাসা আছে, খাবার আছে, পানি আছে।”
যুদ্ধ–পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে মার্কিন বৈঠক
এদিকে, গাজার পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার ওয়াশিংটনে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ও সাবেক মধ্যপ্রাচ্য দূত জ্যারেড কুশনারসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আলোচনায় যুদ্ধ-পরবর্তী গাজা পুনর্গঠনের সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। যদিও এই বৈঠকের বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে গাজায় যুদ্ধের ‘সুনির্দিষ্ট সমাপ্তি’ আশা করছেন। তবে বাস্তবে যুদ্ধবিরতির কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনা পরিষ্কার না হলে গাজার পুনর্গঠন কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। ইসরায়েল ইতোমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা দীর্ঘমেয়াদে গাজায় সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখবে।
মানবিক বিপর্যয়ের সীমাহীনতা
গাজার বর্তমান অবস্থা কেবল মানবিক সংকট নয়, এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের জন্য এক গভীর চ্যালেঞ্জ। অবরুদ্ধ এই অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা ধ্বংসপ্রাপ্ত, চিকিৎসা সরঞ্জামের মারাত্মক সংকট চলছে এবং খাদ্য সহায়তা কার্যত বন্ধ। মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই দুর্ভিক্ষ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে এবং হাজার হাজার শিশু ও সাধারণ মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা











