বছরের প্রথম সাত মাসে ধর্ষণ বেড়েছে ৬৮.৪৫ শতাংশ: নারী ও শিশু নির্যাতনে অস্থিরতা বাড়ছে
- Update Time : ০৩:১৭:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৫
- / ২৩৩ Time View

২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে দেশে নারী ও শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদন বলছে, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে ৬৮.৪৫ শতাংশ। একই সময়ে শিশুদের ওপর সহিংসতা বেড়েছে প্রায় ৩৮ শতাংশ। নারীবিদ্বেষী মনোভাব, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বল ভূমিকা এই বৃদ্ধির জন্য দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪৯২ জন নারী ও শিশু। ২০২৪ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ২৯২ জন, অর্থাৎ ধর্ষণের হার ৬৮.৪৯ শতাংশ বেড়েছে।
একই সময়ে শিশুদের প্রতি সহিংসতাও বেড়েছে। ২০২৪ সালের প্রথম সাত মাসে সহিংসতার শিকার হয়েছিল ৪৬৩ শিশু; ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৬৪০ জন, যা ৩৮.২২ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
মহিলা পরিষদের তথ্য
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুসারে, গত বছরের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন ২৫৩ জন নারী ও শিশু। এর মধ্যে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ১০৫ জন, ধর্ষণের পর হত্যার শিকার ১৮ জন, আর ৫ জন আত্মহত্যা করেছিলেন।
২০২৫ সালের একই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪০৫ জন নারী ও শিশু। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১১৭ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৫ জনকে, এবং আত্মহত্যা করেছেন ৫ জন। এছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা করা হয় ৭১ জনকে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) ভয়াবহ তথ্য
মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) আরও বিস্তৃত তথ্য প্রকাশ করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, জানুয়ারি-জুলাই ২০২৫ সময়ে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৫০২ জন নারী ও শিশু।
এর মধ্যে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৩৩ জন,
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ শাইখ ইমতিয়াজ বলেন,
“দেশের পুলিশি ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। জুলাই আন্দোলনের পর পুলিশ বাহিনী বিতর্কিত হয়ে পড়েছে এবং তাদের আগের সক্রিয়তা হারিয়েছে। এর পাশাপাশি নারীর স্বাধীনতা, বাইরে যাওয়া, অধিকার নিয়ে যে নেতিবাচক বয়ান তৈরি হয়েছে, তা ধর্ষকদের মানসিকভাবে উৎসাহিত করছে।”
নারীবিদ্বেষ ও সামাজিক অস্থিরতা
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের অ্যাডভোকেসি ও নেটওয়ার্কিং পরিচালক জনা গোস্বামী বলেন,
“নারীবিরোধী প্রচার বেড়েছে, সামাজিক মনোভাবেও নারীবিদ্বেষ স্পষ্ট। অপরাধীরা এখন শাস্তি না পাওয়ার সংস্কৃতিকে সুযোগ হিসেবে দেখছে। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে নারীর প্রতি সহিংসতা এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।”
বিশ্লেষণ ও প্রেক্ষাপট
নারী নির্যাতন এবং ধর্ষণের ঘটনায় এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধিকে সামাজিক কাঠামোর ভেঙে পড়া, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আইনি প্রক্রিয়ার ধীরগতির সঙ্গে সম্পর্কিত মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে বিলম্বিত হয়, যা অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি করছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশে ধর্ষণের ঘটনায় ৯০ শতাংশের বেশি মামলা বছরের পর বছর ধরে বিচারাধীন থেকে যায়, যা ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন করে তুলেছে।
জাতিসংঘের UN Women-এর ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতার হার অন্যতম বেশি। বিশেষত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের হেনস্তা, গ্রামীণ এলাকায় শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতা, এবং শহরাঞ্চলে গার্হস্থ্য নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনের আলোকে বলা যায়, বাংলাদেশে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার বর্তমান পরিস্থিতি গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসের পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, নারীদের নিরাপত্তা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকারিতা এবং সামাজিক সচেতনতার অভাবের কারণে যৌন সহিংসতার মাত্রা বেড়ে চলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমস্যার সমাধানে শুধুমাত্র আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; বিচারব্যবস্থার সংস্কার, সামাজিক মনোভাব পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
সূত্র: আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ), বণিক বার্তা, UN Women Annual Report 2023।











