খেলাপি ঋণ ও অব্যবস্থাপনায় বন্ধ হচ্ছে ৯ আর্থিক প্রতিষ্ঠান: দায় কার? দায়ীদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
- Update Time : ১২:৩৮:৪৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৫
- / ১৫৮ Time View

বাংলাদেশের আর্থিক খাত দীর্ঘদিন ধরে যে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার শিকার হয়ে আসছে, তার সর্বশেষ পরিণতি দেখা গেল ৯টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (Non-Bank Financial Institutions—NBFI) অবসায়নের ঘোষণায়। আমানতকারীর অর্থ ফেরত দিতে অক্ষমতা, ঋণখেলাপির পাহাড়, মূলধনের ঘাটতি এবং আর্থিক দুর্বলতার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানকে ‘অপরিচালনযোগ্য’ ঘোষণা করে লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এই সিদ্ধান্ত দেশের আর্থিক খাতে বড় ধরনের আলোড়ন তুলেছে। কারণ, একদিকে সরকার ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে, অন্যদিকে এই আর্থিক বিপর্যয়ের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এই ধরনের সংকট আরও বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
অবসায়নের সিদ্ধান্ত ও প্রক্রিয়া
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক জরুরি বৈঠকে এই ৯ প্রতিষ্ঠান বন্ধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তীতে গভর্নরের অনুমোদনের পর রেজল্যুশন বিভাগ দ্রুত অবসায়নের প্রস্তুতি শুরু করে।
প্রতিষ্ঠানগুলো হলো:
১. পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস
২. ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস
৩. আভিভা ফাইন্যান্স
৪. এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট
৫. ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট
৬. বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি)
৭. প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স
৮. জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি
৯. প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড
ফিন্যান্স কোম্পানি আইন ২০২৩-এর ৭(১) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো প্রতিষ্ঠান আমানতকারীর স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত হয়, দায় পরিশোধে অক্ষম থাকে বা মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়, তবে তার লাইসেন্স বাতিল করা যায়। একই আইনের ৭(২) ধারায় ১৫ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার বিধান রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক গত ২২ মে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নোটিশ দিলেও সন্তোষজনক উত্তর না পাওয়ায় অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ঋণখেলাপি ও আর্থিক বিপর্যয়ের চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ হতে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের অধিকাংশই খেলাপি।
- এফএএস ফাইন্যান্সে খেলাপির হার ৯৯.৯৩ শতাংশ।
- ফারইস্ট ফাইন্যান্সে ৯৮ শতাংশ।
- বিআইএফসি–তে ৯৭.৩০ শতাংশ।
- ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৯৬ শতাংশ খেলাপি ঋণ রয়েছে, যার পরিমাণ ৩,৯৭৫ কোটি টাকা।
- পিপলস লিজিংয়ে খেলাপি ঋণের হার ৯৫ শতাংশ, লোকসান ৪,৬২৮ কোটি টাকা।
- আভিভা ফাইন্যান্সে খেলাপি ৮৩ শতাংশ, লোকসান ৩,৮০৩ কোটি টাকা।
- প্রিমিয়ার লিজিংয়ে খেলাপি ৭৫ শতাংশ, লোকসান ৯৪১ কোটি টাকা।
- জিএসপি ফাইন্যান্সে খেলাপি ৫৯ শতাংশ, লোকসান ৩৩৯ কোটি টাকা।
- প্রাইম ফাইন্যান্সে খেলাপি ৭৮ শতাংশ, লোকসান ৩৫১ কোটি টাকা।
দেশে মোট ৩৫টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আছে, এর মধ্যে ২০টিকে সমস্যাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই ২০ প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণ ২৫,৮০৮ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ঋণ ২১,৪৬২ কোটি টাকা, অর্থাৎ ৮৩.১৬ শতাংশ ঋণ খেলাপি।
সরকারের ব্যয় ও আমানতকারীদের সুরক্ষা
এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়াকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসেবে, সমস্যাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের নিট ব্যক্তি আমানতের পরিমাণ প্রায় ৪,৯৭১ কোটি টাকা। অবসায়নের প্রাথমিক ধাপে এই অর্থ ফেরত দেওয়ার জোগান দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
যদিও অবসায়নের সিদ্ধান্ত এসেছে, তবে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেক ঋণ-অনিয়ম ও দুর্নীতির পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা যথাযথ তদারকি করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি দায়ীদের বিরুদ্ধে স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহি না হয়, তাহলে এই সংকট থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ হারাবে দেশ। বহু প্রভাবশালী ঋণখেলাপি এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সম্পদ জব্দ ও আইনের আওতায় আনা ছাড়া ভবিষ্যতে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরবে না।
আর্থিক খাতের সংকটের বড় ছবি
বাংলাদেশের আর্থিক খাত দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য অর্থায়নের বিকল্প মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু গত এক দশকে শিথিল নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতাশালী ঋণগ্রহীতাদের প্রভাব এবং দুর্নীতিগ্রস্ত পরিচালনা পর্ষদের কারণে এই খাত ধ্বংসের মুখে পড়ে।
করণীয় ও ভবিষ্যতের পথনির্দেশ
১. কঠোর তদন্ত ও শাস্তি: দায়ীদের শনাক্ত করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
2. নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সংস্কার: বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ক্ষমতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে।
3. খেলাপি ঋণ উদ্ধার: সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
4. আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংস্কার: ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং নিরপেক্ষ নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
5. আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা: দ্রুত অর্থ ফেরতের মাধ্যমে জনগণের আস্থা পুনর্গঠন অপরিহার্য
এই আর্থিক সংকট শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার চিত্র নয়; বরং পুরো আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও অনিয়মের প্রতিচ্ছবি। এখন সময় এসেছে দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করে এই খাতকে পুনর্গঠন করার। তা না হলে দেশের আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।












