সময়: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাওলানা ভাসানী সেতু উদ্বোধনের পরদিনই বৈদ্যুতিক ক্যাবল চুরি: ৯২৫ কোটি টাকার সেতু অন্ধকারে

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১১:১৬:৫৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২২ অগাস্ট ২০২৫
  • / ১৪০ Time View

1561af37515f22b814453563cd3e7651 68a7f8981a1ec

1561af37515f22b814453563cd3e7651 68a7f8981a1ec

গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সম্প্রতি চালু হলো তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত দ্বিতীয় সেতু, যার সরকারি নামকরণ হয়েছে মাওলানা ভাসানী সেতু’। ৯২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ মহাসেতুটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছিল। কিন্তু উদ্বোধনের মাত্র একদিনের মাথায় ঘটল চাঞ্চল্যকর এক ঘটনা—সেতুটি থেকে প্রায় ৩০০ মিটার বৈদ্যুতিক ক্যাবল চুরি হয়ে গেছে। ফলে সন্ধ্যার পর থেকেই সেতুটি অন্ধকারে ডুবে থাকে, যা স্থানীয়দের হতাশা ও ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

উদ্বোধন ও চুরির ঘটনা

বুধবার (২০ আগস্ট) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া আনুষ্ঠানিকভাবে সেতুটি উদ্বোধন করেন। এর পরদিন বৃহস্পতিবার বিকেলে ল্যাম্পপোস্টে বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করার চেষ্টা করলে দেখা যায় বাতিগুলো জ্বলছে না। অনুসন্ধান করে জানা যায়, সেতুর হরিপুর পয়েন্ট থেকে নেওয়া মূল বৈদ্যুতিক তার কেটে নিয়ে গেছে সংঘবদ্ধ চোরচক্র। রাত সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান মিলন বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, “ক্যাবল চুরি হওয়ার কারণে বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করা সম্ভব হয়নি এবং সেতুটি আপাতত অন্ধকারে ডুবে আছে।”

স্থানীয়দের ক্ষোভ ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া

উদ্বোধনের পরদিনই এ ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটায় স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হতাশা প্রকাশ করে লিখেছেন—“৯২৫ কোটি টাকার সেতু নির্মাণ হলো, কিন্তু আমরা কয়েকশ’ মিটার ক্যাবলের লোভ সামলাতে পারলাম না।” আবার কেউ মন্তব্য করেছেন—“আজ ক্যাবল, কাল হয়তো সেতুর রডও খুলে নিয়ে যাবে!” এ ধরনের মন্তব্যে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও হতাশার প্রতিফলন স্পষ্ট হয়েছে।

প্রকল্পের আর্থিক ও কারিগরি তথ্য

এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, মাওলানা ভাসানী সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯২৫

কোটি টাকা। বাংলাদেশ সরকার (জিওবি), সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (এসএফডি) এবং ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ওফিড)-এর যৌথ অর্থায়নে সেতুটি নির্মিত হয়। ১৪৯০ মিটার দীর্ঘ ও ৯ দশমিক ৬ মিটার প্রস্থের এই সেতুতে দুটি লেন রয়েছে এবং মোট স্প্যান সংখ্যা ৩১টি। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ১৩৩ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়, যেখানে সংযোগ সড়ক ও নদী শাসনের কাজও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

এত বড় একটি অবকাঠামো প্রকল্পে উদ্বোধনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বৈদ্যুতিক ক্যাবল চুরির ঘটনা দেশের অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রায় হাজার কোটি টাকার সেতু যদি এভাবে অনিরাপদ থেকে যায়, তবে ভবিষ্যতে অন্যান্য অংশও হুমকির মুখে পড়তে পারে। স্থানীয়রা দ্রুত নজরদারি, সিসিটিভি স্থাপন এবং টহল জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।

মাওলানা ভাসানী সেতু শুধু উত্তরাঞ্চলের মানুষের স্বপ্নের প্রতীক নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের একটি মাইলফলক। কিন্তু উদ্বোধনের একদিনের মধ্যেই এ ধরনের চুরির ঘটনা শুধু নিরাপত্তাহীনতাই নয়, বরং সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের দিকেও ইঙ্গিত করে। প্রশ্ন উঠেছে—যেখানে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে একটি সেতু নির্মিত হয়, সেখানে সামান্য ক্যাবলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেল না কেন? স্থানীয়দের আশা, দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করে

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

মাওলানা ভাসানী সেতু উদ্বোধনের পরদিনই বৈদ্যুতিক ক্যাবল চুরি: ৯২৫ কোটি টাকার সেতু অন্ধকারে

Update Time : ১১:১৬:৫৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২২ অগাস্ট ২০২৫

1561af37515f22b814453563cd3e7651 68a7f8981a1ec

গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সম্প্রতি চালু হলো তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত দ্বিতীয় সেতু, যার সরকারি নামকরণ হয়েছে মাওলানা ভাসানী সেতু’। ৯২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ মহাসেতুটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছিল। কিন্তু উদ্বোধনের মাত্র একদিনের মাথায় ঘটল চাঞ্চল্যকর এক ঘটনা—সেতুটি থেকে প্রায় ৩০০ মিটার বৈদ্যুতিক ক্যাবল চুরি হয়ে গেছে। ফলে সন্ধ্যার পর থেকেই সেতুটি অন্ধকারে ডুবে থাকে, যা স্থানীয়দের হতাশা ও ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

উদ্বোধন ও চুরির ঘটনা

বুধবার (২০ আগস্ট) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া আনুষ্ঠানিকভাবে সেতুটি উদ্বোধন করেন। এর পরদিন বৃহস্পতিবার বিকেলে ল্যাম্পপোস্টে বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করার চেষ্টা করলে দেখা যায় বাতিগুলো জ্বলছে না। অনুসন্ধান করে জানা যায়, সেতুর হরিপুর পয়েন্ট থেকে নেওয়া মূল বৈদ্যুতিক তার কেটে নিয়ে গেছে সংঘবদ্ধ চোরচক্র। রাত সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান মিলন বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, “ক্যাবল চুরি হওয়ার কারণে বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করা সম্ভব হয়নি এবং সেতুটি আপাতত অন্ধকারে ডুবে আছে।”

স্থানীয়দের ক্ষোভ ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া

উদ্বোধনের পরদিনই এ ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটায় স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হতাশা প্রকাশ করে লিখেছেন—“৯২৫ কোটি টাকার সেতু নির্মাণ হলো, কিন্তু আমরা কয়েকশ’ মিটার ক্যাবলের লোভ সামলাতে পারলাম না।” আবার কেউ মন্তব্য করেছেন—“আজ ক্যাবল, কাল হয়তো সেতুর রডও খুলে নিয়ে যাবে!” এ ধরনের মন্তব্যে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও হতাশার প্রতিফলন স্পষ্ট হয়েছে।

প্রকল্পের আর্থিক ও কারিগরি তথ্য

এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, মাওলানা ভাসানী সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯২৫

কোটি টাকা। বাংলাদেশ সরকার (জিওবি), সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (এসএফডি) এবং ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ওফিড)-এর যৌথ অর্থায়নে সেতুটি নির্মিত হয়। ১৪৯০ মিটার দীর্ঘ ও ৯ দশমিক ৬ মিটার প্রস্থের এই সেতুতে দুটি লেন রয়েছে এবং মোট স্প্যান সংখ্যা ৩১টি। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ১৩৩ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়, যেখানে সংযোগ সড়ক ও নদী শাসনের কাজও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

এত বড় একটি অবকাঠামো প্রকল্পে উদ্বোধনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বৈদ্যুতিক ক্যাবল চুরির ঘটনা দেশের অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রায় হাজার কোটি টাকার সেতু যদি এভাবে অনিরাপদ থেকে যায়, তবে ভবিষ্যতে অন্যান্য অংশও হুমকির মুখে পড়তে পারে। স্থানীয়রা দ্রুত নজরদারি, সিসিটিভি স্থাপন এবং টহল জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।

মাওলানা ভাসানী সেতু শুধু উত্তরাঞ্চলের মানুষের স্বপ্নের প্রতীক নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের একটি মাইলফলক। কিন্তু উদ্বোধনের একদিনের মধ্যেই এ ধরনের চুরির ঘটনা শুধু নিরাপত্তাহীনতাই নয়, বরং সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের দিকেও ইঙ্গিত করে। প্রশ্ন উঠেছে—যেখানে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে একটি সেতু নির্মিত হয়, সেখানে সামান্য ক্যাবলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেল না কেন? স্থানীয়দের আশা, দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করে