সময়: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাজায় মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ: জাতিসংঘ ক্ষুধা পর্যবেক্ষক সংস্থার ভয়াবহ স্বীকৃতি

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৭:৪২:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২২ অগাস্ট ২০২৫
  • / ১৫৬ Time View

220c852951edc7d658ed1abdc36d2579 68a84e74071df

220c852951edc7d658ed1abdc36d2579 68a84e74071df

গাজা উপত্যকার ভয়াবহ মানবিক সংকট এক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। জাতিসংঘ-সমর্থিত বৈশ্বিক ক্ষুধা পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (IPC) প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে যে, গাজা শহর এবং এর আশেপাশের এলাকা এখন দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত। এটি কেবল আরেকটি সংকট নয়, বরং বহু দশকের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুতর মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষের একটি উদাহরণ।

ক্ষুধার ভয়াবহ চিত্র

বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা পরিমাপের ক্ষেত্রে সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবিক সংগঠনগুলো যে মানদণ্ড অনুসরণ করে থাকে, সেই আইপিসি তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে গাজাকে খাদ্য সংকটের সর্বোচ্চ স্তর—“পঞ্চম পর্যায়”—এ উন্নীত করেছে। এর অর্থ হলো, গাজায় এখন খাদ্য সংকট সর্বাধিক গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ২২ মাসের সংঘাতের পর অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ সরাসরি দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি, যেখানে অনাহার, মারাত্মক অপুষ্টি এবং মৃত্যুহারের ভয়াবহ বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আরও ১১ লাখ মানুষ “জরুরি পর্যায়ে” (চতুর্থ স্তর) রয়েছে এবং অন্তত ৩ লাখ ৯৬ হাজার মানুষ তৃতীয় স্তরের সংকটে রয়েছে।

শিশু নারীদের করুণ বাস্তবতা

আইপিসির সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন নাগাদ অন্তত ১ লাখ ৩২ হাজার পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু তীব্র অপুষ্টির কারণে মৃত্যুবরণ করতে পারে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গত বছরের মে মাসে প্রকাশিত পূর্বাভাসের তুলনায় এই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। একই সঙ্গে গাজায় অন্তত ৪১ হাজার গুরুতর রোগী রয়েছেন, যাদের মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। আর গর্ভবতী ও বুকের দুধ খাওয়ানো অন্তত ৫৫ হাজার ৫০০ নারী জরুরি পুষ্টি সহায়তা ছাড়া টিকে থাকতে পারবেন না। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এ অবস্থা কেবল একটি মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং এটি ভবিষ্যতের একটি হারিয়ে যাওয়া প্রজন্মের আশঙ্কা তৈরি করছে।

মানবসৃষ্ট বিপর্যয় জাতিসংঘের কঠোর ভাষ্য

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস পরিস্থিতিকে অভিহিত করেছেন “মানবসৃষ্ট বিপর্যয়” হিসেবে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “এটি কেবল একটি দুর্ভিক্ষ নয়, এটি মানবতার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।” তাঁর মতে, দুর্ভিক্ষের অর্থ কেবল খাদ্য সংকট নয়; বরং মানুষের বেঁচে থাকার জন্য জরুরি ব্যবস্থাগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙে ফেলা। তিনি বলেন, “মানুষ অনাহারে আছে, শিশুরা মারা যাচ্ছে, অথচ যাদের দায়িত্ব ছিল, তারা ব্যর্থ হচ্ছে।” গুতেরেস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আর কোনো অজুহাত নয়, আগামীকাল নয়—কাজ করার সময় এখনই।”

গণহত্যা, অব্যাহত হামলা আন্তর্জাতিক আইন

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় এখন পর্যন্ত ৬২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন দেড় লাখের বেশি। অনেকে এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো অভিযোগ করছে, ইসরায়েলি সেনারা বারবার খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রের কাছে জড়ো হওয়া সাধারণ ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে, যার ফলে শত শত মানুষ নিহত হচ্ছে।

এদিকে, চলতি বছরের শুরুতে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের পর ইসরায়েল জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোকে এড়িয়ে গিয়ে “গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশন” নামের একটি পৃথক সাহায্য উদ্যোগ চালু করেছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রও সমর্থন দিয়েছে। তবে বিশ্বব্যাপী ত্রাণ সংগঠনগুলো এটিকে প্রত্যাখ্যান করেছে, কারণ এটি প্রকৃত মানবিক সহায়তার পরিবর্তে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত বছরের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) গাজার যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলাও শুনানিরত রেখেছে।

গাজায় চলমান দুর্ভিক্ষ ও মানবিক বিপর্যয় কেবল একটি আঞ্চলিক সংকট নয়; এটি মানবতার সম্মিলিত পরীক্ষার মুহূর্ত। লক্ষাধিক শিশু, নারী ও বয়স্ক মানুষ খাদ্যের অভাবে মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে, অথচ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখনো কার্যকর সমাধান দিতে ব্যর্থ। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক স্বীকৃতি এবং মহাসচিবের সতর্কবাণী বিশ্বকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এটি কেবল একটি মানবিক সংকট নয়—এটি ইতিহাসের কাছে আমাদের নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখনই; দেরি মানেই আরও হাজারো প্রাণের অকাল মৃত্যু।

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

গাজায় মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ: জাতিসংঘ ক্ষুধা পর্যবেক্ষক সংস্থার ভয়াবহ স্বীকৃতি

Update Time : ০৭:৪২:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২২ অগাস্ট ২০২৫

220c852951edc7d658ed1abdc36d2579 68a84e74071df

গাজা উপত্যকার ভয়াবহ মানবিক সংকট এক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। জাতিসংঘ-সমর্থিত বৈশ্বিক ক্ষুধা পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (IPC) প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে যে, গাজা শহর এবং এর আশেপাশের এলাকা এখন দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত। এটি কেবল আরেকটি সংকট নয়, বরং বহু দশকের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুতর মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষের একটি উদাহরণ।

ক্ষুধার ভয়াবহ চিত্র

বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা পরিমাপের ক্ষেত্রে সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবিক সংগঠনগুলো যে মানদণ্ড অনুসরণ করে থাকে, সেই আইপিসি তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে গাজাকে খাদ্য সংকটের সর্বোচ্চ স্তর—“পঞ্চম পর্যায়”—এ উন্নীত করেছে। এর অর্থ হলো, গাজায় এখন খাদ্য সংকট সর্বাধিক গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ২২ মাসের সংঘাতের পর অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ সরাসরি দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি, যেখানে অনাহার, মারাত্মক অপুষ্টি এবং মৃত্যুহারের ভয়াবহ বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আরও ১১ লাখ মানুষ “জরুরি পর্যায়ে” (চতুর্থ স্তর) রয়েছে এবং অন্তত ৩ লাখ ৯৬ হাজার মানুষ তৃতীয় স্তরের সংকটে রয়েছে।

শিশু নারীদের করুণ বাস্তবতা

আইপিসির সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন নাগাদ অন্তত ১ লাখ ৩২ হাজার পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু তীব্র অপুষ্টির কারণে মৃত্যুবরণ করতে পারে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গত বছরের মে মাসে প্রকাশিত পূর্বাভাসের তুলনায় এই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। একই সঙ্গে গাজায় অন্তত ৪১ হাজার গুরুতর রোগী রয়েছেন, যাদের মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। আর গর্ভবতী ও বুকের দুধ খাওয়ানো অন্তত ৫৫ হাজার ৫০০ নারী জরুরি পুষ্টি সহায়তা ছাড়া টিকে থাকতে পারবেন না। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এ অবস্থা কেবল একটি মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং এটি ভবিষ্যতের একটি হারিয়ে যাওয়া প্রজন্মের আশঙ্কা তৈরি করছে।

মানবসৃষ্ট বিপর্যয় জাতিসংঘের কঠোর ভাষ্য

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস পরিস্থিতিকে অভিহিত করেছেন “মানবসৃষ্ট বিপর্যয়” হিসেবে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “এটি কেবল একটি দুর্ভিক্ষ নয়, এটি মানবতার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।” তাঁর মতে, দুর্ভিক্ষের অর্থ কেবল খাদ্য সংকট নয়; বরং মানুষের বেঁচে থাকার জন্য জরুরি ব্যবস্থাগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙে ফেলা। তিনি বলেন, “মানুষ অনাহারে আছে, শিশুরা মারা যাচ্ছে, অথচ যাদের দায়িত্ব ছিল, তারা ব্যর্থ হচ্ছে।” গুতেরেস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আর কোনো অজুহাত নয়, আগামীকাল নয়—কাজ করার সময় এখনই।”

গণহত্যা, অব্যাহত হামলা আন্তর্জাতিক আইন

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় এখন পর্যন্ত ৬২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন দেড় লাখের বেশি। অনেকে এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো অভিযোগ করছে, ইসরায়েলি সেনারা বারবার খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রের কাছে জড়ো হওয়া সাধারণ ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে, যার ফলে শত শত মানুষ নিহত হচ্ছে।

এদিকে, চলতি বছরের শুরুতে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের পর ইসরায়েল জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোকে এড়িয়ে গিয়ে “গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশন” নামের একটি পৃথক সাহায্য উদ্যোগ চালু করেছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রও সমর্থন দিয়েছে। তবে বিশ্বব্যাপী ত্রাণ সংগঠনগুলো এটিকে প্রত্যাখ্যান করেছে, কারণ এটি প্রকৃত মানবিক সহায়তার পরিবর্তে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত বছরের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) গাজার যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলাও শুনানিরত রেখেছে।

গাজায় চলমান দুর্ভিক্ষ ও মানবিক বিপর্যয় কেবল একটি আঞ্চলিক সংকট নয়; এটি মানবতার সম্মিলিত পরীক্ষার মুহূর্ত। লক্ষাধিক শিশু, নারী ও বয়স্ক মানুষ খাদ্যের অভাবে মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে, অথচ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখনো কার্যকর সমাধান দিতে ব্যর্থ। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক স্বীকৃতি এবং মহাসচিবের সতর্কবাণী বিশ্বকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এটি কেবল একটি মানবিক সংকট নয়—এটি ইতিহাসের কাছে আমাদের নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখনই; দেরি মানেই আরও হাজারো প্রাণের অকাল মৃত্যু।