পদ্ধতিগত দায়মুক্তির আড়ালে চাপা পড়ছে যৌন সহিংসতা: ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের শিকার নারী সদস্যরা
- Update Time : ০৩:৩৫:১০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ অগাস্ট ২০২৫
- / ৩৯৮ Time View

ভারতীয় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে যৌন হয়রানি ও যৌন সহিংসতার দীর্ঘদিনের একটি উদ্বেগজনক চিত্র আবারও সামনে এসেছে। বিভিন্ন সময়ে নারী সেনা কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কাশ্মীর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাধারণ নারী পর্যন্ত অগণিত ভুক্তভোগী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, অভ্যন্তরীণ তদন্ত এবং প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতার কারণে অধিকাংশ ঘটনা ধামাচাপা পড়ে গেছে।
কর্নেল অমিত কুমারের অভিযোগ: ক্ষমতার অপব্যবহারের নগ্ন উদাহরণ
সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অমিত কুমার প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, তার স্ত্রীকে ওড়িশার পারিবারিক ওয়ার্ড থেকে আনার পর কয়েকজন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা তাকে ধর্ষণ করেন। ভুক্তভোগীর জবানবন্দি, ভিডিও প্রমাণ এবং তিনজন ব্রিগেডিয়ার ও একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেলের নাম উল্লেখ করে এফআইআর দায়ের হওয়া সত্ত্বেও, সেনাবাহিনী কর্তৃক গঠিত অভ্যন্তরীণ তদন্ত অভিযুক্তদের দোষমুক্ত ঘোষণা করে।
কুমার সরাসরি অভিযোগ করেছেন, সেনা নেতৃত্ব ও পুলিশের মধ্যে একধরনের যোগসাজশ রয়েছে—যেখানে অপরাধীদের রক্ষা করা হয় আর ভুক্তভোগীদের ভয় দেখিয়ে চুপ করানো হয়।
পূর্ববর্তী ঘটনা: ইতিহাস জুড়ে একই ধারা
এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নয়। ২০১৫ সালে রাজস্থানে সেনাবাহিনীর সিগন্যাল কর্পসের এক তরুণী কর্মকর্তা তার কমান্ডিং অফিসারের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ আনেন। অভিযোগটি ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করা হয়, ফলে তার মানসিক অবস্থা চরমভাবে ভেঙে পড়ে। শেষ পর্যন্ত তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর কাছে সরাসরি আবেদন করতে বাধ্য হন।
এরও আগে, ২০০৮ সালে আর্মি সাপ্লাই কর্পসের ক্যাপ্টেন পুনম কৌর অভিযোগ করেছিলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাকে মানসিক ও যৌনভাবে হয়রানি করেছেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সেনা আদালত পরে তাকে ‘মিথ্যা অভিযোগকারী’ আখ্যা দিয়ে দোষী সাব্যস্ত করে। এই ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা ছড়ায় এবং এটিকে “ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করে দায়মুক্তির সংস্কৃতি”র প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়।
কাশ্মীর: যৌন সহিংসতার কালো অধ্যায়
কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে সংঘটিত যৌন সহিংসতার অভিযোগ সবচেয়ে গুরুতর। ১৯৯১ সালে কুপওয়ারা জেলার কুনান ও পোশপোরা গ্রামে রাতের তল্লাশি অভিযানে সেনারা একসাথে কয়েক ডজন নারীকে ধর্ষণ করে। সরকারি এফআইআরে ২৩ জন নারীর নাম অন্তর্ভুক্ত হলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলির মতে, প্রকৃত ভুক্তভোগীর সংখ্যা ১০০-এর কাছাকাছি। আন্তর্জাতিক মহলের নিন্দা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত এই ঘটনার বিচার হয়নি।
শুধু কাশ্মীর নয়, ১৯৯০-এর দশকের গোড়া থেকেই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও একই ধরণের যৌন সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। বহু ক্ষেত্রে সেনা অভিযানের অজুহাতে নারীরা হয়রানি ও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
‘শূন্য সহনশীলতা’র দাবির বিপরীতে বাস্তবতা
ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সেনা নেতৃত্ব দাবি করে আসছে যে যৌন হয়রানি ও সহিংসতার ক্ষেত্রে তাদের নীতি হলো ‘শূন্য সহনশীলতা’। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ অভিযোগ হয় বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, নয়তো অভ্যন্তরীণ তদন্তে অভিযুক্ত অফিসাররা খালাস পেয়ে যান। এতে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন এবং সেনাবাহিনীর ভেতরে ভয় ও নীরবতার সংস্কৃতি আরও দৃঢ় হয়।
মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কা
পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, কর্নেল অমিত কুমারের প্রকাশ্য অভিযোগ কোনো ব্যতিক্রম নয় বরং দীর্ঘ ইতিহাসের ধারাবাহিকতা। এটি প্রমাণ করে, ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভেতরে যৌন সহিংসতা একটি কাঠামোগত সমস্যা—যা ব্যক্তিগত অপরাধের সীমা ছাড়িয়ে প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তির সঙ্গে যুক্ত।
মানবাধিকার সংস্থাগুলির ভাষ্য, এই পরিস্থিতি শুধু নারী সেনা কর্মকর্তাদের নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং কাশ্মীর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সাধারণ মানুষের মৌলিক মানবাধিকারের উপরও সরাসরি আঘাত হানছে।
সূত্র: কেএমসি











