সময়: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘আপত্তিকর’ ভিডিও কেলেঙ্কারি: বাধ্যতামূলক ছুটিতে বিএফআইইউ প্রধান শাহীনুল ইসলাম

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৩:০৩:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ অগাস্ট ২০২৫
  • / ৩৬০ Time View

5c615d22d3e559c16c685bd535fcf456 68a53cc78d0dc

5c615d22d3e559c16c685bd535fcf456 68a53cc78d0dc
 

বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান এএফএম শাহীনুল ইসলামকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার একাধিক ‘আপত্তিকর’ ভিডিও ভাইরাল হওয়ার ঘটনায় মঙ্গলবার (১৯ আগস্ট) গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এ সিদ্ধান্ত নেন। তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ এক ডেপুটি গভর্নরের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সহায়তায় থাকবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। দায়িত্বে থাকা অবস্থায় শাহীনুল ইসলামের কর্মকাণ্ড ও ভিডিওগুলোকে ঘিরে উদ্ভূত বিতর্কের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ভিডিও কেলেঙ্কারির সূত্রপাত

সোমবার রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শাহীনুল ইসলামের একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখা যায়। যদিও তিনি ভিডিওগুলোকে ভুয়া দাবি করেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক ফ্যাক্টচেকে সেগুলো সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। এর পরদিন থেকেই তিনি অফিসে আসেননি।

ঘটনার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা গভর্নরের কাছে লিখিত স্মারকলিপি জমা দেন। এতে বলা হয়, ভিডিওগুলো শুধু রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেনি, বরং বিএফআইইউ প্রধান হিসেবে শাহীনুল ইসলামের যোগ্যতা ও সততা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

বিতর্কিত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

ভিডিও কেলেঙ্কারির বাইরেও শাহীনুল ইসলামের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিতর্কিত পরিবহন ব্যবসায়ী খন্দকার এনায়েত উল্লাহর ফ্রিজ করা ব্যাংক হিসাব থেকে অবৈধভাবে ১৯ কোটি টাকা উত্তোলনের অনুমতি দেন তিনি। এই পদক্ষেপকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত ও স্বার্থান্বেষী আচরণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তারা। তাদের মতে, এ ধরনের কাজ প্রমাণ করে তিনি বিএফআইইউয়ের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য নন।

শাহীনুল ইসলামের বক্তব্য

সব অভিযোগ অস্বীকার করে শাহীনুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেছেন, “আমার মতো একজন ব্যক্তি কি এমন কাজে জড়াতে পারে? এটা সম্পূর্ণ ভুয়া, আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। শুরু থেকেই একটি চক্র আমাকে টার্গেট করেছে।”

style="text-align: justify;">নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘিরে বিতর্ক

বিএফআইইউর বর্তমান নেতৃত্বের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গত বছরের ৮ আগস্ট তৎকালীন প্রধান মাসুদ বিশ্বাস আন্দোলনের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার পর পদটি শূন্য হয়। এরপর ৩ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। ২৯ জন আবেদনকারীর মধ্যে ১০ জন মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেন। প্রাথমিকভাবে যাদের নাম অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়— একেএম এহসান, রফিকুল ইসলাম ও নজরুল ইসলাম— তাদের মধ্যে শাহীনুল ইসলামের নাম ছিল না।

সরকার পতনের পর ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবে একেএম এহসান দায়িত্ব নেন এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত শুরু করেন, যার মধ্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার ও কয়েকটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গ্রুপের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের অনুসন্ধান ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দাবি, একটি প্রভাবশালী মহল তাকে স্থায়ী প্রধান হিসেবে নিয়োগে বাধা দেয় এবং হঠাৎ করেই শাহীনুল ইসলামকে ওই পদে বসানো হয়।

প্রশ্নবিদ্ধ নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা

এ ঘটনার পর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। কর্মকর্তাদের একাংশের দাবি, বিএফআইইউর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার নেতৃত্বে বিতর্কিত ব্যক্তি থাকলে আন্তর্জাতিক আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

শাহীনুল ইসলামের বাধ্যতামূলক ছুটি কার্যকর হওয়ায় এখন সংস্থাটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তদন্তের ফলাফলই নির্ধারণ করবে তিনি আবার দায়িত্বে ফিরবেন, নাকি নতুন কাউকে স্থায়ী প্রধান করা হবে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

‘আপত্তিকর’ ভিডিও কেলেঙ্কারি: বাধ্যতামূলক ছুটিতে বিএফআইইউ প্রধান শাহীনুল ইসলাম

Update Time : ০৩:০৩:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ অগাস্ট ২০২৫
5c615d22d3e559c16c685bd535fcf456 68a53cc78d0dc
 

বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান এএফএম শাহীনুল ইসলামকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার একাধিক ‘আপত্তিকর’ ভিডিও ভাইরাল হওয়ার ঘটনায় মঙ্গলবার (১৯ আগস্ট) গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এ সিদ্ধান্ত নেন। তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ এক ডেপুটি গভর্নরের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সহায়তায় থাকবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। দায়িত্বে থাকা অবস্থায় শাহীনুল ইসলামের কর্মকাণ্ড ও ভিডিওগুলোকে ঘিরে উদ্ভূত বিতর্কের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ভিডিও কেলেঙ্কারির সূত্রপাত

সোমবার রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শাহীনুল ইসলামের একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখা যায়। যদিও তিনি ভিডিওগুলোকে ভুয়া দাবি করেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক ফ্যাক্টচেকে সেগুলো সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। এর পরদিন থেকেই তিনি অফিসে আসেননি।

ঘটনার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা গভর্নরের কাছে লিখিত স্মারকলিপি জমা দেন। এতে বলা হয়, ভিডিওগুলো শুধু রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেনি, বরং বিএফআইইউ প্রধান হিসেবে শাহীনুল ইসলামের যোগ্যতা ও সততা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

বিতর্কিত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

ভিডিও কেলেঙ্কারির বাইরেও শাহীনুল ইসলামের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিতর্কিত পরিবহন ব্যবসায়ী খন্দকার এনায়েত উল্লাহর ফ্রিজ করা ব্যাংক হিসাব থেকে অবৈধভাবে ১৯ কোটি টাকা উত্তোলনের অনুমতি দেন তিনি। এই পদক্ষেপকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত ও স্বার্থান্বেষী আচরণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তারা। তাদের মতে, এ ধরনের কাজ প্রমাণ করে তিনি বিএফআইইউয়ের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য নন।

শাহীনুল ইসলামের বক্তব্য

সব অভিযোগ অস্বীকার করে শাহীনুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেছেন, “আমার মতো একজন ব্যক্তি কি এমন কাজে জড়াতে পারে? এটা সম্পূর্ণ ভুয়া, আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। শুরু থেকেই একটি চক্র আমাকে টার্গেট করেছে।”

style="text-align: justify;">নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘিরে বিতর্ক

বিএফআইইউর বর্তমান নেতৃত্বের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গত বছরের ৮ আগস্ট তৎকালীন প্রধান মাসুদ বিশ্বাস আন্দোলনের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার পর পদটি শূন্য হয়। এরপর ৩ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। ২৯ জন আবেদনকারীর মধ্যে ১০ জন মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেন। প্রাথমিকভাবে যাদের নাম অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়— একেএম এহসান, রফিকুল ইসলাম ও নজরুল ইসলাম— তাদের মধ্যে শাহীনুল ইসলামের নাম ছিল না।

সরকার পতনের পর ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবে একেএম এহসান দায়িত্ব নেন এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত শুরু করেন, যার মধ্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার ও কয়েকটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গ্রুপের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের অনুসন্ধান ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দাবি, একটি প্রভাবশালী মহল তাকে স্থায়ী প্রধান হিসেবে নিয়োগে বাধা দেয় এবং হঠাৎ করেই শাহীনুল ইসলামকে ওই পদে বসানো হয়।

প্রশ্নবিদ্ধ নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা

এ ঘটনার পর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। কর্মকর্তাদের একাংশের দাবি, বিএফআইইউর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার নেতৃত্বে বিতর্কিত ব্যক্তি থাকলে আন্তর্জাতিক আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

শাহীনুল ইসলামের বাধ্যতামূলক ছুটি কার্যকর হওয়ায় এখন সংস্থাটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তদন্তের ফলাফলই নির্ধারণ করবে তিনি আবার দায়িত্বে ফিরবেন, নাকি নতুন কাউকে স্থায়ী প্রধান করা হবে।