কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক তিন গভর্নর ও ছয় ডেপুটি গভর্নরের ব্যাংক হিসাব তলব,দুর্নীতি ও অনিয়ম তদন্তে বিএফআইইউর পদক্ষেপ
- Update Time : ০৬:১১:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৫
- / ৩০৩ Time View

বাংলাদেশের আর্থিক খাতের অস্থিরতা, ব্যাংক লুটপাট ও অর্থপাচারের অভিযোগে আলোচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক তিন গভর্নর ও ছয় ডেপুটি গভর্নরের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আনুষ্ঠানিক আবেদনের প্রেক্ষিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে এটিই প্রথমবার, যখন এত উচ্চপর্যায়ের সাবেক কর্মকর্তাদের একসঙ্গে জবাবদিহির মুখে পড়তে হচ্ছে।
অভিযুক্ত তিন সাবেক গভর্নর
তালিকায় রয়েছেন সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান, ফজলে কবির এবং আব্দুর রউফ তালুকদার—যারা আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সময়কালেই বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সার্বিক ব্যাংকিং খাত নজিরবিহীন অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের শিকার হয়।
ড. আতিউর রহমানের আমলে নজিরবিহীন কয়েকটি কেলেঙ্কারি ঘটে—সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক জালিয়াতি, বেসিক ব্যাংকে হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি, এবং সবচেয়ে বড় ঘটনা ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা। সমালোচকরা অভিযোগ করেন, এই চুরির ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার নেপথ্যে আতিউর রহমানের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল, যা নিয়ে দেশ-বিদেশে তীব্র বিতর্কের পর তিনি পদত্যাগ করেন।
তার পর দায়িত্ব নেন সাবেক অর্থসচিব ফজলে কবির। তার আমলে ২০১৭ সালের শুরুতে ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো বিতর্কিতভাবে বদলে যায়, যা লাভবান করে চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপকে। গভীর রাতে এবং বাসায় বসে ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তনের অনুমোদন দেওয়ার ঘটনায় ফজলে কবির তীব্র সমালোচিত হন। তার সময়ে ঋণনীতিতে এমন শিথিলতা আনা হয়, যাতে খেলাপি ঋণ গোপন করা, নামমাত্র টাকা দিয়ে খেলাপি থেকে মুক্ত থাকা এবং ৯% সুদের সীমা বেঁধে দেওয়ার মতো নীতিমালা চালু হয়। এসব সুবিধা ব্যবহার করে অনেক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ঋণ নিয়ে টাকা বিদেশে পাচার করেন।
এরপর দায়িত্ব নেন আরেক সাবেক অর্থসচিব আব্দুর রউফ তালুকদার। মাত্র দুই বছরের মাথায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে ঋণখেলাপিদের ব্যাপক ছাড় দেওয়ার, বেনামে ঋণ অনুমোদনের এবং এস আলম গ্রুপের ব্যাংকগুলোকে টাকা ছাপিয়ে দেওয়ার অনুমতি দেওয়ার। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান।
ছয় সাবেক ডেপুটি গভর্নরের ভূমিকা ও অভিযোগ
তালিকায় থাকা ছয় সাবেক ডেপুটি গভর্নর হলেন—সিতাংশু কুমার সুর চৌধুরী (এসকে সুর), মাসুদ বিশ্বাস, এসএম মনিরুজ্জামান, আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান, কাজী ছাইদুর রহমান এবং আবু ফরাহ মোহাম্মদ নাছের।
এসকে সুর ও মাসুদ বিশ্বাস বর্তমানে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় কারাগারে আছেন। মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি দায়িত্ব পেয়ে ব্যাংক পরিদর্শন কার্যক্রম বন্ধ করে দেন, যার ফলে অনিয়ম আড়াল পায়। রাজী হাসানের আমলে ব্যাপক অর্থপাচার হলেও তিনি তা রোধে কোনো পদক্ষেপ নেননি। কাজী ছাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে ডলার বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ রয়েছে। আবু ফরাহ নাছের ঋণনীতির শিথিলতার মাধ্যমে পুরো ব্যাংকিং খাতকে অস্থির করে তুলেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই সাবেক গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরদের আমলেই ব্যাংকিং খাত রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি ও ক্ষমতাসীনদের স্বার্থসিদ্ধির মাধ্যমে ধ্বংসের পথে যায়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর ঋণ মওকুফ, অর্থপাচার এবং ব্যাংক দখলের মতো কর্মকাণ্ড সহজ হয়ে যায়।
ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
বিএফআইইউ এখন তাদের ব্যাংক হিসাবের লেনদেন, বিদেশি মুদ্রা স্থানান্তর, সম্পদ বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য অর্থপাচারের তথ্য খতিয়ে দেখবে। দুর্নীতি দমন কমিশন জানিয়েছে, প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হতে পারে। এ তদন্ত সফল হলে এটি বাংলাদেশের আর্থিক খাতে জবাবদিহি ও সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি বড় নজির হয়ে দাঁড়াবে।











