ইসলামি ঐক্যের পথে সবচেয়ে বড় বাধা—বাবুনগরীর মতো হিংসাত্মক ও বিতর্কিত বক্তব্য
- Update Time : ১০:১৮:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ অগাস্ট ২০২৫
- / ২৫৩ Time View
FireShot Capture 007 কাদিয়ানীদের চেয়েও নিকৃষ্ট জামায়াতে ইসলামী শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী dailyinqilab.com

ইসলাম একটি সাম্য, সৌহার্দ্য ও ঐক্যের ধর্ম। ইসলামের মূল শিক্ষা হলো—সব মুসলমান একটি দেহের মতো, একজন কষ্ট পেলে অন্যজনও ব্যথিত হবে। কিন্তু এই মহান ধর্মের ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ আজ চরমভাবে বিপন্ন হয়ে পড়েছে। আর এর অন্যতম কারণ হলো কিছু কট্টর, উগ্র এবং বিতর্কিত চিন্তাধারার ধারক নেতৃত্ব, যারা নিজেদের মতবাদ ছাড়া অন্যসব মত ও পথকে বাতিল মনে করে। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী এই তালিকার অন্যতম একজন।
বর্তমানে ইসলামী অঙ্গনে তিনি যেভাবে মতাদর্শগত সন্ত্রাস ছড়াচ্ছেন, তাতে শুধু কোনো দল বা চিন্তাধারা নয়, বরং গোটা উম্মাহর মধ্যে বিভক্তির বীজ রোপিত হচ্ছে। তার অসহিষ্ণু বক্তব্য, বিদ্বেষমূলক উপস্থাপন এবং কটূক্তিপূর্ণ ভাষা ইসলামের উদার ও সহনশীল চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তিনি নিয়মিতভাবে মানুষকে ইসলামের বিকৃত ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, গীবত ও পরচর্চা করছেন, এমনকি নিজেকে ইসলামের একমাত্র সত্য প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করছেন—যা ইসলামে কঠিনভাবে নিষিদ্ধ।
ধর্মীয় নেতার মুখে কুৎসা: একটি ভয়ংকর দৃষ্টান্ত
সম্প্রতি বাবুনগরীর দেওয়া একটি বক্তব্য ইসলামী সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেন, “জামায়াতে ইসলামীর দ্বারা ইসলামের যে ক্ষতি হয়েছে, কাদিয়ানিদের দ্বারাও সে ক্ষতি হয়নি।” এবং আরও বলেন, “সব ধরনের ভ্রান্ত ফিরকার মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট দল হলো জামায়াতে ইসলামি। এমনকি তারা কাদিয়ানিদের থেকেও খারাপ।” এই বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি গোটা উম্মাহর এক বৃহৎ অংশকে ‘অবিশ্বাসী’ এবং ‘ধর্মবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে বিভেদ সৃষ্টির একটি ভয়াবহ প্রচেষ্টা।
৪ আগস্ট, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির নাজিরহাট পৌরসভার একটি কমিউনিটি সেন্টারে ‘আগামীর ফটিকছড়ি বিনির্মাণে ওলামায়ে কেরামের করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এই বক্তব্য প্রদান করেন বাবুনগরী। সভায় হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং স্থানীয় ওলামা সমাজ অংশগ্রহণ করেন। এখানে শুধুমাত্র জামায়াত নয়, বরং গোটা মওদুদীবাদী চিন্তাধারা, যার মাধ্যমে শত শত আলেম, গবেষক ও ইসলামি চিন্তাবিদ সারা বিশ্বে ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়েছেন—তাদের সবার প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়।
গীবত, পরচর্চা ও বিদ্বেষ: এক বিপজ্জনক ধারার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ
এই ধরনের বক্তব্য ইসলামের চোখে কীভাবে বিবেচিত হয় তা স্পষ্ট করেছেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি বলেন,
“তোমরা গীবত করো না। গীবত করা হলো, ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে এমন কিছু বলা যা তাকে কষ্ট দেয়। যদি সেটা সত্যও হয়, তাহলে সেটাই গীবত। আর যদি মিথ্যা হয়, তবে তা অপবাদ।” (সহীহ মুসলিম)।
বাবুনগরী যখন এতো বড় একটা দলের বিরুদ্ধে এই বক্তব্য দেন, তখন তা শুধু ব্যক্তি আক্রমণ নয়, বরং গোটা চিন্তাধারা ও এর অনুসারীদের ঈমানেই আঘাত করা হয়। এমনকি তিনি বলেন, জামায়াত ‘মদিনার ইসলাম’ নয়, বরং ‘মওদুদীর ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই বিভাজনমূলক শ্রেণীকরণ ইসলামি ইতিহাসের সেই ঘৃণ্য অধ্যায়গুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যেখান থেকে শিয়া-সুন্নি বিভাজন, খারেজিদের উত্থান এবং ইসলামি সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা হয়েছিল।
ইসলামি ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতা
বর্তমান বিশ্বে মুসলমানরা রাজনৈতিকভাবে দুর্বল, অর্থনৈতিকভাবে নিপীড়িত এবং সামাজিকভাবে ছিন্নভিন্ন। বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের ওপর হামলা, দমন-পীড়ন ও নিপীড়নের ঘটনা বাড়ছে। কিন্তু এসব সংকটের মধ্যে একমাত্র শক্তি হতে পারত—ইসলামি ঐক্য। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজেদের মধ্যকার হিংসা, গীবত, দলাদলি ও বিভাজন।
কুরআন কারীমে আল্লাহ বলেন,
“তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পরে বিভক্ত হয়ো না।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১০৩)।
আর হাদীসে এসেছে, “মুমিনদের পরস্পরের ভালোবাসা, দয়া ও সহানুভূতির দৃষ্টান্ত হলো একটি দেহের মতো; শরীরের কোনো অঙ্গ ব্যথা পেলে পুরো দেহ জেগে ওঠে।” (সহীহ বুখারি ও মুসলিম)।
এই ঐক্য ও সহানুভূতির মূল্যবোধ আজ বাবুনগরী ও তার অনুসারীদের বক্তব্যে খণ্ড-বিখণ্ড হচ্ছে।
উলামা সমাজের দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা
ধর্মীয় নেতৃত্ব কেবল বক্তব্য প্রদানের জন্য নয়; বরং পথপ্রদর্শনের জন্য। আজ উলামা সমাজের একটি অংশ বাবুনগরীর মতো বিতর্কিত চিন্তার ব্যক্তিদের হাত ধরে সাধারণ মানুষকে ভুলপথে পরিচালিত করছে। এর দায় পুরো উম্মাহকে বহন করতে হবে।
একটি দল বা মতের সঙ্গে মতবিরোধ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই মতবিরোধ যেন আদব ও ইখলাস-এর মাধ্যমে প্রকাশিত হয়, তা-ই ছিল নবী করিম (সা.)-এর আদর্শ। তিনি কোনোদিন কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেননি, বরং যুক্তির মাধ্যমে দাওয়াত দিয়েছেন। অথচ আমাদের সময়ের কিছু নেতারা ইসলামের সেই পবিত্র মিম্বারকে ঘৃণার মঞ্চে রূপান্তর করেছে।
ঘৃণার রাজনীতি নয়, ইসলামের শান্তির দাওয়াত প্রয়োজন
বাবুনগরীর মতো নেতাদের সময় এসেছে আত্মসমালোচনা করার, তওবা করে ইসলামের প্রকৃত চেতনায় ফিরে যাওয়ার। শুধু বয়স নয়, দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার ভার তাদের কাঁধে। কিয়ামতের দিনে মানুষ আল্লাহর কাছে শুধু নিজের কাজের জবাবদিহি করবে না, বরং অন্যকে বিভ্রান্ত করার দায়ও বহন করতে হবে।
আজ যদি ইসলামের সত্যিকারের খেদমত করতে হয়, তবে তা বিভাজনের মাধ্যমে নয়—ঐক্যের মাধ্যমে করতে হবে। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ভ্রাতৃত্ব, সহনশীলতা, পরস্পর সম্মান, আদর্শিক পার্থক্যের মধ্যে সহাবস্থান—এই হল ইসলামের মূল চেতনা। বিভেদ নয়, একতা হোক আমাদের অঙ্গীকার।
“وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا”
— “তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর রজ্জু (ধর্ম) মজবুতভাবে ধারণ করো এবং পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ো না।”
(সূরা আলে ইমরান: ১০৩)
এই আয়াতই হোক আমাদের নতুন পথচলার প্রেরণা—ঐক্য, উদারতা ও ভালোবাসার এক নতুন ইসলামি সমাজ গড়ার লক্ষ্যে।












