সময়: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রিন্স এমবিএসের শখ পূরণ, বিল গেটসের হাত থেকে ছিনিয়ে নিলেন আধা বিলিয়নের সুপার ইয়ট ‘সেরিন’

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১১:৫৬:২৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৪ অগাস্ট ২০২৫
  • / ১৮৫ Time View

a6 20250804104544

a6 20250804104544

বিশ্বের বিলিয়নিয়ারদের জীবনে “সুপারইয়ট” কেবল একটি জলযান নয়, বরং তা একধরনের ক্ষমতার প্রতীক, ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ এবং বিলাসিতার এক অনন্য প্রকাশভঙ্গি। এমন অনেক সুপারইয়ট রয়েছে যেগুলোর গল্প কিংবদন্তির মতো। এমনই একটি গল্প ঘিরে আছে মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস এবং সউদী ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান—এমবিএস-কে নিয়ে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রাজকীয় বিলাসে ঠাসা সুপারইয়ট ‘সেরিন’। এই সুপারইয়টের দাম প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বিল গেটসের স্বপ্নের নৌকা

২০১৪ সালের গ্রীষ্মে বিল গেটস ও তার পরিবার অবকাশযাপনের জন্য ভাড়া নেন ‘সেরিন’ নামের এই বিশাল ইয়ট। এটি ছিল তৎকালীন রাশিয়ান ভদকা ব্যবসায়ী ইউরি শেফলারের মালিকানাধীন। ৪৩৯ ফুট দীর্ঘ এই ইয়টটির বিলাসবহুলতা এবং পরিপাটি ডিজাইন গেটস পরিবারকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, বিল গেটস ইয়াটটি স্থায়ীভাবে কেনার সিদ্ধান্ত নেন। প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৫ মিলিয়ন ডলার ভাড়ায় তিনি এটি ব্যবহার করতেন। সূর্যস্নান, জেট স্কিইং, স্কুবা ডাইভিং আর হেলিকপ্টারে করে সার্ডিনিয়ায় টেনিস খেলাসহ এক রাজকীয় সামুদ্রিক জীবনের স্বাদ নিচ্ছিলেন তিনি।

হঠাৎ আবির্ভাব এমবিএসের

ঠিক এমন সময়েই নতুন এক চরিত্র প্রবেশ করেন এই গল্পে—সউদী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, যিনি ২০১৫ সালে ফ্রান্সে ছুটি কাটাতে গিয়ে প্রথম চোখে দেখেন ‘সেরিন’। তখন ইয়টটি বিক্রির তালিকায় না থাকলেও, এমবিএস তার সহকারীকে পাঠিয়ে সরাসরি মালিকের কাছে ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের অফার দেন। এত বিশাল প্রস্তাবের পর আর কোনো দর-কষাকষি হয়নি। শেফলার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান, এবং মাত্র ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই চুক্তি সম্পন্ন হয়। একক ওয়্যার ট্রান্সফারের মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের অর্থ পরিশোধের পর ইয়টটি হয়ে যায় সউদী রাজপরিবারের মালিকানাধীন। বিল গেটস তখনও ইয়াটটি কেনার প্রস্তুতিতে থাকলেও, এভাবে হঠাৎ করে হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় হতবাক হয়ে পড়েন।

সেরিনএখন কাদের?

বর্তমানে ‘সেরিন’ সউদী আরবের রাজপরিবারের গর্বের অংশ। ২০১১ সালে ইতালির বিখ্যাত জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফিনকান্তিয়েরি এটি নির্মাণ করে। এটি ছিল তাদের প্রথম মেগা-ইয়ট প্রকল্প এবং এখনো পর্যন্ত এটি বিশ্বের সবচেয়ে বিলাসবহুল ইয়টগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত। ইয়াটটির দৈর্ঘ্য ৪৩৯ ফুট এবং প্রস্থ ৬০ ফুট। এতে রয়েছে সাতটি ডেক, ৪,৫০০ বর্গমিটারেরও বেশি অভ্যন্তরীণ জায়গা এবং অসংখ্য রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা।

বিলাস গোপনীয়তার সমন্বয়

‘সেরিন’-এর অভ্যন্তরীণ গঠন এখনো সম্পূর্ণভাবে গোপন রাখা হয়, তবে কিছু তথ্য জানায় এর অভিজাত কাঠামোর প্রমাণ। এতে রয়েছে দুইটি হেলিপ্যাড—যার একটি সুইমিং পুল অথবা ডান্স ফ্লোরে রূপান্তরযোগ্য, একটি আন্ডারওয়াটার ভিউয়িং রুম, একটি সাবমেরিন, সিনেমা রুম, পিয়ানো লাউঞ্জ, সমুদ্রজলপূর্ণ ইনফিনিটি পুল, বীচ ক্লাব, স্পা, হাম্মাম, বরফঘরসহ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। ইয়াটটিতে একসঙ্গে ২৪ জন অতিথি অবস্থান করতে পারেন, যাদের জন্য সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকেন ৫০ জনের বেশি কর্মী। মালিকের জন্য রয়েছে আলাদা স্যুট, সুইমিং প্ল্যাটফর্ম এবং একটি নিজস্ব লিফট।

লিওনার্দো দা ভিঞ্চিরসালভাতর মুন্দি

এমনকি এই ইয়াটটির আরেকটি চাঞ্চল্যকর দিক হলো, এখানে সংরক্ষিত রয়েছে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির বিশ্ববিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘সালভাতর মুন্দি’, যার মূল্য প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলার। যদিও এটি এখনো গুজব হিসেবেই রয়ে গেছে, তবে বিলাস আর সংগ্রহশালার ঐতিহাসিক মানদণ্ড বিবেচনায়, তা একেবারেই অসম্ভব নয়।

গেটসের শেষপর্যন্ত নতুন চেষ্টাও অমার্জিত

যদিও বিল গেটস ‘সেরিন’ পাননি, তবে তিনি হাল ছাড়েননি। পরে তিনি পরিবেশবান্ধব, হাইড্রোজেন চালিত নতুন এক সুপারইয়ট নির্মাণের উদ্যোগ নেন, যার নাম ‘Breakthrough’। এই ইয়াটটির নির্মাণ ব্যয় ৬৪৫ মিলিয়ন ডলার হলেও আশ্চর্যজনকভাবে তিনি এখনো সেখানে পা রাখেননি এবং এটি বিক্রির জন্যও বিবেচনা করছেন। এটি প্রমাণ করে, একটি বিলাসবহুল জীবনের স্বাদ ও স্বপ্ন পূরণে শুধু অর্থ নয়, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত আর একচেটিয়া ক্ষমতার গুরুত্ব কতখানি।

‘সেরিন’-এর গল্প আমাদের শেখায় বিলাসবহুল জীবনযাত্রার প্রতিযোগিতায় কেউ শুধু টাকার জোরে জিতেন না, বরং যারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং যাদের কাছে ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত রূপ রয়েছে, তারাই শেষ পর্যন্ত শিখরে পৌঁছান। বিল গেটসের মতো ধনকুবেরও এই প্রতিযোগিতায় হেরে যান, আর এমবিএস-এর মতো তরুণ ও শক্তিশালী নেতৃত্ব একাধারে রাজনীতি, ব্যবসা ও বিলাসবহুলতায় আধিপত্য কায়েম করেন। ‘সেরিন’ এখন শুধু একটি ইয়ট নয়—এটি হয়ে উঠেছে আধুনিক আরব নেতৃত্বের এক অনন্য প্রতীক।

তথ্যসূত্র: Luxury Launches, The Guardian, Forbes, Boat International.

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

প্রিন্স এমবিএসের শখ পূরণ, বিল গেটসের হাত থেকে ছিনিয়ে নিলেন আধা বিলিয়নের সুপার ইয়ট ‘সেরিন’

Update Time : ১১:৫৬:২৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৪ অগাস্ট ২০২৫

a6 20250804104544

বিশ্বের বিলিয়নিয়ারদের জীবনে “সুপারইয়ট” কেবল একটি জলযান নয়, বরং তা একধরনের ক্ষমতার প্রতীক, ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ এবং বিলাসিতার এক অনন্য প্রকাশভঙ্গি। এমন অনেক সুপারইয়ট রয়েছে যেগুলোর গল্প কিংবদন্তির মতো। এমনই একটি গল্প ঘিরে আছে মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস এবং সউদী ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান—এমবিএস-কে নিয়ে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রাজকীয় বিলাসে ঠাসা সুপারইয়ট ‘সেরিন’। এই সুপারইয়টের দাম প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বিল গেটসের স্বপ্নের নৌকা

২০১৪ সালের গ্রীষ্মে বিল গেটস ও তার পরিবার অবকাশযাপনের জন্য ভাড়া নেন ‘সেরিন’ নামের এই বিশাল ইয়ট। এটি ছিল তৎকালীন রাশিয়ান ভদকা ব্যবসায়ী ইউরি শেফলারের মালিকানাধীন। ৪৩৯ ফুট দীর্ঘ এই ইয়টটির বিলাসবহুলতা এবং পরিপাটি ডিজাইন গেটস পরিবারকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, বিল গেটস ইয়াটটি স্থায়ীভাবে কেনার সিদ্ধান্ত নেন। প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৫ মিলিয়ন ডলার ভাড়ায় তিনি এটি ব্যবহার করতেন। সূর্যস্নান, জেট স্কিইং, স্কুবা ডাইভিং আর হেলিকপ্টারে করে সার্ডিনিয়ায় টেনিস খেলাসহ এক রাজকীয় সামুদ্রিক জীবনের স্বাদ নিচ্ছিলেন তিনি।

হঠাৎ আবির্ভাব এমবিএসের

ঠিক এমন সময়েই নতুন এক চরিত্র প্রবেশ করেন এই গল্পে—সউদী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, যিনি ২০১৫ সালে ফ্রান্সে ছুটি কাটাতে গিয়ে প্রথম চোখে দেখেন ‘সেরিন’। তখন ইয়টটি বিক্রির তালিকায় না থাকলেও, এমবিএস তার সহকারীকে পাঠিয়ে সরাসরি মালিকের কাছে ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের অফার দেন। এত বিশাল প্রস্তাবের পর আর কোনো দর-কষাকষি হয়নি। শেফলার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান, এবং মাত্র ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই চুক্তি সম্পন্ন হয়। একক ওয়্যার ট্রান্সফারের মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের অর্থ পরিশোধের পর ইয়টটি হয়ে যায় সউদী রাজপরিবারের মালিকানাধীন। বিল গেটস তখনও ইয়াটটি কেনার প্রস্তুতিতে থাকলেও, এভাবে হঠাৎ করে হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় হতবাক হয়ে পড়েন।

সেরিনএখন কাদের?

বর্তমানে ‘সেরিন’ সউদী আরবের রাজপরিবারের গর্বের অংশ। ২০১১ সালে ইতালির বিখ্যাত জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফিনকান্তিয়েরি এটি নির্মাণ করে। এটি ছিল তাদের প্রথম মেগা-ইয়ট প্রকল্প এবং এখনো পর্যন্ত এটি বিশ্বের সবচেয়ে বিলাসবহুল ইয়টগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত। ইয়াটটির দৈর্ঘ্য ৪৩৯ ফুট এবং প্রস্থ ৬০ ফুট। এতে রয়েছে সাতটি ডেক, ৪,৫০০ বর্গমিটারেরও বেশি অভ্যন্তরীণ জায়গা এবং অসংখ্য রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা।

বিলাস গোপনীয়তার সমন্বয়

‘সেরিন’-এর অভ্যন্তরীণ গঠন এখনো সম্পূর্ণভাবে গোপন রাখা হয়, তবে কিছু তথ্য জানায় এর অভিজাত কাঠামোর প্রমাণ। এতে রয়েছে দুইটি হেলিপ্যাড—যার একটি সুইমিং পুল অথবা ডান্স ফ্লোরে রূপান্তরযোগ্য, একটি আন্ডারওয়াটার ভিউয়িং রুম, একটি সাবমেরিন, সিনেমা রুম, পিয়ানো লাউঞ্জ, সমুদ্রজলপূর্ণ ইনফিনিটি পুল, বীচ ক্লাব, স্পা, হাম্মাম, বরফঘরসহ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। ইয়াটটিতে একসঙ্গে ২৪ জন অতিথি অবস্থান করতে পারেন, যাদের জন্য সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকেন ৫০ জনের বেশি কর্মী। মালিকের জন্য রয়েছে আলাদা স্যুট, সুইমিং প্ল্যাটফর্ম এবং একটি নিজস্ব লিফট।

লিওনার্দো দা ভিঞ্চিরসালভাতর মুন্দি

এমনকি এই ইয়াটটির আরেকটি চাঞ্চল্যকর দিক হলো, এখানে সংরক্ষিত রয়েছে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির বিশ্ববিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘সালভাতর মুন্দি’, যার মূল্য প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলার। যদিও এটি এখনো গুজব হিসেবেই রয়ে গেছে, তবে বিলাস আর সংগ্রহশালার ঐতিহাসিক মানদণ্ড বিবেচনায়, তা একেবারেই অসম্ভব নয়।

গেটসের শেষপর্যন্ত নতুন চেষ্টাও অমার্জিত

যদিও বিল গেটস ‘সেরিন’ পাননি, তবে তিনি হাল ছাড়েননি। পরে তিনি পরিবেশবান্ধব, হাইড্রোজেন চালিত নতুন এক সুপারইয়ট নির্মাণের উদ্যোগ নেন, যার নাম ‘Breakthrough’। এই ইয়াটটির নির্মাণ ব্যয় ৬৪৫ মিলিয়ন ডলার হলেও আশ্চর্যজনকভাবে তিনি এখনো সেখানে পা রাখেননি এবং এটি বিক্রির জন্যও বিবেচনা করছেন। এটি প্রমাণ করে, একটি বিলাসবহুল জীবনের স্বাদ ও স্বপ্ন পূরণে শুধু অর্থ নয়, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত আর একচেটিয়া ক্ষমতার গুরুত্ব কতখানি।

‘সেরিন’-এর গল্প আমাদের শেখায় বিলাসবহুল জীবনযাত্রার প্রতিযোগিতায় কেউ শুধু টাকার জোরে জিতেন না, বরং যারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং যাদের কাছে ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত রূপ রয়েছে, তারাই শেষ পর্যন্ত শিখরে পৌঁছান। বিল গেটসের মতো ধনকুবেরও এই প্রতিযোগিতায় হেরে যান, আর এমবিএস-এর মতো তরুণ ও শক্তিশালী নেতৃত্ব একাধারে রাজনীতি, ব্যবসা ও বিলাসবহুলতায় আধিপত্য কায়েম করেন। ‘সেরিন’ এখন শুধু একটি ইয়ট নয়—এটি হয়ে উঠেছে আধুনিক আরব নেতৃত্বের এক অনন্য প্রতীক।

তথ্যসূত্র: Luxury Launches, The Guardian, Forbes, Boat International.