সময়: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতে ‘টিন সেক্স’ বিতর্ক: সম্মতি বনাম সুরক্ষা—কিশোরদের যৌন অধিকারের সীমারেখা কোথায়?

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৭:০১:৩৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২ অগাস্ট ২০২৫
  • / ১৮২ Time View

0208

 

0208

ভারতে ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মতিতে গড়ে ওঠা প্রেম বা যৌন সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন বর্ষীয়ান মানবাধিকার আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং, যিনি সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছেন, যাতে এই বয়সসীমার তরুণ-তরুণীদের সম্মতির ভিত্তিতে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার অধিকারকে অপরাধের আওতা থেকে মুক্ত রাখা হয়। তাঁর মতে, বর্তমান আইন বাস্তবতা বিবর্জিত ও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয়, যার ফলে সমাজে হাজারো কিশোর-কিশোরী অকারণেধর্ষকবা অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে—এমনকি তাদের ভবিষ্যৎও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

কী বলছে প্রচলিত আইন?

ভারতে বর্তমানে প্রচলিত আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের নিচে যেকোনো ব্যক্তির সঙ্গে যৌন সম্পর্ক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়, এমনকি তা পারস্পরিক সম্মতিতেও হয়ে থাকলেও। এই বিধান এসেছে POCSO (Protection of Children from Sexual Offences) আইন থেকে, যা ২০১২ সালে প্রণীত হয়েছিল শিশুদের যৌন নিপীড়ন, নির্যাতন, শোষণ ও পাচারের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। আইনটি মূলত শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই চালু করা হয়, এবং তাতে সম্মতির বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়—অর্থাৎ বয়স যদি ১৮ বছরের কম হয়, তবে সম্মতির প্রশ্নই ওঠে না।

তবে বাস্তবতার নিরিখে দেখা যায়, এই আইনের আওতায় বহু ক্ষেত্রে প্রেমঘটিত সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে দেখিয়ে কিশোরদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হচ্ছে, যা অনেক সময় প্রেমিক যুগলের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিচ্ছে এবং সম্পর্কের পারিবারিক বিরোধের সুযোগে আইনের অপব্যবহারও ঘটছে।

ইন্দিরা জয়সিংএর যুক্তি কী?

ইন্দিরা জয়সিং-এর মতে, ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা যথেষ্ট মানসিক পরিপক্বতা অর্জন করে, যা তাদেরকে পারস্পরিক সম্মতিতে প্রেম ও যৌন সম্পর্ক গড়ার সক্ষমতা দেয়। তাঁর দাবি, বর্তমান আইন সম্মতির ধারণাকেই অগ্রাহ্য করছে এবং কিশোর-কিশোরীদের উপর এক ধরনের পিতৃতান্ত্রিক শাসন প্রয়োগ করছে, যা তাদের স্বাধীনতাকে খর্ব করছে।

তিনি আরও বলেন, প্রেম করে পালিয়ে যাওয়া বা একসঙ্গে থাকার মতো ঘটনাগুলোর পরেও, আইনি

অভিযোগ প্রায়শই একতরফা হয়—সাধারণত ছেলেটিকে ধর্ষকের আসামির আসনে বসানো হয়, যদিও সম্পর্কটি সম্পূর্ণরূপে পারস্পরিক সম্মতিতে গড়ে উঠেছিল। বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় অনেক কিশোর অপরাধী হিসেবে সমাজে চিহ্নিত হয়, যার প্রভাব তার শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন এমনকি মানসিক স্বাস্থ্যেও পড়ে।

এই প্রেক্ষাপটে তিনি ‘close-in-age exception’ বা বয়সের ব্যবধানের ভিত্তিতে ব্যতিক্রমী বিধান প্রস্তাব করেছেন—যেখানে দুইজনের বয়সের পার্থক্য দুই বছরের মধ্যে থাকলে এবং সম্পর্কটি যদি পারস্পরিক সম্মতিতে হয়, তাহলে সেটিকে POCSO আইনের আওতাভুক্ত না করে বিবেচনা করা যেতে পারে।

সরকারের এবং বিরোধী মহলের অবস্থান

ভারত সরকারের যুক্তি হলো, এই ধরনের ব্যতিক্রমী বিধান চালু করা হলে শিশুদের সুরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং আইনের অপব্যবহার বেড়ে যাবে। বিশেষ করে বাল্যবিবাহ, পাচার, এবং শিশুদের ওপর যৌন শোষণের মত অপরাধ আরও বেড়ে যেতে পারে বলে সরকার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, আইনটি শিশুদের রক্ষার জন্যই তৈরি এবং এতে কোনো ছাড় দিলে তা শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে, সমালোচকরা বলছেন, বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে অনেক সময় বাবামা বা পরিবার নিজেই মেয়েটির সম্মতিকে অস্বীকার করে ছেলেটির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সম্পর্কের মেনে না নেওয়ার কারণে প্রতিশোধমূলকভাবে মামলা করা হয়। ফলে অনেক তরুণ ‘ধর্ষণ মামলার’ আসামি হয়ে জীবন বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। অনেক পণ্ডিত, সমাজবিজ্ঞানী ও শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, আইনটি একদিকে যেমন সুরক্ষা দিচ্ছে, অন্যদিকে অন্যায়ভাবে কিশোরদের দণ্ডিতও করছে, যা মানবাধিকারের লঙ্ঘনের সামিল।

বাস্তবতা পরিসংখ্যান কী বলছে?

ভারতের আদালতগুলোতে POCSO আইনের অধীনে বর্তমানে প্রায় . লক্ষ মামলা বিচারাধীন, যার একটি বিশাল অংশ সম্মতিমূলক প্রেমের সম্পর্ক ঘিরে গঠিত হয়েছে। এই সব মামলায় মূলত দেখা যায়—ছেলে ও মেয়ে দুজনই একে অপরকে ভালোবাসে এবং সম্পর্কটি পারিবারিক সম্মতি না পেয়ে আইনগত জটিলতায় পড়ে যায়। বহু কিশোরের বিরুদ্ধে এই কারণে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছে, যদিও কোনো শারীরিক জোর বা শোষণের প্রমাণ নেই। এমনকি, কর্ণাটক হাইকোর্ট পর্যন্ত মন্তব্য করেছে যে, আইন কমিশন যেন বর্তমান আইনের এই দিকগুলো পুনর্বিবেচনা করে বাস্তব প্রেক্ষাপট অনুসারে আইনি ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ নিশ্চিত করে।

বর্তমান আইনের মূল দ্বন্দ্ব

ভারতের বর্তমান আইনে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব বিদ্যমান: একদিকে শিশুদের যৌন নির্যাতন থেকে সুরক্ষা প্রদান করা গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা কিশোর বয়সের প্রেম-ভালোবাসাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হলে তা তাদের মৌলিক অধিকার বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিশোর বয়সে শারীরিক আকর্ষণ, আবেগ এবং সম্পর্ক গড়ে ওঠা স্বাভাবিক—এমন বাস্তবতাকে পুরোপুরি অস্বীকার করে আইন প্রয়োগ করা হলে তা আইনের মানবিক দিককেই ব্যর্থ করে

কোন পথে সমাধান?

এই বিতর্কে একটি ভারসাম্যমূলক সমাধানের পথ খুঁজছে আইন কমিশন। তাদের প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, বিচারকের হাতে কিছু ‘discretion’ বা বিবেচনাধিকার রাখা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি দেখা যায় সম্পর্কটি সম্মতিমূলক এবং বয়সের ব্যবধান স্বল্প, তাহলে বিচারক মামলাটি খারিজ করতে পারেন, কিংবা শাস্তি কমিয়ে দিতে পারেন।

তবে ইন্দিরা জয়সিং মনে করেন, শুধু বিচারকের বিবেচনার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। কারণ, মামলার তদন্ত, পুলিশি হেফাজত, আদালতের হাজিরা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে যাওয়া নিজেই এক ধরনের মানসিক সামাজিক শাস্তি হয়ে দাঁড়ায় কিশোরদের জন্য। তাই তিনি চাইছেন আইনেই একটি ‘Close-in-age’ ব্যতিক্রম যুক্ত হোক, যেন এই সমস্যা শুরুতেই রোধ করা যায়।

শেষ কথা

ভারতের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতা ও কিশোর-কিশোরীদের স্বাধীনতা, বিকাশ ও সুরক্ষার প্রশ্নে POCSO আইন নিয়ে একটি সুস্থ ও সাহসী আলোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। একদিকে যেমন শিশুদের সুরক্ষা অগ্রাধিকার হওয়া উচিত, অন্যদিকে কিশোরদের সম্মতিমূলক সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে দেখা কতটা ন্যায্য—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে সমাজ, রাষ্ট্র এবং আদালতকে মিলেই।

সমাধান হয়তো কোনো একক পথে নয়, বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো গঠন করে যেখানে শিশুদের শোষণ থেকে রক্ষা করা যায়, আবার কিশোরদের স্বাভাবিক প্রেম ও যৌন সম্পর্কের বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা যায়।

 আপনার মতামত কী? ১৬১৮ বছর বয়সী কিশোরদের সম্মতিমূলক যৌন সম্পর্ক কি আইনত অপরাধ হওয়া উচিত? নাকি আইন সংস্কার প্রয়োজন? মতামত জানান মন্তব্যে।

সূত্র: বিবিসি

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ভারতে ‘টিন সেক্স’ বিতর্ক: সম্মতি বনাম সুরক্ষা—কিশোরদের যৌন অধিকারের সীমারেখা কোথায়?

Update Time : ০৭:০১:৩৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২ অগাস্ট ২০২৫

 

0208

ভারতে ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মতিতে গড়ে ওঠা প্রেম বা যৌন সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন বর্ষীয়ান মানবাধিকার আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং, যিনি সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছেন, যাতে এই বয়সসীমার তরুণ-তরুণীদের সম্মতির ভিত্তিতে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার অধিকারকে অপরাধের আওতা থেকে মুক্ত রাখা হয়। তাঁর মতে, বর্তমান আইন বাস্তবতা বিবর্জিত ও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয়, যার ফলে সমাজে হাজারো কিশোর-কিশোরী অকারণেধর্ষকবা অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে—এমনকি তাদের ভবিষ্যৎও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

কী বলছে প্রচলিত আইন?

ভারতে বর্তমানে প্রচলিত আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের নিচে যেকোনো ব্যক্তির সঙ্গে যৌন সম্পর্ক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়, এমনকি তা পারস্পরিক সম্মতিতেও হয়ে থাকলেও। এই বিধান এসেছে POCSO (Protection of Children from Sexual Offences) আইন থেকে, যা ২০১২ সালে প্রণীত হয়েছিল শিশুদের যৌন নিপীড়ন, নির্যাতন, শোষণ ও পাচারের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। আইনটি মূলত শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই চালু করা হয়, এবং তাতে সম্মতির বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়—অর্থাৎ বয়স যদি ১৮ বছরের কম হয়, তবে সম্মতির প্রশ্নই ওঠে না।

তবে বাস্তবতার নিরিখে দেখা যায়, এই আইনের আওতায় বহু ক্ষেত্রে প্রেমঘটিত সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে দেখিয়ে কিশোরদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হচ্ছে, যা অনেক সময় প্রেমিক যুগলের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিচ্ছে এবং সম্পর্কের পারিবারিক বিরোধের সুযোগে আইনের অপব্যবহারও ঘটছে।

ইন্দিরা জয়সিংএর যুক্তি কী?

ইন্দিরা জয়সিং-এর মতে, ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা যথেষ্ট মানসিক পরিপক্বতা অর্জন করে, যা তাদেরকে পারস্পরিক সম্মতিতে প্রেম ও যৌন সম্পর্ক গড়ার সক্ষমতা দেয়। তাঁর দাবি, বর্তমান আইন সম্মতির ধারণাকেই অগ্রাহ্য করছে এবং কিশোর-কিশোরীদের উপর এক ধরনের পিতৃতান্ত্রিক শাসন প্রয়োগ করছে, যা তাদের স্বাধীনতাকে খর্ব করছে।

তিনি আরও বলেন, প্রেম করে পালিয়ে যাওয়া বা একসঙ্গে থাকার মতো ঘটনাগুলোর পরেও, আইনি

অভিযোগ প্রায়শই একতরফা হয়—সাধারণত ছেলেটিকে ধর্ষকের আসামির আসনে বসানো হয়, যদিও সম্পর্কটি সম্পূর্ণরূপে পারস্পরিক সম্মতিতে গড়ে উঠেছিল। বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় অনেক কিশোর অপরাধী হিসেবে সমাজে চিহ্নিত হয়, যার প্রভাব তার শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন এমনকি মানসিক স্বাস্থ্যেও পড়ে।

এই প্রেক্ষাপটে তিনি ‘close-in-age exception’ বা বয়সের ব্যবধানের ভিত্তিতে ব্যতিক্রমী বিধান প্রস্তাব করেছেন—যেখানে দুইজনের বয়সের পার্থক্য দুই বছরের মধ্যে থাকলে এবং সম্পর্কটি যদি পারস্পরিক সম্মতিতে হয়, তাহলে সেটিকে POCSO আইনের আওতাভুক্ত না করে বিবেচনা করা যেতে পারে।

সরকারের এবং বিরোধী মহলের অবস্থান

ভারত সরকারের যুক্তি হলো, এই ধরনের ব্যতিক্রমী বিধান চালু করা হলে শিশুদের সুরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং আইনের অপব্যবহার বেড়ে যাবে। বিশেষ করে বাল্যবিবাহ, পাচার, এবং শিশুদের ওপর যৌন শোষণের মত অপরাধ আরও বেড়ে যেতে পারে বলে সরকার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, আইনটি শিশুদের রক্ষার জন্যই তৈরি এবং এতে কোনো ছাড় দিলে তা শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে, সমালোচকরা বলছেন, বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে অনেক সময় বাবামা বা পরিবার নিজেই মেয়েটির সম্মতিকে অস্বীকার করে ছেলেটির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সম্পর্কের মেনে না নেওয়ার কারণে প্রতিশোধমূলকভাবে মামলা করা হয়। ফলে অনেক তরুণ ‘ধর্ষণ মামলার’ আসামি হয়ে জীবন বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। অনেক পণ্ডিত, সমাজবিজ্ঞানী ও শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, আইনটি একদিকে যেমন সুরক্ষা দিচ্ছে, অন্যদিকে অন্যায়ভাবে কিশোরদের দণ্ডিতও করছে, যা মানবাধিকারের লঙ্ঘনের সামিল।

বাস্তবতা পরিসংখ্যান কী বলছে?

ভারতের আদালতগুলোতে POCSO আইনের অধীনে বর্তমানে প্রায় . লক্ষ মামলা বিচারাধীন, যার একটি বিশাল অংশ সম্মতিমূলক প্রেমের সম্পর্ক ঘিরে গঠিত হয়েছে। এই সব মামলায় মূলত দেখা যায়—ছেলে ও মেয়ে দুজনই একে অপরকে ভালোবাসে এবং সম্পর্কটি পারিবারিক সম্মতি না পেয়ে আইনগত জটিলতায় পড়ে যায়। বহু কিশোরের বিরুদ্ধে এই কারণে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছে, যদিও কোনো শারীরিক জোর বা শোষণের প্রমাণ নেই। এমনকি, কর্ণাটক হাইকোর্ট পর্যন্ত মন্তব্য করেছে যে, আইন কমিশন যেন বর্তমান আইনের এই দিকগুলো পুনর্বিবেচনা করে বাস্তব প্রেক্ষাপট অনুসারে আইনি ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ নিশ্চিত করে।

বর্তমান আইনের মূল দ্বন্দ্ব

ভারতের বর্তমান আইনে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব বিদ্যমান: একদিকে শিশুদের যৌন নির্যাতন থেকে সুরক্ষা প্রদান করা গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা কিশোর বয়সের প্রেম-ভালোবাসাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হলে তা তাদের মৌলিক অধিকার বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিশোর বয়সে শারীরিক আকর্ষণ, আবেগ এবং সম্পর্ক গড়ে ওঠা স্বাভাবিক—এমন বাস্তবতাকে পুরোপুরি অস্বীকার করে আইন প্রয়োগ করা হলে তা আইনের মানবিক দিককেই ব্যর্থ করে

কোন পথে সমাধান?

এই বিতর্কে একটি ভারসাম্যমূলক সমাধানের পথ খুঁজছে আইন কমিশন। তাদের প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, বিচারকের হাতে কিছু ‘discretion’ বা বিবেচনাধিকার রাখা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি দেখা যায় সম্পর্কটি সম্মতিমূলক এবং বয়সের ব্যবধান স্বল্প, তাহলে বিচারক মামলাটি খারিজ করতে পারেন, কিংবা শাস্তি কমিয়ে দিতে পারেন।

তবে ইন্দিরা জয়সিং মনে করেন, শুধু বিচারকের বিবেচনার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। কারণ, মামলার তদন্ত, পুলিশি হেফাজত, আদালতের হাজিরা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে যাওয়া নিজেই এক ধরনের মানসিক সামাজিক শাস্তি হয়ে দাঁড়ায় কিশোরদের জন্য। তাই তিনি চাইছেন আইনেই একটি ‘Close-in-age’ ব্যতিক্রম যুক্ত হোক, যেন এই সমস্যা শুরুতেই রোধ করা যায়।

শেষ কথা

ভারতের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতা ও কিশোর-কিশোরীদের স্বাধীনতা, বিকাশ ও সুরক্ষার প্রশ্নে POCSO আইন নিয়ে একটি সুস্থ ও সাহসী আলোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। একদিকে যেমন শিশুদের সুরক্ষা অগ্রাধিকার হওয়া উচিত, অন্যদিকে কিশোরদের সম্মতিমূলক সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে দেখা কতটা ন্যায্য—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে সমাজ, রাষ্ট্র এবং আদালতকে মিলেই।

সমাধান হয়তো কোনো একক পথে নয়, বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো গঠন করে যেখানে শিশুদের শোষণ থেকে রক্ষা করা যায়, আবার কিশোরদের স্বাভাবিক প্রেম ও যৌন সম্পর্কের বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা যায়।

 আপনার মতামত কী? ১৬১৮ বছর বয়সী কিশোরদের সম্মতিমূলক যৌন সম্পর্ক কি আইনত অপরাধ হওয়া উচিত? নাকি আইন সংস্কার প্রয়োজন? মতামত জানান মন্তব্যে।

সূত্র: বিবিসি