সময়: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আওয়ামী ক্যাডারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া কে এই মেজর সাদিক? সেনা হেফাজতে গ্রেপ্তার, তদন্তে জড়িতদের চাঞ্চল্যকর সম্পৃক্ততা উদঘাটন

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৬:৫৫:৫৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২ অগাস্ট ২০২৫
  • / ২৪৬ Time View

1754050789 2e61e0ad753677dddd1a9d1f038e6721

1754050789 2e61e0ad753677dddd1a9d1f038e6721

আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নির্বাচিত ক্যাডারদের গোপনে প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা, মেজর সাদিকুল হক ওরফে মেজর সাদিককে আটক করে সেনা হেফাজতে রাখা হয়েছে। সেনাবাহিনীর সামরিক অপারেশনস পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাজিম-উদ-দৌলা বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) ঢাকার অফিসার্স মেস ‘এ’-তে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এই তথ্য নিশ্চিত করেন।

সেনা কর্মকর্তা মেজর সাদিক বর্তমানে কক্সবাজারের রামু ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সরাসরি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশনায় মিরপুর, ভাটারা, কাটাবন ও পূর্বাচলসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে গোপনে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এ প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য ছিল সদ্য ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে এনে রাজনৈতিকভাবে আবার পুনরাবির্ভাব ঘটানো এবং আন্দোলন দমনসহ দলে নতুন ছায়া সেনা গঠন।

বিশেষ করে গত ৮ জুলাই ভাটারা থানার একটি কনভেনশন সেন্টারে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের প্রায় ৪০০ নেতাকর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের মধ্যে অনেকে দুই দিন আগেই নির্ধারিত টোকেন গ্রহণ করেছিলেন। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে জানাগেছে, প্রশিক্ষণ প্রাপ্তদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে কেন্দ্রীয় একটি পর্যায়ে এবং ওই তালিকার সঙ্গে ভারতীয় ও প্রবাসী আওয়ামী নেতৃত্বের সমন্বয় ছিল।

এ ঘটনায় আরও বিস্ময়কর তথ্য উঠে এসেছে গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে। মেজর সাদিকের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন তার স্ত্রী, সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) সুমাইয়া জাফরিন। জানা গেছে, সাদিক ও সুমাইয়া উভয়ই কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে গোপনে এই প্রশিক্ষণের আয়োজন করেন। পরিকল্পনাটি আরও বিস্তৃতভাবে সমন্বয় করছিলেন কলকাতায় অবস্থানরত সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তাকে সহায়তা করেছেন পুলিশের সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ কয়েকজন আওয়ামী নেতা এবং পলাতক সাবেক কর্মকর্তারা।

বিশ্বস্ত গোয়েন্দা তথ্য বলছে, সরকার পুনঃদখলের এই চক্রান্তের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন দিল্লিতে অবস্থানকারী পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের সাবেক প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলাম এবং সেনা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুজিবুর রহমান। তারা ভারতে বসে কৌশলগত পরিকল্পনা ও সমন্বয় করছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে, ঘটনাটির গুরুত্ব অনুধাবন করে সেনাবাহিনী দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। আজ শুক্রবার আইএসপিআর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, “সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নীতিমালার পরিপন্থী আচরণে জড়িত থাকার অভিযোগে মেজর সাদিককে আটক করে সেনা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া গেছে এবং একটি তদন্ত আদালত গঠন করা হয়েছে।”

আইএসপিআরের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, “তদন্ত আদালতের রিপোর্ট অনুযায়ী, সেনা আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেনাবাহিনী দেশের সার্বভৌমত্ব, সংবিধান এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা রক্ষায় সর্বদা সচেষ্ট এবং সাংবিধানিক শৃঙ্খলা বিরোধী যে কোনো তৎপরতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে।”

এ ঘটনার পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ২২ জন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে রয়েছে যুবলীগ নেতা সোহেল রানা, যাকে গত ১২ জুলাই উত্তরা পশ্চিম থানার একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। একইদিনে আওয়ামী লীগের নেত্রী শামীমা নাসরিন ওরফে শম্পাকেও একই এলাকার একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমেই মেজর সাদিকের নাম ও সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হয়।

এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন মহল থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হচ্ছে, সেনাবাহিনীর মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ ও পক্ষপাতমূলক আচরণ রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও নিরপেক্ষতার জন্য মারাত্মক হুমকি।

তদন্ত চলছে এবং রাজনীতিক মহল ও জনসাধারণ এখন অপেক্ষায় রয়েছে—আদালতের রিপোর্টে কী উঠে আসে এবং মেজর সাদিক ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কেমন শাস্তি নির্ধারিত হয়। পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে, এই চক্রান্তে বিদেশে পালিয়ে থাকা শীর্ষ আওয়ামী নেতাদের ভূমিকা ও তাৎপর্য নিয়েও, যা তদন্তে প্রমাণিত হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন মাত্রার কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আওয়ামী ক্যাডারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া কে এই মেজর সাদিক? সেনা হেফাজতে গ্রেপ্তার, তদন্তে জড়িতদের চাঞ্চল্যকর সম্পৃক্ততা উদঘাটন

Update Time : ০৬:৫৫:৫৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২ অগাস্ট ২০২৫

1754050789 2e61e0ad753677dddd1a9d1f038e6721

আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নির্বাচিত ক্যাডারদের গোপনে প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা, মেজর সাদিকুল হক ওরফে মেজর সাদিককে আটক করে সেনা হেফাজতে রাখা হয়েছে। সেনাবাহিনীর সামরিক অপারেশনস পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাজিম-উদ-দৌলা বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) ঢাকার অফিসার্স মেস ‘এ’-তে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এই তথ্য নিশ্চিত করেন।

সেনা কর্মকর্তা মেজর সাদিক বর্তমানে কক্সবাজারের রামু ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সরাসরি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশনায় মিরপুর, ভাটারা, কাটাবন ও পূর্বাচলসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে গোপনে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এ প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য ছিল সদ্য ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে এনে রাজনৈতিকভাবে আবার পুনরাবির্ভাব ঘটানো এবং আন্দোলন দমনসহ দলে নতুন ছায়া সেনা গঠন।

বিশেষ করে গত ৮ জুলাই ভাটারা থানার একটি কনভেনশন সেন্টারে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের প্রায় ৪০০ নেতাকর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের মধ্যে অনেকে দুই দিন আগেই নির্ধারিত টোকেন গ্রহণ করেছিলেন। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে জানাগেছে, প্রশিক্ষণ প্রাপ্তদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে কেন্দ্রীয় একটি পর্যায়ে এবং ওই তালিকার সঙ্গে ভারতীয় ও প্রবাসী আওয়ামী নেতৃত্বের সমন্বয় ছিল।

এ ঘটনায় আরও বিস্ময়কর তথ্য উঠে এসেছে গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে। মেজর সাদিকের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন তার স্ত্রী, সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) সুমাইয়া জাফরিন। জানা গেছে, সাদিক ও সুমাইয়া উভয়ই কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে গোপনে এই প্রশিক্ষণের আয়োজন করেন। পরিকল্পনাটি আরও বিস্তৃতভাবে সমন্বয় করছিলেন কলকাতায় অবস্থানরত সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তাকে সহায়তা করেছেন পুলিশের সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ কয়েকজন আওয়ামী নেতা এবং পলাতক সাবেক কর্মকর্তারা।

বিশ্বস্ত গোয়েন্দা তথ্য বলছে, সরকার পুনঃদখলের এই চক্রান্তের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন দিল্লিতে অবস্থানকারী পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের সাবেক প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলাম এবং সেনা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুজিবুর রহমান। তারা ভারতে বসে কৌশলগত পরিকল্পনা ও সমন্বয় করছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে, ঘটনাটির গুরুত্ব অনুধাবন করে সেনাবাহিনী দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। আজ শুক্রবার আইএসপিআর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, “সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নীতিমালার পরিপন্থী আচরণে জড়িত থাকার অভিযোগে মেজর সাদিককে আটক করে সেনা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া গেছে এবং একটি তদন্ত আদালত গঠন করা হয়েছে।”

আইএসপিআরের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, “তদন্ত আদালতের রিপোর্ট অনুযায়ী, সেনা আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেনাবাহিনী দেশের সার্বভৌমত্ব, সংবিধান এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা রক্ষায় সর্বদা সচেষ্ট এবং সাংবিধানিক শৃঙ্খলা বিরোধী যে কোনো তৎপরতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে।”

এ ঘটনার পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ২২ জন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে রয়েছে যুবলীগ নেতা সোহেল রানা, যাকে গত ১২ জুলাই উত্তরা পশ্চিম থানার একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। একইদিনে আওয়ামী লীগের নেত্রী শামীমা নাসরিন ওরফে শম্পাকেও একই এলাকার একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমেই মেজর সাদিকের নাম ও সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হয়।

এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন মহল থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হচ্ছে, সেনাবাহিনীর মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ ও পক্ষপাতমূলক আচরণ রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও নিরপেক্ষতার জন্য মারাত্মক হুমকি।

তদন্ত চলছে এবং রাজনীতিক মহল ও জনসাধারণ এখন অপেক্ষায় রয়েছে—আদালতের রিপোর্টে কী উঠে আসে এবং মেজর সাদিক ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কেমন শাস্তি নির্ধারিত হয়। পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে, এই চক্রান্তে বিদেশে পালিয়ে থাকা শীর্ষ আওয়ামী নেতাদের ভূমিকা ও তাৎপর্য নিয়েও, যা তদন্তে প্রমাণিত হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন মাত্রার কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।