উচ্চকক্ষের পিআর নিয়ে সংলাপে উত্তেজনা, শেষপর্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ কোলাকুলি
- Update Time : ১০:২১:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই ২০২৫
- / ১৪৮ Time View

বৃহস্পতিবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আয়োজিত রাজনৈতিক সংলাপে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ২৩তম দিনের দ্বিতীয় ধাপের এই সংলাপে বিএনপি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জাতীয় দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচারে দেখা যায়, দুপুর ১টা ৫০ মিনিটের দিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ পিআর পদ্ধতির বিষয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, ‘‘আমরা সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা অনির্বাচিত উচ্চকক্ষের হাতে দিতে চাই না।’’ তিনি যুক্তি দেন, “বিশ্বের কোথাও অনির্বাচিতদের হাতে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা নেই।”
সালাহউদ্দিনের বক্তব্য শেষ হলে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক জাভেদ রাসিন বক্তব্য দেন এবং বলেন, ‘‘ভোটের আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষ গঠিত হলে, সেটাই প্রকৃত জনইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাবে।’’ তিনি এ বক্তব্যের মাধ্যমে সালাহউদ্দিনের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি প্রশ্ন তোলেন। এ সময় সালাহউদ্দিন ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলে জাতীয় দলের চেয়ারম্যান ও ১২ দলীয় জোটের সমন্বয়ক সৈয়দ এহসানুল হুদা মাইক ছাড়াই মন্তব্য করেন, ‘‘২০২৩ সালে যখন আন্দোলন চলছিল, তখন আপনারা কোথায় ছিলেন?’’
এই মন্তব্যে সংলাপে তুমুল উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। জাভেদ রাসিনও মাইক ছাড়া পাল্টা প্রতিবাদ করেন। ফলে উভয়ের মধ্যে একধরনের বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়, যা পুরো আলোচনার পরিবেশকে বিঘ্নিত করে। তখন কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজ পরিস্থিতি শান্ত করতে হস্তক্ষেপ করে বলেন, “আমরা কে কখন আন্দোলনে ছিলাম—এই প্রশ্ন তুললে আলোচনার পথ রুদ্ধ হবে। রাজনৈতিক শক্তির পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার এখতিয়ার আমাদের কারও নেই।”
সংলাপের পরিস্থিতি শান্ত করার উদ্দেশ্যে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, “তিনি (হুদা) এমন কথা বলতে পারেন না।” তবে সালাহউদ্দিন তাঁকে শান্ত থাকতে বলেন। আখতার হোসেন তখনো উত্তপ্ত হয়ে বলেন, “আমরা বাচ্চাকাল থেকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়ছি। ইতিহাস বিকৃত করে আমাদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন করলে আমরা মানব না।”
আলোচনায় আলী রীয়াজ বলেন, “সবারই রাজনৈতিক বৈধতা আছে, লোকাস স্ট্যান্ডিং আছে। এটা নিয়ে প্রশ্ন করা অনুচিত। আমাদের এই জায়গায় আসতে পারা তারই প্রমাণ।” তবে উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। আখতার হোসেন তখন বলেন, “গায়ের জোরে কথা চাপিয়ে দিলে সেটা মেনে নেওয়া যাবে না।” তখনও আলী রীয়াজ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন।
এরপর সালাহউদ্দিন আহমেদ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সৈয়দ এহসানুল হুদাকে অনুরোধ করে বলেন, “আপনি সরি বলেন।” তখন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জেনায়েদ সাকী বক্তব্য দিতে দাঁড়ালে, তাঁকে শান্ত থাকতে অনুরোধ করে বসিয়ে দেন ড. রীয়াজ।
পরিস্থিতির শোধরানো চেষ্টায় এহসানুল হুদা মাইক নিয়ে বলেন, “আমি বলতে চেয়েছিলাম, ২০২৩ সালে যখন আমরা উচ্চকক্ষের প্রস্তাব দিয়েছিলাম, তখন এই পিআর প্রস্তাবটি কোথায় ছিল—সেটা মনে করিয়ে দিতে চেয়েছি। যদি কেউ এতে কষ্ট পেয়ে থাকেন, আমি দুঃখিত।” হুদার এমন বক্তব্যে আলোচনায় সাময়িক স্বস্তি ফিরে আসে।
পরবর্তীতে মধ্যাহ্নভোজের বিরতির সময় হুদা ও আখতার একে অপরকে কাছে টেনে ব্যাখ্যা দিয়ে কোলাকুলি করেন। হুদা বলেন, “আমার বক্তব্যে কাউকে আঘাত করার অভিপ্রায় ছিল না। দয়া করে এটা নিয়ে যেন আর ভুল বোঝাবুঝি না হয়।” আখতারও উত্তরের মাধ্যমে সৌহার্দ্যপূর্ণ মনোভাব প্রকাশ করেন এবং হুদার সঙ্গে জাভেদ রাসিনের কোলাকুলি করিয়ে দেন।
এই ঘটনাপ্রবাহে প্রমাণিত হয় যে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পরস্পরের প্রতি সম্মান ও সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতার জায়গায় আসা সম্ভব—যা একটি পরিপক্ব গণতান্ত্রিক চর্চারই নিদর্শন।













