সময়: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৫ আগস্ট দুপুরেই বুঝে গিয়েছিলাম, শেখ হাসিনার সরকারের পতন আসন্ন: সাবেক আইজিপি চৌধুরী মামুনের জবানবন্দি

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১১:১৭:১৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩০ জুলাই ২০২৫
  • / ১৬৪ Time View

1753843938 e62d1c2c17c4439290e12b492e20b87c

1753843938 e62d1c2c17c4439290e12b492e20b87c

২০১৮ সালের বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে চলতি বছরের বহুল আলোচিত ‘জুলাই আন্দোলন’ পর্যন্ত নানা ঘটনায় পর্দার আড়ালের বহু গোপন তথ্য অবশেষে প্রকাশ্যে আনলেন বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী মামুন। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা এক জবানবন্দিতে তিনি পাঁচ পৃষ্ঠাজুড়ে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন সরকারের ভেতরে চলমান টানাপড়েন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভিন্নমত এবং ‘৫ আগস্ট দুপুরে’ শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পূর্বাভাস কীভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

চৌধুরী মামুন তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধান, র‌্যাবের মহাপরিচালকসহ গোয়েন্দা ও পুলিশ বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা। বৈঠকে মূলত চলমান আন্দোলনের ব্যাপকতা, এর বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। তবে সরকার পতনের সম্ভাবনা বা রাজনৈতিক পরিণতির প্রসঙ্গে কেউ কিছু বলেননি।

তবে চৌধুরী মামুনের ভাষ্যমতে, বৈঠকের সময় তিনি এবং কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সরকারের ভেতরে দুর্বলতা, জনরোষের মাত্রা এবং প্রশাসনের আস্থাহীনতা তুলে ধরতে চাইলেও প্রধানমন্ত্রী এবং তার ঘনিষ্ঠ মহল সেসবকে উপেক্ষা করে। তারা একরকম আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে দাবি করছিলেন, যা বাস্তবতা থেকে ছিল অনেক দূরে।

ওই রাতেই আরেকটি জরুরি বৈঠক হয় গণভবনে, যেখানে উপস্থিত ছিলেন শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, মন্ত্রিপরিষদের কয়েকজন সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, র‍্যাব ডিজি এবং চৌধুরী মামুন নিজে। এই বৈঠকে খোলামেলা আলোচনায় উঠে আসে ৫ আগস্ট কীভাবে রাজধানীতে গণজমায়েত হতে পারে এবং তা দমন করতে কোন কোন কৌশল গ্রহণ করা হবে। রাত সাড়ে ১২টার পর সেনাবাহিনীর অপারেশন কন্ট্রোল রুমে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় বৈঠক হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, ঢাকার চারটি প্রধান প্রবেশপথে সেনা-পুলিশ যৌথভাবে অবস্থান নিয়ে রাজধানীতে সাধারণ জনগণের প্রবেশ বন্ধ করে দেবে।

কিন্তু চিত্রটা পাল্টে যেতে থাকে পরদিন সকাল থেকেই। ৫ আগস্ট সকাল ১০টা পর্যন্ত পুলিশ তাদের অবস্থান বজায় রাখলেও, কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা যায়, উত্তরা ও যাত্রাবাড়িসহ অন্যান্য পয়েন্ট দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঢাকায় ঢুকে পড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। চৌধুরী মামুন বলেন, “সেনাবাহিনী বাধা দেয়নি। বরং মাঠপর্যায়ের অনেক সেনা কর্মকর্তা এবং সদস্য আন্দোলনকারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন।”

তিনি জানান, দুপুর ১টার মধ্যেই ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে লাখ লাখ মানুষের ঢল নামে। আন্দোলনের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করে যে, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় (পিএমও) থেকে মহাখালী এলাকায় জনস্রোত ঠেকানোর জন্য জরুরি নির্দেশ আসে। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। চৌধুরী মামুন বলেন, “দুপুর সাড়ে ১২টার মধ্যেই আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়—এই সরকার আর টিকবে না। বিশেষ শাখা (এসবি) সূত্রে জানতে পারি, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগের চিন্তা করছেন। বিষয়টি সেনাবাহিনীও নিশ্চিত করে, তবে তিনি ভারত যাবেন কি না, তা নিশ্চিত করেনি।”

৫ আগস্ট বিকেলে পরিস্থিতি আরও সংকটময় হয়ে ওঠে। চৌধুরী মামুন জানান, তিনি তখন হেলিকপ্টারে করে তেজগাঁও বিমানবন্দরে যান এবং সেখান থেকে সরাসরি সেনাবাহিনীর অফিসার্স মেসে আশ্রয় নেন। পরিস্থিতি তখন এতটাই উত্তপ্ত ছিল যে, নিরাপত্তা এবং অবস্থান পরিষ্কার রাখার জন্য তাকে সেনা মেসেই থাকতে হয়েছিল।

জবানবন্দির শেষভাগে চৌধুরী মামুন নিজের দায় স্বীকার করে বলেন, “সরকারের সরাসরি নির্দেশে এবং কিছু অতিউৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তার নেতৃত্বে বলপ্রয়োগ, নির্বিচারে গুলি, নির্যাতন ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমে জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমন করা হয়েছে। এতে বহু মানুষ আহত ও নিহত হয়েছেন। সাবেক পুলিশপ্রধান হিসেবে আমি এই নৃশংসতার জন্য গভীরভাবে অনুতপ্ত, লজ্জিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী।”

চৌধুরী মামুনের এই জবানবন্দি শুধু একটি দলিল নয়—এটি একটি সরকার পতনের পূর্বাভাস, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিচ্যুতি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যকার ভেতরের দ্বন্দ্বের দলিলও বটে। ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ইতিহাসে এই জবানবন্দি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

৫ আগস্ট দুপুরেই বুঝে গিয়েছিলাম, শেখ হাসিনার সরকারের পতন আসন্ন: সাবেক আইজিপি চৌধুরী মামুনের জবানবন্দি

Update Time : ১১:১৭:১৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩০ জুলাই ২০২৫

1753843938 e62d1c2c17c4439290e12b492e20b87c

২০১৮ সালের বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে চলতি বছরের বহুল আলোচিত ‘জুলাই আন্দোলন’ পর্যন্ত নানা ঘটনায় পর্দার আড়ালের বহু গোপন তথ্য অবশেষে প্রকাশ্যে আনলেন বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী মামুন। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা এক জবানবন্দিতে তিনি পাঁচ পৃষ্ঠাজুড়ে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন সরকারের ভেতরে চলমান টানাপড়েন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভিন্নমত এবং ‘৫ আগস্ট দুপুরে’ শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পূর্বাভাস কীভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

চৌধুরী মামুন তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধান, র‌্যাবের মহাপরিচালকসহ গোয়েন্দা ও পুলিশ বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা। বৈঠকে মূলত চলমান আন্দোলনের ব্যাপকতা, এর বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। তবে সরকার পতনের সম্ভাবনা বা রাজনৈতিক পরিণতির প্রসঙ্গে কেউ কিছু বলেননি।

তবে চৌধুরী মামুনের ভাষ্যমতে, বৈঠকের সময় তিনি এবং কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সরকারের ভেতরে দুর্বলতা, জনরোষের মাত্রা এবং প্রশাসনের আস্থাহীনতা তুলে ধরতে চাইলেও প্রধানমন্ত্রী এবং তার ঘনিষ্ঠ মহল সেসবকে উপেক্ষা করে। তারা একরকম আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে দাবি করছিলেন, যা বাস্তবতা থেকে ছিল অনেক দূরে।

ওই রাতেই আরেকটি জরুরি বৈঠক হয় গণভবনে, যেখানে উপস্থিত ছিলেন শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, মন্ত্রিপরিষদের কয়েকজন সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, র‍্যাব ডিজি এবং চৌধুরী মামুন নিজে। এই বৈঠকে খোলামেলা আলোচনায় উঠে আসে ৫ আগস্ট কীভাবে রাজধানীতে গণজমায়েত হতে পারে এবং তা দমন করতে কোন কোন কৌশল গ্রহণ করা হবে। রাত সাড়ে ১২টার পর সেনাবাহিনীর অপারেশন কন্ট্রোল রুমে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় বৈঠক হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, ঢাকার চারটি প্রধান প্রবেশপথে সেনা-পুলিশ যৌথভাবে অবস্থান নিয়ে রাজধানীতে সাধারণ জনগণের প্রবেশ বন্ধ করে দেবে।

কিন্তু চিত্রটা পাল্টে যেতে থাকে পরদিন সকাল থেকেই। ৫ আগস্ট সকাল ১০টা পর্যন্ত পুলিশ তাদের অবস্থান বজায় রাখলেও, কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা যায়, উত্তরা ও যাত্রাবাড়িসহ অন্যান্য পয়েন্ট দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঢাকায় ঢুকে পড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। চৌধুরী মামুন বলেন, “সেনাবাহিনী বাধা দেয়নি। বরং মাঠপর্যায়ের অনেক সেনা কর্মকর্তা এবং সদস্য আন্দোলনকারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন।”

তিনি জানান, দুপুর ১টার মধ্যেই ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে লাখ লাখ মানুষের ঢল নামে। আন্দোলনের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করে যে, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় (পিএমও) থেকে মহাখালী এলাকায় জনস্রোত ঠেকানোর জন্য জরুরি নির্দেশ আসে। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। চৌধুরী মামুন বলেন, “দুপুর সাড়ে ১২টার মধ্যেই আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়—এই সরকার আর টিকবে না। বিশেষ শাখা (এসবি) সূত্রে জানতে পারি, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগের চিন্তা করছেন। বিষয়টি সেনাবাহিনীও নিশ্চিত করে, তবে তিনি ভারত যাবেন কি না, তা নিশ্চিত করেনি।”

৫ আগস্ট বিকেলে পরিস্থিতি আরও সংকটময় হয়ে ওঠে। চৌধুরী মামুন জানান, তিনি তখন হেলিকপ্টারে করে তেজগাঁও বিমানবন্দরে যান এবং সেখান থেকে সরাসরি সেনাবাহিনীর অফিসার্স মেসে আশ্রয় নেন। পরিস্থিতি তখন এতটাই উত্তপ্ত ছিল যে, নিরাপত্তা এবং অবস্থান পরিষ্কার রাখার জন্য তাকে সেনা মেসেই থাকতে হয়েছিল।

জবানবন্দির শেষভাগে চৌধুরী মামুন নিজের দায় স্বীকার করে বলেন, “সরকারের সরাসরি নির্দেশে এবং কিছু অতিউৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তার নেতৃত্বে বলপ্রয়োগ, নির্বিচারে গুলি, নির্যাতন ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমে জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমন করা হয়েছে। এতে বহু মানুষ আহত ও নিহত হয়েছেন। সাবেক পুলিশপ্রধান হিসেবে আমি এই নৃশংসতার জন্য গভীরভাবে অনুতপ্ত, লজ্জিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী।”

চৌধুরী মামুনের এই জবানবন্দি শুধু একটি দলিল নয়—এটি একটি সরকার পতনের পূর্বাভাস, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিচ্যুতি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যকার ভেতরের দ্বন্দ্বের দলিলও বটে। ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ইতিহাসে এই জবানবন্দি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।