হাটে হাঁড়ি ভাঙল ইসরাইলি গণমাধ্যম: সেনাবাহিনী ছাড়ছেন হাজারো ইসরাইলি সেনা, গভীর মানসিক সংকটে পুরো বাহিনী
- Update Time : ০৬:০৯:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ জুলাই ২০২৫
- / ১৪২ Time View

গাজায় চলমান যুদ্ধ নিয়ে যতই ইসরাইল সরকার নিজেদের তথ্য ও পরিসংখ্যান ঢেকে রাখতে চায়, বাস্তবতা ধরা পড়ছে ঠিকই—তাও নিজেদের দেশের সংবাদমাধ্যমেই। সম্প্রতি ইসরাইলের প্রভাবশালী দৈনিক ইয়েদিয়ত আহরোনোত প্রকাশ করেছে এক বিস্ফোরক প্রতিবেদন, যেখানে তুলে ধরা হয়েছে গাজা যুদ্ধ ঘিরে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ দুরবস্থা, সেনাদের ত্যাগ ও মানসিক স্বাস্থ্য সংকট।
সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, গাজা যুদ্ধ শুরুর পর ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ৬,১৪৫ জন সেনা আহত হয়েছেন এবং ৮৯৫ জন নিহত। কিন্তু ইয়েদিয়ত আহরোনোত জানাচ্ছে একেবারে বিপরীত চিত্র—তাদের তথ্যে অন্তত ৫,৫০০ সেনা ও পুলিশ সদস্য গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন, যাদের অনেকেই আজীবনের জন্য শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে গেছেন। আর আগামী আড়াই বছরের মধ্যে এই সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যার অর্ধেকই হবেন মানসিক রোগে আক্রান্ত।
আর এখানেই শুরু হয় ইসরাইলের ‘অন্তর্গত ভাঙন’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইতোমধ্যে ১০,০০০-এর বেশি সেনা বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছেন। ৩,৬৭৯ জন স্পষ্টভাবে ভুগছেন পিটিএসডি (Post-Traumatic Stress Disorder)-তে। শুধু ২০২৪ সালেই ৯,০০০-এর মতো সেনা মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য আবেদন করেছেন, যাদের বেশিরভাগই হতাশা, আতঙ্ক, ঘুমের সমস্যা ও আতঙ্কজনিত অভিজ্ঞতা বয়ে বেড়াচ্ছেন।
২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ১,৬০০ সেনাকে পিটিএসডি রোগী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৬৯৩ জন সরাসরি গাজা অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। এই আক্রান্তদের মধ্যে অনেকেই নিয়মিত বাহিনীর, অতিরিক্ত বাহিনীর, কিংবা সেনাবাহিনীর নানা ইউনিটের সদস্য। এ চিত্র বলে দিচ্ছে—ইসরাইলি সমাজের এক বড় অংশ ভুগছে যুদ্ধপরবর্তী মানসিক বিকার এবং সেই সমস্যা দিনকে দিন জটিল হয়ে উঠছে।
এমন পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে, ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক তথ্যে বলা হয়েছে, গাজা যুদ্ধের পর ১২,০০০-এর বেশি নিয়মিত ও অতিরিক্ত বাহিনীর সদস্য চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। যা শুধু সামরিক কাঠামো নয়, দেশের অর্থনীতিকেও একটি গুরুতর সংকটে ঠেলে দিচ্ছে। কারণ, এই সেনাদের প্রশিক্ষণে ব্যয় হয়েছে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ। তাদের চাকরি ছেড়ে দেওয়া মানে জনবলের ঘাটতির পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে কার্যক্ষমতা হ্রাস পাওয়া।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই মানসিক বিপর্যয় এক অর্থে ইসরাইলের নিজের তৈরি ফাঁদ। ইসরাইলভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা বেতসেলেম এবং ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস একযোগে দাবি করেছে, গাজায় ইসরাইলের কার্যকলাপ স্পষ্টতই গণহত্যার শামিল। তারা বলছে—এই বর্বরতা শুধু ফিলিস্তিনিদের নয়, ইসরাইলি সমাজকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে মানসিক ও নৈতিকভাবে।
তাদের ভাষায়, “এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইসরাইল নিজেই নিজের ভেতর বিষ ঢালছে। সেনারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসছে শরীর আর মনের গভীর ক্ষত নিয়ে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ইসরাইল কি নিজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক মানসিক রোগে আক্রান্ত জাতিতে পরিণত করতে চায়?”
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইলের ভেতরেই যে বিরাট অস্থিরতা চলছে, এই তথ্যপ্রকাশ তারই প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি। কারণ, যখন সেনাবাহিনী নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা নিয়েই বিপর্যস্ত থাকে, তখন সেই রাষ্ট্রের আধিপত্য বজায় রাখা শুধু অসম্ভব নয়—নির্বোধের আত্মঘাতী দম্ভে পরিণত হয়। ইসরাইলের উচিত, সত্যিকার অর্থেই শান্তির পথে আসা—না হলে গাজায় তারা যতই নিঃসংশতা চালাক, নিজের ভেতরের সমাজব্যবস্থা এবং মনস্তত্ত্বের পতন ঠেকানো আর সম্ভব হবে না।













